Published : 14 Jun 2026, 10:20 PM
নির্মাণ কাজের অন্যতম প্রধান উপাদান এমএস রডের দাম কয়েক বছরে অনেকটা বাড়লেও এর পেছনে ব্যবসায়ীদের কোনো ‘সিন্ডিকেট নেই’ বলে দাবি করেছেন স্টিল উৎপাদনকারী কোম্পানি চাকদা স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলস (সিএসআরএম) প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান।
তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারের বিপরীতে টাকার উচ্চ বিনিময় হার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ বৃদ্ধি এ নির্মাণ সামগ্রীটির দাম বাড়ার নেপথ্যে কাজ করেছে।
এ পরিস্থিতিতে স্টিল উৎপানকারীদের ব্যবসা ‘খুব ভালো নেই’ বলে দাবি করেছেন এ খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ)’ উপদেষ্টা শাহজাহান।
উৎপাদনের তুলনায় চাহিদার স্বল্পতা, রপ্তানির সুযোগ না থাকা, দেশে ভারী শিল্পে দক্ষ জনবলের অভাবসহ স্টিল শিল্পের নানা সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’-এ কথা বলেছেন এ বনেদি ব্যবসায়ী।
এ আলোচনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে সম্প্রচারিত হয়েছে।
রডের চাহিদা কম থাকায় সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই
কয়েকজন ব্যবসায়ী জোটবেঁধে বা সিন্ডিকেট করে রডের দাম বাড়িয়ে ফেলছে—জনসাধারণের এমন ধারণা ‘একদমই সঠিক’ নয় বলে মন্তব্য করেন সিএসআরএম এমডি শাহজাহান।
যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদনের চেয়ে বাজারে চাহিদা কম থাকায় সিন্ডিকেট করে রডের দাম বাড়ানোর সুযোগই নেই।
“আমাদের প্রোডাকশন অনুযায়ী ডিমান্ড কম। আল্টিমেটলি কেউ চায় না তার প্রোডাক্টটা ধরে রাখতে। কারণ আমি যদি একটা প্রোডাক্ট ধরে রাখি, তাহলে আমার খরচ বেড়ে যায়। আমাকে ব্যাংকের টাকা দিয়েই তো প্রোডাক্টটাকে মজুদ রাখতে হচ্ছে। যার ফলে আমি চাই যে এটাকে ডিসবার্স করতে। সুতরাং এখানে সিন্ডিকেশনের তো প্রশ্নই আসে না।”
শাহজাহান বলেন, “সিন্ডিকেশনটা কখন হবে? যখন সবাই চাইবে যে, না আমি এই জায়গায় থাকব, এখান থেকে আর বের হব না। কিন্তু আমাদেরতো ডিমান্ড ওই পর্যন্ত নাই।
“যদি ডিমান্ড আমার বেশি থাকতো প্রোডাকশনের চাইতে, তখন সিন্ডিকেশনের প্রশ্ন আসতো। এখন কিন্তু আমরা সেই জায়গায় নাই। এবং এইটা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নাই।”
‘ভালো নেই’ স্টিল ব্যবসায়ীরা
আন্তর্জাতিক বাজারে কাচামালের দাম বৃদ্ধি, আমাদানি খরচ বেড়ে যাওয়া, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারের বিপরীতে টাকার উচ্চ বিনিময়হার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে রডের চাহিদা কম থাকা এ খাতের ব্যবসায়ীরা ‘ভালো অবস্থায়’ নেই বলে ভাষ্য স্টিল অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা শাহজাহানের।
তিনি মনে করেন, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার এবং ব্যাংকের সুদ হার ‘হুট করে বেড়ে যাওয়ায়’ এ খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
