Published : 14 Dec 2025, 12:22 AM
আদালতের রায় হয়েছে প্রায় এক যুগ আগে। জমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ বরাদ্দও হয়েছিল। কিন্তু তারপরও উদ্ধার হয়নি একাত্তরের ‘জল্লাদখানা’ খ্যাত পাহাড়তলী বধ্যভূমি।
বছর ঘুরলে রঙ লাগে বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভে। আর বাকি বছর ঝোপঝাড় ঘিরে রাখে সেই স্তম্ভ। স্তম্ভ ঘেঁষে থাকা ভবনের অর্ধনির্মিত কাঠামো অপসারণেও কোনো উদ্যোগ নেই।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় এই বধ্যভূমি এখন কোনো রকমে টিকে আছে। একাত্তরে এই বধ্যভূমিতে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের পরিবারের সদস্যরাও এখন হতাশ। নিজেদের জীবদ্দশায় বধ্যভূমিটির সংরক্ষণ দেখে যেতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান তারা।
২০১৪ সালের ১১ মার্চে দেওয়া উচ্চ আদালতের এক আদেশে এখানকার এক দশমিক ৭৫ একর জমির সম্পূর্ণ অংশ ‘পাহাড়তলী বধ্যভূমি’ বলে রায় দেওয়া হয়।
আদালতের আদেশের পর জমি অধিগ্রহণের জন্য ৯২ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ হয়নি। সেই টাকা ফেরত গেলে আবারও অর্থ বরাদ্দ হয়।
তবে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও জেলা প্রশাসন এই জমি উদ্ধারে নিস্ক্রিয় বলে মনে করেন বধ্যভূমি রক্ষার দাবিতে নামা আন্দোলনকারীরা।
কী হয়েছিল জল্লাদখানায়
পাহাড়তলী শহীদ লেইনের বাসিন্দা আকবর হোসেন ছিলেন রেলওয়ের চাকরিজীবী।
শহীদ আকবর হোসেনের সন্তান রাউফুল হোসেন সুজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর ছিল ২০ রমজান। আমরা ভাইরা ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা। আমরা কেউ সেদিন বাড়িতে ছিলাম না।
“সেদিন বাড়ি থেকে আমার বাবাকে ধরে পাহাড়তলীর এই বধ্যভূমিতে নিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। সেখানে মানুষ মেরে লাশ গর্তের মধ্যে ফেলে গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দিত।”
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর ওই এলাকায় গিয়ে গর্তের বহু মানুষের হাড়গোড় ও দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল জানিয়ে রাউফুল হোসেন সুজা বলেন, “এখন যেখানে স্মৃতিস্তম্ভ, তার পাশে ছিল পাহাড়। সেখানে বাঙালি নারীদের ধরে এনে ধর্ষণ করা হত।”

দেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্ট চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি এটা। এখানে এনে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
“এই এলাকার লোকদের তো এনেছেই। পাশাপাশি নাজিরহাট-দোহাজারী রেললাইনে চলাচলকারী ট্রেন থেকে যাত্রীদের নামিয়ে এখানে এনে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানি আর্মি, বিহারী ও রাজাকাররা মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতো।”
১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ মাসজুড়ে পাহাড়তলীর এই বধ্যভূমিতে বাঙালি নিধন যজ্ঞ চলেছিল বলে দাবি করেন এ গবেষক।
২০১১ সালের ৬ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আদেশে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়, তদন্ত শেষে পাহাড়তলী বধ্যভূমির স্থান নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
ওই কমিটির কাছে সাক্ষ্যদাতারা বলেন, প্রায় পৌনে ২ একর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল মানুষের মাথার খুলি, কঙ্কাল ও হাড়গোড়। এর মধ্যে ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর ‘পাহাড়তলী গণহত্যা’ সংঘটিত হয়। সেদিন বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করা হয় বিহারিদের সহায়তায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা কমিটিকে জানিয়েছিলেন, সেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।
পাহাড়তলীর বধ্যভূমি সংরক্ষণ আটকে ভূমি অধিগ্রহণে
যেখানে বেসরকারি ‘ইউনির্ভাসিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রামের’ (ইউএসটিসি) একটি অনুষদের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানেই ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর হত্যার পর পাকিস্তানি বাহিনী লাশ ফেলে রেখেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা কমিটিকে জানিয়েছিলেন।
দীর্ঘ আন্দোলন, আইনি লড়াই
দুই দশকের বেশি সময় আগে ‘বধ্যভূমি রক্ষা পরিষদ’ গড়ে পাহাড়তলী বধ্যভূমিসহ চট্টগ্রামের বধ্যভূমিগুলো রক্ষায় আন্দোলন শুরু করেছিলেন পরিষদের সভাপতি ও শহীদের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী সালেহ উদ্দিন।
পাহাড়তলী বধ্যভূমি রক্ষায় আদালতে রিটকারীদেরও একজন ছিলেন তিনি। ২০২১ সালের অগাস্টে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পরিষদের সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিন মারা যান।
এছাড়া ‘প্রজন্ম ৭১’ নামে আরেকটি সংগঠনের ব্যনারে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরাও এই বধ্যভূমি রক্ষার আন্দোলনে যোগ দেয়।

‘পাহাড়তলী বধ্যভূমি কমপ্লেক্স বাস্তবায়ন পরিষদের’ আহ্বায়ক মোস্তফা কামাল যাত্রা বলেন, “আদালতের রায় হওয়ার পর বধ্যভূমি সংরক্ষণ হওয়ার বিষয়টি গাজী সালেহ উদ্দিন স্যার দেখে যেতে পারেননি। এর চেয়ে দুঃখজনক ও লজ্জাজনক আর কী হতে পারে!”
