Published : 28 Sep 2025, 04:05 PM
এক দিকে দশভূজা, অন্যদিকে দশানন; সবার পরনে ছৌ নাচের কস্টিউম!
পূজার বাদ্য নয়, যেন নৃত্য যুদ্ধের দামামা বাজছে। দক্ষিণ নালাপাড়ায় পূজা মণ্ডপ যেন এক টুকরো লঙ্কা।
ঐতিহ্যবাহী ছৌ নৃত্য আর রামায়নের লঙ্কা কাণ্ডকে সমন্বিত করে চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়ায় পূজা উদযাপন পরিষদ এবার তাদের পূজার ‘থিম’ ঠিক করেছে হয়েছে ‘ছৌ কলায় লঙ্কাকাণ্ড’।
ছৌ নাচ হল ভারতীয় আদিবাসী যুদ্ধনৃত্য। সেখানে রামায়ন, মহাভারত বা ধর্মীয় অ্যাখ্যান এবং গ্রাম্যগীতির কথা পরিবেশন করেন শিল্পীরা। ২০১০ সালে ছৌ নৃত্য ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নেয়।
আর রামায়নের 'লঙ্কা কাণ্ড' হল যুদ্ধের পর্ব। সীতা হরণের পর তাকে উদ্ধারে লঙ্কায় যাওয়া রাম ও লঙ্কাপতি রাবনের মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধ হয় এই পর্বে।

লঙ্কাকাণ্ডে রাবন বধের পর তার ভাই বিভীষণকে লঙ্কার রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করেন রাম। রাবন বধের আগে শরৎকালে দেবী দুর্গার বোধন করেছিলেন তিনি। তাই শরতের এই দুর্গা পূজা পরিচিতি পায় 'অকাল বোধন' নামে।
পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্যরা জানান, ছৌ নৃত্যের মাধ্যমে যেসব ধর্মীয় আখ্যান পরিবেশিত হয়, তার মধ্যে কৃত্তিবাস ওঝার কৃত্তিবাসী রামায়ন বা শ্রী রাম পাঁচালীর ষষ্ঠ খণ্ড ‘লঙ্কাকাণ্ডকে’ তারা তাদের পূজার উপজীব্য করেছেন।
চট্টগ্রামের সর্বজনীন এ পূজা মণ্ডপের বয়স এবার ৭৭ হয়েছে। প্রতিবারই বৈচিত্র্যময় ভাবধারায় সাজিয়ে তোলা হয় এ মণ্ডপ।
এবারের পূজার ‘থিম’ ব্যাখ্যা করে পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্য রাজীব বিশ্বাস রাজা বলেন, “কৃত্তিবাসী রামায়নের মাধ্যমে আমরা এবছর বার্তা দিচ্ছি দুষ্টের দমন, ধর্মের বিজয়কে। যেটি বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে খুবই প্রয়োজনীয় বলে আমরা মনে করছি। সে কারণে এবার আমরা আমাদের থিমের নাম দিয়েছি ‘ছৌ কলায় লঙ্কাকাণ্ড’।”

বাঙালি হিন্দু বিশ্বাসে, দেবী দুর্গা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের দেবী। অশুভ শক্তিকে দমন করে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা হয় দেবীর হাতে। একইসঙ্গে তিনি ‘মাতৃরূপেণ’, ‘শক্তিরূপেণ’।
গত ২১ সেপ্টেম্বর মহালয়ার দিন সূচনা হয়েছে দেবীপক্ষের, আগামী ৬ অক্টোবর কোজাগিরী পূর্ণিমার মধ্যে দিয়ে এ পক্ষের শেষ হবে।
সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন হয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। আশ্বিন মাসের এই শুক্ল পক্ষকেই দেবীপক্ষ বলা হয়।
ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় দেবীর নিদ্রাভঙ্গের বন্দনায় শুরু হয় বাঙালী হিন্দুদের প্রধান এ ধর্মীয় উৎসবের, যার সাঙ্গ হয় বিজয়া দশমীতে।
শনিবার রাতে দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা মণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, আয়োজক ও শিল্পীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমার পাশাপাশি ছৌ নৃত্যের আদলে মুখোশ আর রণসজ্জায় দেখা গেল অন্য সব দেবদেবীকে।

মণ্ডপের প্রবেশ পথে দেবী দুর্গাকে দেখা যায় শরতের কাশবন আর ধান ক্ষেত পেরিয়ে হেঁটে যেতে। এ যেন বাংলার প্রকৃতির সাথে পুরুলিয়ার ছৌ আর পৌরাণিক কাহিনীর এক অনন্য মেলবন্ধন।
আয়োজকরা জানালেন, তাদের পূজা মণ্ডপের এবারের সৃজন ভাবনায় আছেন শিল্পী বিশ্বজিৎ আইচ। প্রতিমা তৈরি করেছেন উত্তম পাল। আর আলোকসজ্জা করেছে নাট্যশোভা।
পূজা কমিটির সদস্য রাজীব বিশ্বাসের আশা, অতীতের মত তাদের এবারের পূজার ভাবনাও দর্শনার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলবে।

তিনি জানান, প্রতিমা ও মণ্ডপের সাজ সজ্জায় এবার মাটি, চট ও গাছের বাকল ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতীমার পোশাক পরিচ্ছদ বা অবয়বে ছৌ নৃত্যের শিল্পীদের প্রতীকী ভাব রাখা হয়েছে পুরোপুরিভাবে।
রাজীব বিশ্বাসের দাবি, মণ্ডপে তাদের যে আলোকসজ্জা, সেটাও পরিবেশবিরুদ্ধ নয়। পরিবেশবান্ধব সাধারণ লাইটের মাধ্যমে ‘অসাধারণ কিছু’ চিত্রায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগে ব্যক্তিগতভাবে পূজা আয়োজন করা হলেও ১৯৪৭ সাল থেকে দক্ষিণ নালাপাড়ায় সর্বজনীন পূজা হয়ে আসছে।
“বিভিন্ন সময়ে আমরা বৈচিত্র্যময় কিছু করার চেষ্টা করি। এবারও সে ধরনের চিন্তা থেকে ‘ছৌ কলায় লঙ্কাকাণ্ড’ বিষয়টি উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।”