শাহজাহানের কথায়, “ওই সময় ডলারের দাম ছিল ৮৬ টাকা। আমরা ওই সময় কাঁচামাল আমদানিতে ইউপাস এলসি (সরবরাহকারী তাৎক্ষণিক টাকা পেলেও তা পরিশোধে আমদানিকারক সময় পেয়ে থাকে) করি। এ এলসির ক্ষেত্রে পণ্য আমদানির ছয় মাস পরে টাকা পরিশোধের সুযোগ থাকে।

“স্থানীয় ব্যাংক ঋণের সুদ হার ১৩ শতাংশ হলেও ইউপাস এলসিতে ব্যাংকিং কস্ট কম পড়ে; তো সবাই (ব্যবসায়ীরা) মিলে ইউপাস এলসি করা। কিন্তু এ এলসিগুলোর যখন পেমেন্টের সময় হলো তখন ডলারের দাম দাঁড়াল ১২৩ টাকায়। একটু প্রফিট করতে গিয়ে বড় ধরনের লস করলাম। তো এই লসটা কিন্তু একটা বড় ধরনের ধাক্কা সব ইন্ডাস্ট্রিকেই দিয়েছে।”
সিএসআরএম এমডি বলেন, “ডলারের দাম বাড়ায় আমাদের বিনিয়োগ বেড়ে গেছে, কস্ট অব ফান্ডও বেড়ে গেছে। প্রফিট কিন্তু আমরা করতে পারছি না ওইরকম। এটা আমাদের জন্য বড় একটা ঝুঁকির বিষয়।
“ডলারের আগের দামে আমরা ৮৬ টাকায় যে পরিমাণ কাঁচামাল কিনতে পারতাম, এখন ১২৩ টাকাতেও তা পাচ্ছি না। এই ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংকের যে সাপোর্ট আরও দরকার ছিল, সেইগুলোতেও কিছু প্রবলেম আছে। তো সবকিছু মিলায়ে উই আর নট ইন গুড শেইপ।”
শাহজাহান বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এখন ব্যাংক ইন্টারেস্ট এবং ডিমান্ডকে ক্রিয়েট করা। এখন ডিমান্ডটা অনেক কম আছে।
“ডিমান্ডটাকে যদি ক্রিয়েট না করা যায় বা ওভারঅল গভর্মেন্টের যে ওয়ার্কগুলো আছে, সেগুলো যদি সচল না করা যায়; এটা একটা বড় ধরনের ঝুঁকি আমাদের জন্য হবে।”
‘দেশে চাহিদা কম, রপ্তানির সুযোগও নেই’
রড উৎপাদনের তুলনায় দেশের বাজারে চাহিদা কম যেমন, তেমনই উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হচ্ছে না বলে ভাষ্য সিএসআরএম এমডি শাহজাহানের।
তিনি বলছিলেন, “রড রপ্তানি আমাদের জন্য একটু সমস্যাই। কারণ আমরা তো র ম্যাটেরিয়ালসটাকে ইমপোর্ট করে নিয়ে আসি। এবং আমাদের বিদ্যুতের দাম বেশি, গ্যাসের দাম বেশি হচ্ছে; ঠিকভাবে আমরা এই বিদ্যুৎ-গ্যাসের সাপ্লাই পাচ্ছি না, যার ফলে আমাদের কস্ট বেড়ে যাচ্ছে।
“ব্যাংকিং চার্জ আমাদের বেশি। সবকিছু মিলিয়ে সবদিকে আমাদের কস্টিংয়ের সূচকটা বেশি। তো আমরা যে দেশের বাইরে বিক্রি করতে চাচ্ছি, তারা আসলে কম্পিটিটিভ প্রাইস হলেই নেবে। রপ্তানির জন্য সেই জায়গাটা আমাদের তৈরি হয়নি।”

শাহজাহান বলেন, “উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার কারণে এই মুহূর্তে সেই সম্ভাবনাটা কম। হয়তোবা অদূর ভবিষ্যতে হতে পারে; সরকার যদি স্টিল ব্যবসায়ীদের কিছু ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে হয়তো রড রপ্তানি সম্ভব হবে।”
দক্ষ জনবলের অভাব
দক্ষ জনবলের অভাব স্টিল শিল্পখাতকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী শাহজাহান।
