Published : 08 Jun 2026, 10:23 PM
চট্টগ্রাম বন্দরের আলোচিত নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড, কসমস এন্টারপ্রাইজ এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড নিয়ে গঠিত তিন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম।
২৯ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এই কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাবটি দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে জানা যায় সোমবার।
গত বৃহস্পতিবার এক চিঠিতে এনসিটি ইজারায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
এই নির্দেশ সামনে আসার পর প্রায় দেড় মাস আগের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়টি জানা গেল।
‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’ নামে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন, কসমস এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজিং পার্টনার হাসিন বিন আশরাফ এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেনের সই রয়েছে।
এরমধ্যে সাইপ পাওয়ারটেক লিমিটেড ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।
কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান, যিনি লহ্মীপুর-৪ আসনে বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে।
অন্যদিকে লহ্মীপুর-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম আছেন এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে।
প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা দীর্ঘমেয়াদে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছি, ইজারা নয়। এই সময়ে রেভিনিউ (মাশুল) আদায় করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
“১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছি। এই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে জ্বালানি, লুব্রিকেন্ট, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সংক্রান্ত কোনো মূলধনী বা পরিচালন ব্যয় বহন করতে হবে না। সব ব্যয় আমরা করব। পাশাপাশি টার্মিনালের পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকবে বন্দরের হাতে।”
কনসোর্টিয়ামের এই প্রস্তাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অডিট রিপোর্ট উদ্ধৃত করে বলা হয়, প্রতি টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনারকে একক ধরে) কন্টেইনারে বন্দরের আয় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার আর অপারেটরের বিলসহ মোট ব্যয় হয় ৫৬ দশমিক ১৫ মার্কিন ডলার।
এতে প্রতি একক কন্টেইনারে বন্দরের নিট আয় হয় ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার।
কনসোর্টিয়ামের দেওয়া নতুন পরিচালনা প্রস্তাবে প্রতি একক কন্টেইনার পরিচালনা বাবদ ৬৯ ডলার চেয়েছে তিন কোম্পানির এই জোট। আর জাহাজ ও কন্টেইনার সংক্রান্ত সব মাশুল আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এতে আগামী ১৫ বছর জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল খরচসহ কোনো ধরনের পরিচালন ব্যয় ছাড়াই প্রতি একক কন্টেইনারে প্রায় ৯২ ডলার রাজস্ব বন্দর পাবে বলে ওই প্রস্তাবে বলা হয়।
সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন বলেন, “দেশীয় প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা করলে দেশের সক্ষমতা বাড়বে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ধারণার আলোকেই আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। দেশীয় অপারেটরদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি অপারেটরের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের উদ্যোগ স্থানীয় শিল্পের জন্য হতাশাজনক।
“দেশিয় অপারেটররা সফলভাবে এনসিটি পরিচালনা করলেও বিদেশি অপারেটরের কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের সক্ষম স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবমূল্যায়ন। সরকারের কাছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানাই।”
প্রস্তাবের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তরফদার মো. রুহুল আমিন বলেন, “এখনো আলোচনা হয়নি।”
কনসোর্টিয়ামের তিনটি কোম্পানিই কয়েক দশক ধরে বন্দরের কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং জেটি পরিচালনার কাজে অভিজ্ঞ বলে দাবি করেন তিনি।
কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবে বলা হয়, এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি।
কনসোর্টিয়ামের দাবি, তারা আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও উন্নত অপারেশন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টার্মিনালের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সক্ষম হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চালু থাকা চারটি কন্টেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া কন্টেইনারের ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটিতে।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনা দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এরপর থেকে এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
সবশেষ মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনারকে একক হিসেবে ধরে) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়, যা এনসিটিতে এক মাসের হিসাবে সর্বোচ্চ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।
সেসময় ওই উদ্যোগ পরিণতি না পেলেও অর্ন্তবর্তী সরকারের মেয়াদে আবার এই প্রক্রিয়া গতিশীল হয়। অর্ন্তবর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তি হয়ে যাওয়ার জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যায় বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা।
সবশেষ চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটিতে বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয় অর্ন্তবর্তী সরকার।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্ল্যাটফর্মের সভায় আবার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত সংবাদ অনুসারে, ওই সভায় এনসিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে সমন্বিত টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় ১৫ বছরের জন্য পুরো টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারার প্রস্তাব রয়েছে।
এই ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। বিনিময়ে বন্দর শুধু নির্ধারিত রাজস্ব পাবে।
অন্যদিকে গণমাধ্যমের সংবাদ অনুসারে, গত এপ্রিলের শেষ দিকে এমজিএইচ গ্রুপও একই ধরনের পিপিপি কাঠামোয় এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
এনসিটি ইজারা: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে বলেছে সরকার
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিতে মে মাসে সর্বোচ্চ কন্টেইনার ওঠানামা
এনসিটি নিয়ে সরকারের কী অবস্থান? নৌমন্ত্রী বললেন জনগণের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা চুক্তি এখনই হচ্ছে না: আশিক চৌধুরী
ফের লাগাতার ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দর
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি, নইলে বন্দরে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা