Published : 23 Mar 2026, 08:04 PM
চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকায় একটি পেট্রোল পাম্প থেকে স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন মঈনুল ইসলাম, চোখেমুখে তার রাজ্যের হতাশা।
তেল পাওয়া গেল কি না জানতে চাইলে বললেন, “গত সন্ধ্যা থেকে ঘুরছি, রাতে একটি পাম্পে মাত্র ১০০ টাকার অকটেন দিয়েছে। সকাল থেকে কোথাও অকটেন পাইনি।”
সোমবার সকাল থেকে চট্টগ্রামের বেশির ভাগ পেট্রোল পাম্পে মিলছে না অকটেন। যে কয়টি পাম্পে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোতে মোটর সাইকেলের দীর্ঘ লাইন, প্রায় সব পাম্প তেল দিচ্ছে ‘রেশনিং’ করে।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেল চাহিদামত অকটেন ও ডিজেল দিচ্ছে কেবল নগরীর গণি বেকারী মোড়ের কিউ সি পেট্রোল পাম্প। সোমবার বিকালে সেখানে দেখা গেল কয়েকশ মোটর সাইকেলের লাইন।
সেখানে মোটর সাইকেলের জন্য অকটেন নিতে আসা মো. সাহেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “বেশ কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে তেল কিনতে পারিনি। এখানে এসে প্রায় ২০ মিনিট ধরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছি।”

জুবেল আহম্মদ ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালান। তেলের আশায় অপেক্ষা করতে করতে বললেন, “এখন ঈদের সময়। আমাদের আয় রোজগারের সময়। যাত্রী থাকলেও বাইক চালাতে পারছি না তেলের কারণে। আধা ঘন্টার বেশি সময় দাঁড়িয়ে আছি। এখনও সামনে ১৫/২০টা মোটর সাইকেল। কখন তেল পাব, কখন ভাড়া মারতে পারব জানি না।”
কিউ সি পেট্রোল পাম্পের কর্মচারী মো. মহিউদ্দিন জানালেন, ঈদের দিন ও পরের দিন পাম্প বন্ধ ছিল। সোমবার সকাল থেকে তেল বিক্রি হচ্ছে।
“যে যার চাহিদামত তেল নিতে পারছেন। ডিজেল-অকটেনের পর্যাপ্ত আছে। যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ দেওয়া হবে।”
কিন্তু প্রবর্তক মোড়ের ফয়েজ আহম্মদ সন্স পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা গেল, রশি টেনে কাগজ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে লেখা ‘অকটেন নাই’।
বাইরে দাঁড়িয়ে অনেকেই তেল বিক্রির অনুরোধ করছিলেন। সেখানে কথা হয় ইমন দে নামে একজনের সাথে।
তিনি বলেন, “বাইক নিয়ে সাজেক থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারে যাচ্ছি। সাজেক থেকে আসার পথে কোথাও তেল পাইনি। ষোলশহর এলাকায় একটি পাম্পে মাত্র ২০০ টাকার তেল দিয়েছে।”
পাম্পের ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিন বললেন, “সকাল থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আমরা তেল বিক্রি করেছি। এখন ট্যাংকে তেল নেই, তাই বিক্রি বন্ধ।”
তিনি বলেন, যতটুকু তেল পাই সে পরিমাণ বিক্রি করতে পারি। তার বেশিতো সম্ভব না। আমরা ডিপো থেকে চাহিদামত তেল পাচ্ছি না। আজ (সোমবার) সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন পেয়েছি, সব বিক্রি হয়ে গেছে। কাল পাব কিনা সেটা জানি না।”

গিয়াস উদ্দিনের ভাষ্য, ডিপো থেকে ‘রেশনিং’ করে তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন কোন ডিলার কী পরিমাণ তেল পাবে, সেটা কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। ডিপোতে অকটেনের চাহিদা দেওয়া হলেও দেখা যায় দেওয়া হয়েছে ডিজেল।
বিকালে পাঁচলাইশ মুরাদপুর সড়কের হাজী ইউনুস অ্যান্ড কোং পেট্রোল পাম্পের গেইটও বন্ধ দেখা গেল। সেখানে কথা হল জোবায়ের হোসেন নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি রিকশায় করে বোতল নিয়ে এসেছিলেন তেল কিনতে।
জোবায়ের বললেন, “কোথাও তেল পাইনি। রিজার্ভে যা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে, মুরাদপুর মোড়ে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তার পাশে তালা দিয়ে বাইক রেখে তেল নিতে এসেছি।”
হাজী ইউনুস অ্যান্ড কোং পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক ইব্রাহীম খলিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অনেক জায়গায় তেল নেই। সে কারণে আমাদের এখানে চাপ বেড়েছে। যে পরিমাণ তেল আমরা পাচ্ছি, সব বিক্রি করা হয়ে গেছে। সে কারণে সকাল থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে।”
তার দাবি, এ মাসে তেলের চাহিদা বেশি থাকলেও ‘মাত্র’ ৩৬ হাজার লিটার করে অকটেন ও ডিজেল পেয়েছেন ডিপো থেকে।
“তার পরে আর কোনো তেল পাইনি। কিন্তু চাহিদাতো বেশি। এ কারণে আর তেল বিক্রি করা যাচ্ছে না। আগামীকাল ডিপো থেকে তেল পাওয়া গেলে তাহলে বিক্রি করতে পারব।”
কাতালগঞ্জ এলাকায় খান ব্রাদার্স পাম্পও বন্ধ দেখা গেল।

সুবল দাশ নামে এক কর্মচারী জানালেন, সকালে অকটেন বিক্রি করা হয়েছিল। এখন তেল নাই। তাই বিক্রি করা যাচ্ছে না।
ষোলশহর এলাকায় ফসিল পেট্রোল পাম্প, দামপাড়ার পুলিশ লাইন্স পাম্প, লালখান বাজারের এস কে কাহম, সিআরবি মোড়ের ফোর স্টার পাম্পেও তেল মেলেনি।
বায়েজিদ রোডের বেবী সুপার মার্কেটের বিপরীতে সেনা কল্যাণ পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বাইক প্রতি ২০০ টাকার বেশি অকটেন দেওয়া হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট, পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের তাদের সমিতির
আওতাভুক্ত ১৯৩টি পাম্প রয়েছে; এর মধ্যে ৪৫টি চট্টগ্রামে।
তিনি বলেন, “কোনো পাম্পে তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ নেই। যে পাম্প যতটুকু তেল পাচ্ছে সেগুলো বিক্রি করছে।”
মঈন উদ্দিনের ভাষ্য, চট্টগ্রাম নগরীতে অকটেনের চাহিদা বেশি, আবার বন্দর এলাকার পাম্পগুলোতে ডিজেলের চাহিদা বেশি। সে কারণে শহরের পাম্পগুলোতে অকটেনের স্বল্পতা সৃষ্টি হচ্ছে।
“মানুষের মধ্যেও অতিরিক্ত তেল কেনার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সে কারণে এ ধরনের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।”
মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা দিয়ে তিনি বলেন, “ডিপো থেকে তেল আনতে হলে আগে পে অর্ডার করতে হয়। ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ, সে কারণে অনেকেই পে-অর্ডার করতে পারেনি। আশা করি কাল ব্যাংক খোলার পর পে-অর্ডার করা যাবে এবং ডিপোগুলো থেকে তেল ছাড়ানো যাবে।”
তবে সংগঠনের সভাপতি আবু তৈয়ব পাটোয়ারি মনে করেন, সংকট কিছুটা হ্রাস পেলেও পুরোপুরি কাটবে না।
তিনি বলেন, “আগে পাম্প মালিকরা লম্বা ছুটি ও শুক্র-শনিবার ছুটির আগে তেলের মজুদ করে রাখতেন। কিন্তু রেশনিং করে দেওয়ার কারণে এটা করা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “প্রতি বছর তেলের চাহিদা ১০ শতাংশ করে বাড়ে, কিন্তু এবার পাম্পের চাহিদার বিপরীতে ১০ শতাংশ করে তেল কম দেওয়া হচ্ছে ডিপো থেকে। ঈদের ছুটিতে ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, লরি চলাচল কম থাকায় ডিজেলের সংকট সৃষ্টি হয়নি। সামনের সপ্তাহ থেকে পুরোদমে সব চালু হলে তখন বোঝা যাবে কী অবস্থা হয়।”
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নিয়ে আতঙ্ক দেখা দেয়।
অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনতে শুরু করলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গত ৬ মার্চ থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে সীমা বেঁধে দেয় সরকার।
বিষয়টি নিয়ে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রবল আপত্তি জানায়। পরে রোজার ঈদ সামনে রেখে গত ১৪ মার্চ পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে চালু থাকা রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
ঈদের দুই দিন আগে থেকে বন্দরনগরীর বিভিন্ন পাম্পে তেল বিক্রি স্বাভাবিক থাকলেও সোমবার থেকে আবার সংকট শুরু হয়। তাতে মোটর সাইকেল চালকরাই ভোগান্তিতে পড়েছেন বেশি।