Published : 23 Jun 2025, 12:07 AM
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল-এনসিটি পরিচালনায় দেশি বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়াট টেক লিমিটেডের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে।
এই পরিস্থিতিতে টার্মিনালটি নিজেরাই পরিচালনার ‘প্রস্তুতি’ নিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশিদের অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
এ নিয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশের পাশাপাশি বিরোধিতাকারীদের ‘প্রতিহত’ করার আহ্বানও জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
অপরদিকে, এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন কর্মসূচি পালন করেছে। এমনকি এই সিদ্ধান্তসহ সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ২৭-২৮ জুন চট্টগ্রাম অভিমুখে রোডমার্চেরও ঘোষণা দিয়েছে ‘সাম্রাজবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম।
এমন প্রেক্ষাপটে ৬ জুলাই এনসিটি পরিচালনায় দেশি বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেকের চলতি মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
আগামী ছয় মাস এনসিটি পরিচালনা চট্টগ্রাম বন্দরের হাতে রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাইফ পাওয়ারের সাথে চুক্তি শেষ হওয়ার পর কীভাবে এনসিটি সচল রাখা যায় সে চিন্তা করা হচ্ছে।
“বন্দর তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কীভাবে টার্মিনাল পরিচালনা করবে সে প্রস্তুতিও নিচ্ছে। পরবর্তী ছয় মাস অথবা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে নতুন অপারেটর নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বন্দর এটি পরিচালনা করতে পারে।
“সবমিলিয়ে মন্ত্রণালয় যেভাবে চাইবে সেভাবে হবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখনই এ নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। যখন সিদ্ধান্ত হবে তখন জানতে পারবেন।”
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসির উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামনে এনসিটি পরিচালনায় সাইফ পাওয়ারের সাথে চুক্তি শেষ হচ্ছে। পরবর্তী করণীয় জানতে চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।”
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কন্টেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এনসিটি। এই টার্মিনালের ৫টি জেটির মধ্যে চারটিতে কন্টেইনারবাহী বড় জাহাজ এবং অন্য একটি জেটিতে অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী ছোট জাহাজ ভেড়ানো হয়।

বন্দরে যত কন্টেইনার ওঠা-নামা করে তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় এনসিটিতে। ২০২৪ সালে মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর ৪৪ শতাংশ হয়েছে এই টার্মিনালে।
বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এনসিটির পাঁচটি জেটি নির্মাণ কাজ শেষ হয়। নির্মাণ কাজে বন্দরের খরচ হয়েছিল ৪৬৯ কোটি টাকা।
এর দুই বছর পর এনসিটির জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে বিনিয়োগ করার শর্তে পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছিল। তখন বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আগ্রহী ছিল। পরে সেই দরপত্র বাতিল করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
তারপর টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য ২০১২ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর দরপত্র সংশোধনের নামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে পরবর্তীতে মামলা হলে টার্মিনাল পরিচালনা ঝুলে যায়।
নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ২৫ জুন এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সাথে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ার টেক এবং এর দুই অংশীদার প্রতিষ্ঠান।
সে বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এনসিটির ২ ও ৩ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সাথে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড।
দরপত্রের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটি এনসিটি পরিচালনার ওই দায়িত্ব পেয়েছিল। ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর এনসিটিতে কন্টেইনার ওঠানামার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
পরবর্তীতে এনসিটি পরিচালনায় আর দরপত্র ডাকা হয়নি। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) প্রতিবার ছয় মাসের জন্য এনসিটির টার্মিনালগুলো পরিচালনা করে আসছিল সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড।
টানা ১১ বার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনা করে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। এরপর দ্বাদশতম বারের মত আরও ছয় মাসের জন্য তাদের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শুরু থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনায় কী-গ্যান্ট্রি ক্রেন ও রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ খরচ করেছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
এনসিটিতে বছরে ১০ লাখ একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সক্ষমতা আছে। ২০২৪ সালে দেশি বেসরকারি অপারেটর এনসিটিতে ১২ লাখ ৮১ হাজার একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখনই এনসিটি পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত-ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আলোচনায় আসে।
গত বছরের ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর অর্ন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের মত অর্ন্তবর্তী সরকারও এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগে আগ্রহের কথা জানায়। এবারও আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে অবস্থান জানানোর পর বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল, বিভিন্ন বাম সংগঠন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে ইতিমধ্যে।
পুরনো খবর:
'বন্দরে বিদেশি কোম্পানি': ঢাকা-চট্টগ্রাম ২ দিনের রোডমার্চ ঘোষণা
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটির 'ইজারা' প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি স্কপের
চট্টগ্রাম বন্দর-করিডোর নিয়ে মত না বদলালে ঈদের পর লং মার্চ: সিপিবি
চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের আলোচনা দ্রুত নিষ্পত্তি করুন: ইউনূস
বাংলাদেশে 'বিনিয়োগে আগ্রহী' ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এপি মোলার-মেয়ার্স্ক
বন্দর বিদেশিদের দেওয়ার বিরোধিতাকারীদের ‘প্রতিহত’ করুন: প্রধান উপদেষ্টা
এনসিটির আরও দুই জেটি পেল সাইফ পাওয়ার