Published : 06 Jan 2026, 12:08 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ‘আলোচিত’ প্রার্থী জসীম উদ্দিন আহমদের সম্পদ বেড়ে প্রায় এক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে।
২০২৪ সালে তিনি চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে জয় পেয়েছিলেন।
সে সময় জসীম উদ্দিনের দেওয়া হলফনামা ও এবারের সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামার তথ্য পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় জসীম উদ্দিন ২০২৩-২০২৪ করবর্ষে আয়কর রিটার্নের যে তথ্য দিয়েছেন, সেখানে বার্ষিক আয় ১ কোটি ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ টাকা দেখানো হয়।
আয়কর রিটার্নের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় বিএনপির এই প্রার্থীর ২১ কোটি ৩০ লাখ ২১ হাজার ৫৬৭ টাকার সম্পদ ছিল। ওই বছর তিনি ৩২ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৫ টাকার আয়কর পরিশোধের তথ্য দিয়েছিলেন।
সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় ২০২৫-২০২৬ করবর্ষে দাখিল করা রিটার্নে জসীম উদ্দিন বার্ষিক আয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৬ টাকা দেখিয়েছেন। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে ৪০ কোটি ৫৮ লাখ ২১ হাজার ১৩ টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দিয়েছেন তিনি। আয়কর দিয়েছেন ১ কোটি ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৫১ টাকা।
আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে ‘ঘনিষ্টতার’ কারণে তাকে নিয়ে আছে সমালোচনা।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি মামলায় জসীম উদ্দিনকে আসামি করা হয়েছিল। ঢাকার বাড্ডা থানার একটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।
নানা নাটকীয়তার পর বিএনপি শেষ মুহূর্তে এসে এ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে চন্দনাইশের সাবেক এই উপজেলা চেয়ারম্যানকে।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা ও সাতকানিয়া উপজেলার কেওচিয়া, কালিয়াইশ, বাজালিয়া, ধর্মপুর, পুরানগড় ও খাগড়িয়া ইউনিয়নে নিয়ে গঠিত এ আসন।
প্রথম দুই দফায় দেশের বিভিন্ন আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও বিএনপি এই আসনটি ফাঁকা রাখে। বিএনপির টিকেটে সেখানে নির্বাচন করতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুরের ছোট ভাই চিকিৎসক মহসিন জিল্লুরসহ অনেকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন।
তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনের আগে ২৮ ডিসেম্বর বিএনপি জসীম উদ্দিনকে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকে দলের ভেতরে এবং বাইরে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতাদের সঙ্গে জসীম উদ্দিনের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় ‘ব্যবসায়ী’ জসীম উদ্দিন কৃষিখাত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, ঘর এবং বাণিজ্যিক স্থান থেকে ভাড়া থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩৬ টাকা বার্ষিক আয়ের তথ্য দিয়েছেন। মূলধনী আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ২০ লাখ ৬২ হাজার ১০০ টাকা।
এছাড়াও দেশের বাইরে ১৩ লাখ ১ হাজার ৪৩০ টাকা মূলধন থাকার কথা রয়েছে তার হলফনামায়।
এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় জসীম উদ্দিন বার্ষিক আয় দেখান ঘর ও বাণিজ্যিক স্থান থেকে ভাড়ার ১ কোটি ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ টাকা। তখন বিদেশে বিনিয়োগ থেকে ৬৩ লাখ ৯ হাজার ৫৯২ টাকা আয়ের তথ্য দেন তিনি।
বিএনপির প্রার্থী জসীম সংসদ নির্বাচনে যে হলনামা দিয়েছেন সেখানে লিখেছেন, তার নগদ আছে ১৫ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৯ টাকা। তার ‘ব্যবসায়ী’ স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির কাছে নগদ টাকা আছে ১৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ টাকা। তবে তাদের ব্যাংক হিসাবে কোনো জমা টাকা না থাকার কথা বলেছেন।
শেয়ার, বন্ড ও ঋণপত্র থেকে জসীম উদ্দিনের আয় ১৪ লাখ টাকা ও তার স্ত্রীর ১১ লাখ টাকা। নিজের নামে ৩৬ লাখ ৭ হাজার ২০৪ টাকার বীমা থাকলেও স্ত্রীর নামে নেই। নিজের গাড়ির দাম ৩৬ লাখ ১০ হাজার আর স্ত্রীর গাড়ির দাম ৪০ লাখ।
সব মিলিয়ে সাবেক এই উপজেলা চেয়ারম্যান তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করেছেন ১৫ কোটি ৯২ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৩ টাকার। আর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের মূল্যমান ৭৩ লাখ ৭ হাজার ৩০০ টাকা।
জসীম উদ্দিনের স্থাবর সম্পদের মধ্যে ১ কোটি ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা দামের কৃষি জমি, ৫ কোটি ১৯ লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দামের অকৃষি জমি, ১৫ লাখ টাকা দামের দোকান ও ১ কোটি ১১ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টাকা দামের সাততলা একটি ভবন থাকার কথা বলেছেন।
২০২৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে তার কোনো ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার তথ্য না দিলেও এবার তিনি চন্দনাইশে দুইটি বাড়ি, নগরীর খুলশীতে পাঁচটি, পাঁচলাইশে তিনটি এবং কক্সবাজারে ছোট বড় মিলিয়ে ৩৬টি ফ্ল্যাটের তথ্য হলফনামায় দিয়েছেন। তার এসব সম্পদের মূল্যমান দেখানো হয়েছে ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫০টাকা।
আর খুলশী এলাকার স্ত্রীর নামে থাকা ২ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা দামের ফ্ল্যাটের থাকার তথ্য দিয়েছেন বিএনপির এই প্রার্থী।
সব মিলিয়ে জসীম উদ্দিন নিজের ২৪ কোটি ৬৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকার স্থাবর সম্পদ থাকার তথ্য দিয়েছেন।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় দেওয়া হলফনামায় তিনি তার হাতে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭৯১ টাকা নগদ থাকার তথ্য দিয়েছেন। তখন তার স্ত্রীর নগদ ছিল ৪ হাজার ৫০০ টাকা।
জসীম উদ্দিন নিজের ব্যাংক হিসাবে জমার পরিমাণ দেখিয়েছিলেন ২৭ লাখ ৫৭৬ টাকা, আর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে তখন ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা জমার কথা বলেছিলেন।
সব মিলিয়ে উপজেলা নির্বাচনের আগে তার অস্থাবর সম্পদের মূল্য ছিল ৭ কোটি ১৮ লাখ ৫ হাজার ৩৬৭ টাকা। আর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের মূল্য উল্লেখ করেছিলেন ৭২ লাখ ১৫ হাজার ৯৩০ টাকা।
দুই বছরের কম সময় আগে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে জসীম তার স্থাবর সম্পদ হিসেবে ২০ কোটি ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার ২০০ টাকার অকৃষি জমির হিসেব দিয়েছিলেন। আর ১৬ শতক কৃষি জমির দাম ‘অজানা’ উল্লেখ করেছিলেন।
এবার হলফনামায় জসীম সোনালী ব্যাংক থেকে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৬০৫ টাকা ঋণের তথ্য দিয়েছেন। আর ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের হলফনামায় তিনি পদ্মা ব্যাংক থেকে ৬০ কোটি ও সোনালী ব্যাংক থেকে ১১ কোটি ৬৩ লাখ ৯ হাজার ৮২২ টাকার ঋণের তথ্য দিয়েছিলেন।
আগের খবর:
হলফনামা: চট্টগ্রামে জামায়াতের কোটিপতি ৪ চিকিৎসক, স্ত্রীরাও কোটিপতি