১৯৯৯ সালে এই বধ্যভূমি রক্ষার্থে তৎকালীন সরকার জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়। এই প্রকল্পের জন্য তখন ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়।
তৎকালীন সরকারের ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে অধ্যাপক জাফর ইকবাল, মুনতাসির মামুন ও গাজী সালেহ উদ্দিনসহ আটজন হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।
পাহাড়তলী এলাকায় বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিত ওই জমিতে ২০০৭ সালে একটি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি ছিল, ওই জমি তাদের কেনা।
এর বিরুদ্ধে ২০১০ সালে আরেকটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই ভবন নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেয় আদালত। ইউএসটিসির ব্যবসা প্রশাসন অনুষদের সেই ভবনটি এখনো অর্ধনির্মিত অবস্থায় সেখানে আছে।
২০১১ সালে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ সালের ১১ মার্চে এক আদেশে এক দশমিক ৭৫ একর জমির সম্পূর্ণ অংশ পাহাড়তলী বধ্যভূমি বলে রায় দেয় উচ্চ আদালত।
মোস্তফা কামাল যাত্রা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আদালতের আদেশের পর জমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে অর্থের চাহিদাপত্র মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাহাড়তলী বধ্যভূমির জমি অধিগ্রহণের দাবি
'জল্লাদখানাই দেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি'
“এরপর গত সরকারের আমলে ৯২ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছিল বলেও আমরা জানি। কিন্তু ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ শুরুতে ক্ষতিপূরণের টাকা গ্রহণ করেনি। ফলে সেই টাকা ফেরত গেছে। পরে আরও একবার বরাদ্দের টাকা আসে। ততদিনে মৌজা দর বেড়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে কোনো সরকারের পক্ষেই তো জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হবে না।”
তিনি বলেন, “অন্যদিকে ওই জমি ইউএসটিসির কাছে বিক্রি করেননি মর্মে কাট্টলী এলাকার একটি পরিবার জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছে। সে বিষয়েও কোনো সুরাহা হয়নি।
“উচ্চ আদালত শুধু বধ্যভূমির জমি উদ্ধার করে সংরক্ষণ করতে বলেনি। পাশাপাশি সেখানে পাহাড়তলী বধ্যভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের আদেশও দিয়েছিলেন। আদেশের পর কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ শুরুর জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক কোটি টাকার বেশি প্রাথমিক বরাদ্দও দিয়েছিল।”
বারবার জেলা প্রশাসনের কাছে গেলেও জমি উদ্ধারে তাদের কোনো উদ্যোগ নেই জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মোস্তফা কামাল যাত্রা বলেন, “আমরা গেলে জেলা প্রশাসক ফাইল আনেন, দেখেন। তারপর আশ্বাস দেন। এরপর আর কিছু এগোয় না। তারপর আবার নতুন জেলা প্রশাসক আসেন। এভাবেই চলছে। তাদের সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না।
“আর চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং সুশীল সমাজও এ বিষয়ে অজানা কারণে নীরব। তারা বধ্যভূমি রক্ষায় কোনো জোরালো ভূমিকা রাখছেন না। কোনো উদ্যোগও নিচ্ছেন না।”
এসব বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি কিছুদিন আগে যোগ দিয়েছি। এই বধ্যভূমি নিয়ে আদালতের আদেশ বা বিস্তারিত কিছুই আমি জানি না। আগে জানি। তারপর দেখব কী করা যায়।”
চট্টগ্রামের বধ্যভূমিতে আলো জ্বেলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ
পাহাড়তলী বধ্যভূমির বেদখল জায়গা উদ্ধারে আন্দোলনের ঘোষণা মেয়রের
বীর মুক্তিযোদ্ধা রাউফুল হোসেন সুজা বলেন, “অনেক শহীদ পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও বর্ধভূমিটি রক্ষার আশায় থেকে থেকে মারা গেছেন। আমাদেরও বয়স হয়েছে। জানি না এর সংরক্ষণ দেখে যেতে পারব কিনা।”
শুক্রবার বধ্যভূমিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নতুন করে রঙ দেয়ার কাজ শেষ হয়েছে। কাটা হয়েছে আশেপাশের ঝোপঝাড়। কিন্তু স্মৃতিস্তম্ভের পিছনের অংশে পড়ে আশে ভাঙা কংক্রিট।
স্তম্ভের অংশটি ছাড়া বধ্যভূমির বাকি অংশ জুড়ে ইউএসটিসির অর্ধনির্মিত ভবন। ওই ভবনের পিছনের অংশ বড় গাছপালায় জঙ্গল হয়ে আছে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো রোববার বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভে থাকছে নানা আয়োজন।