Published : 17 Jul 2026, 11:22 AM
থেমে থেমে ভারি বৃষ্টি, ভেজা পথ আর পথের ক্লান্তি কিছুই দমাতে পারেনি রথযাত্রায় সমবেত জগন্নাথ দেবের ভক্তদের। সব বাধা পেরিয়ে রথের সহযাত্রী হয়েছে চট্টগ্রামে হাজার হাজার মানুষ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর কেন্দ্রস্থল পরিণত হয় যেন এক রথের নগরীতে। রথ আর রথযাত্রায় শামিল হওয়া হাজারো মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে সব পথ।
রথযাত্রার আয়োজন চলতে থাকে দুপুর থেকেই। বিকালে ৪টার পর যখন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে রথ টানা শুরু হল, তখন আকাশ কালো হয়ে আসে ঘন মেঘে। রথের চাকা ঘুরতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর শুরু হয় বৃষ্টি।

তারপরও ভক্তদের উৎসাহ কমেনি। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু, তরুণ-তরুণী সব বয়সি মানুষ সামিল হয়েছিল রথের শোভাযাত্রায়।
বিকালে নগরীর নন্দনকানন রথের পুকুর পাড় এলাকায় কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটির আয়োজনে রথপরিক্রমার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, “সনাতনীদের রথযাত্রা এখন সব সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে। তুলসীধাম ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান।
“তিনশ বছরের প্রাচীন এই কেন্দ্রীয় রথযাত্রা এখন সর্বজনীন উৎসবের রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।”
সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “নন্দনকাননের ঐতিহাসিক রথের পুকুর পাড় আজো এখান থেকে রথপরিক্রমার আয়োজন করে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। হাজারো ভক্তের উপস্থিতি আজ আবারও প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশ সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে।

“এই রথের পুকুর পাড় দখল করে প্রভাবশালীদের স্থাপনা গড়তে দেওয়া হবে না। দখলদারদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
স্বাগত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটির সভাপতি হিরন্ময় ধর বলেন, “তুলসীধামের রথযাত্রা তিনশ বছরের প্রাচীন। ১৮ শ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে চট্টগ্রামে শুরু হয় রথযাত্রা উৎসব। কালের পরিক্রমায় এটি কেন্দ্রীয় রথযাত্রায় রূপ নিয়েছে। রথযাত্রার দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা সনাতনীদের প্রাণের দাবি।”
ঋষিধাম অধিপতি ও তুলসীধামের মোহন্ত শ্রীমৎ দেবদীপানন্দ পুরী মহারাজের পৌরহিত্যে অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামে ভারতীয় মিশনের সহকারী হাই কমিশনার হরিশ কুমার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দীপক কুমার পালিত।

ঢোলের বাদ্য, মঙ্গল শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিয়ে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রকে রথারোহণ করানো হয়। পরে তুলসীধামের মোহন্ত মহারাজের নেতৃত্বে রথের দড়ি টেনে রথ পরিক্রমার উদ্বোধন করেন অতিথিরা।
নগরীর তুলসীধামের রথের সঙ্গে শোভাযাত্রায় অংশ নেয় শ্রীকৃষ্ণায়নের রথ, মনোহরখালী জগন্নাথদেবের মন্দিরের রথ, মাইজপাড়ার জগন্নাথদেবের রথ, শাহাজীপাড়ার জগন্নাথদেবের রথ, ফিরিঙ্গীবাজার টেকপাড়ার রথ, এনায়েতবাজার কেদারনাথ তেওয়ারী কলোনির জগন্নাথদেবের রথ, টাইগারপাস জগন্নাথ সংঘের রথ, গঙ্গাবাড়ী শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথ, পূর্ব মাদারবাড়ীর জগন্নাথদেবের রথ, সদরঘাট জেলে পাড়ার রথসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের রথ।
কক্সবাজার, চকরিয়া, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী, উখিয়া, ফটিকছড়ি, খাগড়াছড়ি, বাঁশখালী, মীরসরাই, সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভক্ত এবং ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।
ভক্তরা পায়ে হেঁটে ও ট্রাকে চড়ে নাম সংকীর্তন ও জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রের জয়ধ্বনি দেন। রথ থেকে ভক্তদের দেওয়া হয় আশীর্বাদ ও প্রসাদ। সেই প্রসাদ পেতে দুই হাত বাড়িয়ে আকুল আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন ভক্তরা।

রথের পরিক্রমা নন্দনকান থেকে নিউ মার্কেট হয়ে লালদীঘির মোড় ঘুরে আন্দরকিল্লা এলাকায় আসে। সেখান থেকে চেরাগী পাহাড় হয়ে প্রেসক্লাব ঘুরে লাভ লেইন সড়ক দিয়ে পুনরায় নন্দনকানন রথের পুকুর পাড় এসে শেষ হয়।
চেরাগী পাহাড় মোড়ে রথের রশি টানতে থাকা সমবেত ভক্তদলের একজন সুজন দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গুরুজনরা বলেছেন রথের দড়ি টানলে পুন্য হয়। তাই বন্ধুদের নিয়ে রথযাত্রায় এসেছি। ঘণ্টা খানেক ধরে অপেক্ষা করেছি। বৃষ্টি কোনো ব্যাপার না। দেখছেন না কত মানুষ। কেউ রথ না টেনে ঘরে ফিরবে না।”

এদিকে নন্দনকানন শ্রী শ্রী রাধামাধব মন্দিরের (ইসকন মন্দির) রথযাত্রাটি শুরু হয় বিকেলে ডিসি হিল এলাকা থেকে। চেরাগী পাহাড়, আন্দরকিল্লা, লালদীঘির পাড়, কোতোয়ালি মোড়, নিউ মার্কেট, আমতল, বোস ব্রাদার্স মোড় হয়ে নন্দনকাননে গিয়ে শেষ হয়।
অন্যদিকে প্রবর্তক মোড় থেকে প্রবর্তক ইসকন শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের আয়োজনে আরেকটি রথযাত্রা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মন্দিরের অধ্যক্ষ দারুব্রহ্ম জগন্নাথ দাশ ব্রহ্মচারী। প্রধান অতিথি ছিলেন মেয়র শাহাদাত হোসেন। উদ্বোধক ছিলেন মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শ্রীপাদ গৌর দাস ব্রহ্মচারী।
এই রথযাত্রাটি গোলপাহাড় মোড়, মেহেদীবাগ, চট্টেশ্বরী মোড়, কাজীর দেউরি মোড়, জামালখান মোড়, চেরাগী পাহাড়, আন্দরকিল্লা, বক্সির বিট, লালদিঘীর পাড়, কোতোয়ালি মোড় হয়ে কে সি দে রোডে গিয়ে শেষ হয়।

এছাড়া নগরীর গোলপাহাড় মহাশ্মশান কালী মন্দির থেকেও রথযাত্রা হয়।
একাধিক রথযাত্রার কারণে বিকেল থেকে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নগরীর কেন্দ্রে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজট দেখ যায়।

সন্ধ্যা ৭টার পরও নগরীর জে এম সেন হলের অদূরের মূল সড়ক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল কয়েকটি রথ। তখন দিনের আলো নিভে গেছে। পথ চলতি ভক্তরা শেষবারের মত জগন্নাথ দেবের রথের আলোয় যেন আশার আলো খুঁজে নিয়ে ঘরে ফিরছিলেন।