Published : 07 Nov 2025, 09:20 PM
বিদেশে পালিয়ে থাকা চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদের ‘নির্দেশে’ সরোয়ার হোসেন বাবলাকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা।
শুক্রবার নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সরোয়ার হত্যার ঘটনায় তার বাবার করা মামলায় এক নম্বর আসামিও করা হয়েছে বড় সাজ্জাদকে।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি জসিম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ওসি বলেন, সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের বাদী হয়ে করা মামলায় সাতজনের নাম দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত পরিচয় আরও ১৫/১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, আসামির তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে সাজ্জাদের নাম। সেখানে নাম লেখা হয়েছে, মো. সাজ্জাদ। বাবার নাম আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টর। আর ঠিকানা চালিতাতলী এলাকা।

অন্য আসামিরা হলেন- মো. রায়হান, মোবারক হোসেন ইমন, বোরহান, আলাউদ্দিন, মো. হেলাল ও নিজাম উদ্দিন হাবিব।
এদের মধ্যে আলাউদ্দিন ও হেলালকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খোন্দকীয়া পাড়ায় জনসংযোগ করছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। এসময় গুলিতে নিহত হন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। আহত হন এরশাদ উল্লাহসহ চারজন।
মামলায় সরোয়ারের বাবা কাদের অভিযোগ করেন, ব্যবসায়িক কারণে আসামিদের সঙ্গে সরোয়ারের কয়েক বছর থেকে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন সময়ে তারা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
গত মার্চ মাসে বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় প্রাইভেট কারে গুলি করা ঘটনাটিও সরোয়ারকে নিশানা করে ঘটনানো হয়েছিল, সেখানে দুইজন নিহত হন। সেদিন ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান বলে মামলায় বলেছেন তার বাবা।
মামলায় কাদের অভিযোগ করেছেন, “গত সপ্তাহে সাজ্জাদ বিদেশ থেকে সরোয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করে ‘তোমার সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নাও’ বলেও হুমকি দিয়েছেন।”
বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর ‘নির্বাচনি প্রচারণায়’ হামলার কথাটি লিখে এজাহারে বলা হয়েছে, “সাজ্জাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশে অন্যরা সরোয়ারকে হত্যার উদ্দেশ্যে পেছন থেকে এলোপাথাড়ি গুলি করে। সরোয়ার মাটিতে পড়ে গেলে মৃত্যু নিশ্চিত করতে আরও কয়েক রাউন্ড গুলি করে।”
সরোয়ারের গলা, থুতনি, পেট. পিঠ এবং ঘাড়ে মোট সাতটি গুলি লাগে বলে এজাহারে বলা হয়েছে।

কে এই বড় সাজ্জাদ?
চালিতাতলী এলাকারই আব্দুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে সাজ্জাদের নাম আলোচনায় আসে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। তখন ইসলামী ছাত্র শিবিরের ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত এই যুবক খুনসহ অনেক মামলার আসামি হন।
১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খান বাড়ির সামনে খুন হয়। ওই সময় লিয়াকত হত্যায় সাজ্জাদের নাম উঠে আসে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে ওই মামলা থেকে খালাস পেয়ে যান তিনি। এরপর থেকে অপরাধ জগতে ছড়িয়ে যায় তার নাম।
২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে আট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হত্যায় নিম্ন আদালতে সাজ্জাদের ফাঁসির রায় হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত থেকে এ মামলায় খালাস পান তিনি।
২০০০ সালে একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে সাজ্জাদ দুবাই পালিয়ে যান বলে গুঞ্জন আছে। তাকে ধরতে ইন্টারপোলে ‘রেড নোটিস’ এখনও ঝুলছে, যেখানে তার নাম লেখা- সাজ্জাদ হোসেন খান।
চট্টগ্রামে থাকাকালে নুরুন্নবী ম্যাক্সন ও সরোয়ার হোসেন বাবলাকে নিয়ে অপরাধ জগৎ দাপিয়ে বেড়াতেন সাজ্জাদ।
২০১১ সালের জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিঙ্গারবিল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন ম্যাক্সন। তার দেওয়া তথ্যে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকা থেকে সরোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
তখন সরোয়ার ও ম্যাক্সনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি একে-৪৭ রাইফেল, দুটি পিস্তল, একটি এলজি, একে-৪৭ রাইফেলের দুটি ম্যাগাজিন ও গুলি।
কারাগারে থাকাকালে সরোয়ার ও ম্যাক্সনের সঙ্গে সাজ্জাদের বিরোধ বাঁধে বলে প্রচার আছে। ২০১৭ সালে জামিনে ছাড়া পেয়ে কাতারে চলে যান সরোয়ার ও ম্যাক্সন।
প্রায় তিন বছর কাতারে ছিলেন সরোয়ার। আর ম্যাক্সন সেখান থেকে ভারতে পালিয়ে যান। কাতারে মারামারির এক ঘটনায় পুলিশ সরোয়ারকে আটক করে এক মাসের সাজা দেয়। সাজা শেষে সরোয়ারকে তারা দেশে পাঠিয়ে দিলে ২০২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দরে পুলিশ তাকে আটক করে।
বিয়ে করে ভারতে স্থায়ী হওয়া ম্যাক্সন ২০২২ সালে সেখানে মারা যায়। তার পরিবার বাংলাদেশের পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল তার স্ত্রী তাকে খুন করে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রচার করেছে।
সরোয়ার ও ম্যাক্সন দল থেকে সরে যাওয়ার পরও বিদেশে বসে চট্টগ্রামে বিভিন্ন সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে দল চালানো ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে বলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য আছে।

