Published : 26 Jul 2025, 08:09 PM
নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মত এসেছে চট্টগ্রামের এক সংলাপে।
শনিবার দুপুরে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে: রাজনৈতিক পরিসরে নারী এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংলাপে এ মতামত উঠে আসে।
সংলাপে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা বলেন, গত জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সক্রিয় থাকলেও ৫ অগাস্টের পর কেন তারা দৃশ্যমান নয়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং তা বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, সর্বস্তরের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ও ঐক্য প্রয়োজন বলেও মত দেন আলোচকরা।
সংলাপে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “নারীর অধিকার রক্ষায় সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন। আশা করি, আগামী নির্বাচনে আগের চেয়ে আরও বেশি নারী প্রার্থী দেখা যাবে।
“গত ১৬ বছরে বিএনপির ভেতরে অনেক নারী রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। আমরা চাই তাদের পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বে রূপান্তরের সুযোগ দিতে। ‘ভালো মেয়েরা রাজনীতি করে না’—এ ধারণা এখন বদলাচ্ছে, যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক।”
তিনি বিএনপির তরুণ ও প্রান্তিক কর্মীদের জন্য গঠিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং দলীয়ভাবে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও উল্লেখ করেন।
সংলাপে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “দেশের প্রায় সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে নারীরা সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু মূলধারার রাজনীতিতে তাদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি। এটা অবশ্যই বদলাতে হবে।
“জামায়াত ২৯৪টি আসনের মধ্যে ৩০টির বেশি আসনে তরুণ প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নারী নেত্রী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন। গণতন্ত্র আগে না নারীর অংশগ্রহণ আগে, এ বিভাজনের দরকার নেই। দুটি বিষয় সমান্তরালভাবে এগোতে হবে।”
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান বলেন, “যদিও নারী ও তরুণরা আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন, এক বছর পরে আমাদের নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে, আমরা আসলে কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছি কিনা।”
সিপিবি চট্টগ্রামের সভাপতি অশোক সাহা বলেন, “জুলাই আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী প্রতিবাদ হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। এবার তরুণদের অংশগ্রহণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ছিল। দীর্ঘদিনের পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি এক ধরনের রাজনৈতিক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“যতদিন না আমরা নারীবিদ্বেষ এবং আদিবাসীদের প্রতি ঘৃণার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব, ততদিন ঐক্য সম্ভব নয়। এখন যুক্ত হয়েছে সাইবার হয়রানি—এ ঘৃণা দূর না হলে কার্যকর গণতন্ত্র স্থাপিত হবে না।”
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, “জুলাই আন্দোলনে তরুণ ও নারী সমাজ সামনের সারিতে ছিলেন। কিন্তু এখনো কোনো রাজনৈতিক দলই নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা নিশ্চিত করতে একটি জেন্ডার ইকুয়ালিটি চার্টার গ্রহণ করেনি। চট্টগ্রামে উচ্চপর্যায়ে কোনো নারীনেতা নেই, তাই আজকের মঞ্চে কেবল পুরুষ বক্তারাই উপস্থিত।”
গণসংহতি আন্দোলন চট্টগ্রামের সমন্বয়কারী হাসান মারুফ রুমি বলেন, “আন্দোলনের সময় যারা ভাইদের গ্রেপ্তার ঠেকিয়েছেন, সেই সাহসী নারীরা এখন কেন অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন; কেন তাদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে?
“গত ১৫ বছর নারীদের জন্য রাজনীতি করাটা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আন্দোলনের পর এ বাধা কিছুটা কমলেও কাজ এখনো বাকি। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাদের শুধু নারী শাখায় সীমাবদ্ধ না রেখে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করতে হবে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি— এনসিপির চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার প্রধান সমন্বয়কারী জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, “এনসিপি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে ১০০টি সংসদীয় আসনে শুধু নারীরা সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
“মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখনো বুঝতে পারেনি, আন্দোলনের পর সমাজ কতটা বদলে গেছে। তাদের অবস্থান এখনো নারী ও তরুণদের দাবির থেকে অনেক দূরে।”
বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ প্রায় ২০০ জন এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় এ আলোচনা আয়োজন করা হয়।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) বাংলাদেশভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যারা সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন বিষয়ে কাজ করে।