তিনি বলেন, “ভারী শিল্পের দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে কম। আসলে আমরা আমাদের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী পাচ্ছি না। অনেক সময় দেখা যায় কী... যারা বুয়েট থেকে পাশ করে বা অন্যান্য প্রকৌশল থেকে পাশ করে, সবাই না এরা তো ইঞ্জিনিয়ার তাই না? এরা সবাই ডেস্কওয়ার্ক করতে চায়। ফিল্ডওয়ার্ক করতে চায় না।”
সিএসআরএম এমডি বলেন, “আপনি একজন ইঞ্জিনিয়ার তো, ডেস্ক ওয়ার্কের তো আপনার বেশি কিছু থাকবে না; আপনার ফিল্ডওয়ার্কেই বেশি কিছু থাকে। আমাদের দেশে এই জিনিসটা... মানে এই ছেলেদের মধ্যে যারা পড়াশোনা করে বের হয়, সবাই চায়—‘আমি একটা ভালো অফিসে বসব, যেখানে এসি থাকবে, একটা ডেস্ক থাকবে, আমি ডেস্কে বসে বসে কাজ করব’। ফলে এই সেক্টরটাতে ডেভেলপমেন্টটা কম হচ্ছে।
“আর যারা বুয়েট থেকে পাস-টাস করে, এরা কিন্তু বাইরে চলে যায়। দেশে থাকতে চায় না আল্টিমেটলি। তবে দেশে থেকেও স্টিলখাতে কাজ করে অনেক দূরে যাওয়ার সুযোগ তাদেরও আছে।”
‘দিতে হবে সেরাটা, ঠিক রাখতে হবে কথা-কাজ’
কথা-কাজে মিল রেখে সেরা দামে সেরা পণ্য সরবরাহই স্টিল ব্যবসায় সিএসআরএমকে সাফল্য এনে দিয়েছে বলে মনে করেন কোম্পানির এমডি শাহজাহান।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু বেস্ট অব কোয়ালিটিতে থাকতে চাই না। আমরা বেস্টটা— সব জায়গায় থাকতে চাই। এইজন্য আমরা কমিটেড ফর বেটার স্টিল। আমাদের থিংকিং বেস্ট, বেস্ট ফর দ্য প্রাইস, বেস্ট ফর দ্য সাপ্লাই ইন টাইম, বেস্ট ফর দ্য কমিটমেন্ট।
“আপনি বেস্ট প্রোডাক্ট করলেন, আপনার প্রাইসটা এমন জায়গায় যে কাস্টমার অ্যাফোর্ড করতে পারল না। আই থিংক দিস ইজ নট বেস্ট। আপনি কাউকে কমিট করলেন যে, ‘আমি আপনাকে এত টন রড দেব, একটা প্রাইসে’। প্রাইসটা মার্কেটে প্রায় ফ্লেক্সিবল হয়। প্রাইস বেড়ে গেল, আপনি রডটা দিলেন না। দিস ইজ নট বেস্ট। বাট উই আর ডুইং অল। আমরা যদি কাউকে কমিটমেন্ট দেই, ইনশাল্লাহ আমরা সেই কমিটমেন্ট ফুলফিল করি।
“এমনও হয়েছে সাডেনলি প্রাইস বেড়ে গিয়েছে দশ হাজার টাকা পার টনে। অনেক সময় র ম্যাটেরিয়ালসের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা আমাদের কমিটমেন্ট রক্ষা করেছি; যা আমাদের স্টিল খাতে সেরা করে তুলেছে।”
শাহজাহান বলেন, সঠিক সময়ে গ্রাহকের দ্বারে পণ্য পৌঁছে দিতে সিএসআরএম পরিবহন সেবাও দিয়ে থাকে। কথা-কাজে মিল রেখে সেরা পণ্য সরবরাহে করে স্টিল ব্যবসায় সুদীর্ঘ পথচলা সিএসআরএমের রডকে যমুনা সেতু থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে, আগারগাঁওয়ের সরকারি অফিস থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফ্লাইওভারে পৌঁছে দিয়েছে।
শৈশব কাটানো নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার চাকদা এলাকার নাম অনুসারে চাকদা স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলস প্রাইভেট লিমিটেড বা সিএসআরএমের নামকরণ করা হয় বলে জানিয়েছেন শহাজাহান।