কেন এ দ্বন্দ্ব?
বায়েজীদ এলাকায় চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কিছু নিয়ে সরোয়ারের সঙ্গে ছোট সাজ্জাদের দ্বন্দ্ব। আর ছোট সাজ্জাদ বাহিনীকে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে তিনি।
চট্টগ্রামে বড় সাজ্জাদের অস্ত্রের ভাণ্ডারের দেখভাল করেন ছোট সাজ্জাদ ওরফে বুড়ির নাতি সাজ্জাদ। ছোট সাজ্জাদ বর্তমানে কারাগারে আছেন। এখন রায়হান দলের নেতৃত্বে আছেন।
সরোয়ারের মেঝ ভাই আলমগীরের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন বারবার সরোয়ারকে নিশানা করা হচ্ছিল?
এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, “অনেক বিষয় জড়িত আছে। যদি সাহস করে লিখতে পারবেন বলেন, তাহলে বাসায় আসবেন, সব বলব।”
সরোয়ারের বাবা কাদেরের দাবি, ব্যবসার দখল নিতে তার ছেলেকে খুন করার জন্য নিশানা করা হয়েছিল।
তার ভাষ্য, সরোয়ার ইট, বালি, লোহার ব্যবসা করেন। পাশাপাশি মাটি ভরাটের কাজও করেন। বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এ কারণে সরোয়ারকে খুন করা হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ বলছে, বছর কয়েক ধরে বায়েজীদ এলাকা ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন এলাকা এবং জেলার রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন স্থানে ‘রাজত্ব তৈরিতে’ অনুসারী গড়ে তুলেছেন বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদ। পাশাপাশি বালুর মহালও নিয়ন্ত্রণ করেন।
কিন্তু সেসব স্থানে বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের চাঁদা নিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সরোয়ার। তা নিয়েও মনক্ষুণ্ন বড় সাজ্জাদ।
আবার বিভিন্ন এলাকায় বড় সাজ্জাদের হয়ে চাঁদা না পেয়ে গুলি বর্ষণের যেসব ঘটনা সাজ্জাদ অনুসারীরা ঘটিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন। সাজ্জাদের ধারণা, সেগুলো সরোয়ার করতেন।
পাশাপাশি বায়েজিদ এলাকায় নির্মাণাধীন ভবন ও টেম্পু স্ট্যান্ডের চাঁদাবাজিতেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় সরোয়ার।
সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজও বুধবার হাসপাতালে সন্দেহ প্রকাশ করেন, এ খুনে বিদেশ থেকে ইন্ধন থাকতে পারে।
আগের খবর:
সরোয়ার হত্যায় জড়িত সন্দেহে যুবদল নেতাসহ গ্রেপ্তার ২
ছিলেন সাজ্জাদের সাগরেদ, দিলেন টক্কর, সেটাই কাল হলো সরোয়ারের?
সরোয়ারকে 'টার্গেট' করে হামলা, বলছেন সিএমপি কমিশনার
চট্টগ্রামে জনসংযোগের সময় গুলিতে নিহত ১, বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ হাসপাতালে
হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বিদেশে, 'চাঁদাবাজি' দেশে
চট্টগ্রামের তালিকাভুক্ত 'সন্ত্রাসী' ম্যাক্সনের কলকাতায় মৃত্যুর খবর