সড়কে সাইকেল ট্র্যাক, ‘জানেনই না’ গাড়িচালকরা
“কিছুদিন পর হকারদের মেলা বসবে,” ফেইসবুকে মন্তব্য করেন একজন।
চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় বিমানবন্দর সড়কে সাইকেল ট্র্যাক উদ্বোধনের পরের দিন থেকেই সেটি গাড়ি রাখার জায়গায় পরিণত হয়েছে।
দুই দিন আগেই শুক্রবার দুই দশমিক দুই কিলোমিটার দীর্ঘ সাইকেল ট্র্যাকটি উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কিন্তু শনিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়ে; তাতে দেখা যায়, সাইকেল ট্র্যাকে প্রাইভেট কার ও ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে নগরবাসী বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকেন। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নগরীর ফুটপাতগুলোর মতো সাইকেল ট্র্যাকও দখল হয়ে যেতে পারে।
সেদিন বিকালে এক অনুষ্ঠানে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেয়র শাহাদাত হোসেন।
তার পরদিন রোববার দুপুরে সিটি করপোরেশনের একটি দল অভিযান চালায়।
সিটি করপারেশনের কর্মকর্তা প্রণয় চাকমার বলেছেন, গাড়িচালকরা দাবি করেছেন তারা ‘জানেন না’ যে এটা সাইকেল চালানোর জন্য নির্ধারিত বিশেষ ট্র্যাক। আলাদা ফাঁকা জায়গা দেখে তারা গাড়ি রেখেছেন।
শুক্রবার বিমানবন্দর সড়কে সাইকেল ট্র্যাকটি উদ্বোধন করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেছিলেন, “চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন জায়গায় যাতে মানুষ সাইকেলে যাতায়াত করতে পারে, বিনোদনের জন্য ও শরীর চর্চার জন্য যেতে পারে, অনেকগুলো ট্র্যাক করা হবে ক্রমান্বয়ে।
“মানুষকে বাইরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। হাঁটার জন্য পথ করে দিতে হবে। সাইকেল চালানোর জন্য পথ করে দিতে হবে। এগুলো একটা নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা; এটা কোনো লাক্সারি না। একটি সভ্য, উন্নত দেশে সাধারণ নাগরিকের এগুলো চাহিদা। এগুলো আমাদেরকে পূরণ করতে হবে।”
পরদিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখায় যায় ট্র্যাকে গাড়ি রাখা।
এ নিয়ে এক ফেইসবুক পোস্টে মো. মঈন উদ্দিন নামের একজন মন্তব্য করেন, “কয়েকদিন পর চায়ের দোকান দিবে।”
ফোরকান আহমেদ নামের আরেকজন মন্তব্য করেন, “কিছুদিন পর হকারদের মেলা বসবে।”
শফিউল আলম আবু নামের একজন ফেইসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “বিমান বন্দর এলাকায় ব্যাটারি চালিত টমটম গাড়ির উৎপাত বেশি। কিছুদিনের মধ্যে না জানি এইটা ওদের দখলে চলে না যায়।”
সাইকেল ট্র্যাকে গাড়ি ঢুকছে যেভাবে
সাইকেল ট্র্যাকে প্রাইভেট কার, লরি বা কাভার্ডভ্যানের মতো বড় গাড়ি ঢুকছে কীভাবে?
সাইকেল ট্র্যাকটি মূল সড়কের লাগোয়া। সড়ক থেকে এটিকে পৃথক রাখতে ফুলের কেয়ারী তৈরি করা হয়েছে। সেখানে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছ।
এসব ফুলের কেয়ারীর মাঝে কোনো কোনো অংশে বড় আকারের ফাঁকা অংশ রয়েছে। এই ফাঁকা অংশ ব্যবহার করেই বড় গাড়ি ঢুকে পড়ছে সাইকেল ট্র্যাকে।
চালকরা ‘জানেনই না’ এটা ট্র্যাক
শনিবার বিকালে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাইকেল ট্র্যাকে গাড়ি রাখার প্রসঙ্গ টেনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, “গতকাল বাংলাদেশের প্রথম ২ দশমিক ২ কিলোমিটার সাইকেল ট্র্যাক পরিদর্শন করেছি। আজ সেখানে একটি লরি রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি আমাদের নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিচয়? কেউ যদি সাইকেল ট্র্যাক দখল করে, ফুটপাত দখল করে বা নগরীর কোনো স্থাপনা নষ্ট করে, তাহলে শুধু মেয়র বা সিটি করপোরেশনকে দোষারোপ না করে নাগরিকদেরও প্রতিবাদ করতে হবে।”
মেয়র বলেন, “শুধু সচেতনতার কথা বললেই হবে না, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যখন দেখবে কোনো অনিয়মের জন্য জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তখন অন্যরাও আইন মেনে চলতে উৎসাহিত হবে।
“গণসচেতনতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে আইনের প্রয়োগ ও দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।”
পরদিন রোববার থেকেই সাইকেল ট্র্যাকে রাখা গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।
সিটি করপোরেশনের অভিযানে ট্র্যাকে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়।
এছাড়া একটি প্রাইভেট কারকে ৩ হাজার টাকা এবং ইনকনট্রেন্ড লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি মিনি কাভার্ডভ্যানকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে চালকরা ট্র্যাকে গাড়ি রেখেছেন, তাদের দাবি তারা জানেনেই না ওটা সাইকেলের জন্য আলাদা ট্র্যাক। ফাঁকা জায়গা দেখে তারা গাড়ি নিয়ে বসে ছিল।
“স্থানীয় লোকজন বলেছেন, তারা আর ট্র্যাকে গাড়ি পার্কিং করতে দেবেন না। আসলে এটার জন্য সচেতনতা প্রয়োজন। সাইকেল ট্র্যাক নির্দেশক কিছু সাইন পোস্ট দিতে হবে।”
সাইকেল ট্র্যাকের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা, অবৈধ পার্কিং প্রতিরোধ এবং নগরবাসীর নির্বিঘ্নে সাইকেল চলাচলের পরিবেশ বজায় রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে, বলেন তিনি।
সাইকেল ট্র্যাকে গাড়ি রাখা বন্ধে কী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
সিটি করপোরেশনের এই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “সাইকেল ট্র্যাক পুরো উন্মুক্ত না রাখতে ফ্লাওয়ার বেড করা হয়েছে। কিন্তু দুই ফ্লাওয়ার বেডের মাঝে কিছু কিছু অংশে বড় আকারের গ্যাপ আছে।
“সেই গ্যাপ দিয়েই গাড়ি ট্র্যাকে উঠে পড়ছে। এই গ্যাপগুলো টোটাল বন্ধ করতে হবে। শুধু সাইকেল প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য ছোট জায়গা রাখতে হবে। এটা যাতে করা হয় সেজন্য আমরা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জানাব। ফাঁকা অংশগুলোও ফ্লাওয়ার বেড দিয়ে ঘিরে ফেললে আর বড় গাড়ি ঢুকতে পারবে না।”
আগের খবর:
