বৈচিত্র্য ও রহস্যের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ভুবনে আলিস

বাংলাদেশের ক্রিকেটে রহস্য স্পিনারের ঘাটতি এই স্পিনারকে দিয়ে পূরণ হতে পারে বলে আশাবাদী জাতীয় নির্বাচকরা।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Feb 2024, 03:19 AM
Updated : 14 Feb 2024, 03:19 AM

আলিস আল ইসলাম আর চমক- পাশাপাশি খুব মানিয়ে যায়। দেশের ক্রিকেটে শীর্ষ আঙিনায় তার আবির্ভাবের গল্প চমকপ্রদ। শুরুর ম্যাচের পারফরম্যান্সও ছিল চমক জাগানিয়া। এরপর তার হারিয়ে যাওয়া এবং ফেরা, দুটিই চমকানোর মতো। সবশেষ তিনি বড় চমক হয়ে এলেন জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়ে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামটি তারই।

আলিসের সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা না থাকলে স্রেফ তার পরিসংখ্যান দেখে ধাক্কা লাগতে পারে যে কারও। অফিসিয়াল বয়স পেরিয়ে গেছে ২৭। প্রথম শ্রেণির ম্যাচ এখনও খেলার সুযোগ পাননি। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৭ ম্যাচে উইকেট মোটে ৮টি। যে সংস্করণে তিনি বাংলাদেশ দলে সুযোগ পেলেন, সেই টি-টোয়েন্টিতে ২৪ ম্যাচে উইকেট ১৯টি। এমন পরিসংখ্যানের একজন কেন জাতীয় দলে?

এই উত্তরটির গভীরে গেলেই জানা যাবে কেন তিনি আলাদা। সীমিত ওভারের ক্রিকেটারের জন্য যে ধরনের স্পিনার হাপিত্যেশ করে খুঁজছিল দেশের ক্রিকেট, একজন ‘মিস্ট্রি’ বা রহস্য স্পিনার, সেই খরায় স্বস্তির বর্ষণ হয়ে উঠতে পারেন আলিস।

তাকে দলে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে প্রধান  নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন বললেন সেই কথাটিই।

“আলিস ভিন্ন ধরনের বোলার। একটু ব্যতিক্রমী স্পিনার। এরকম একজনকে আমরা খুঁজছিলাম। এই ধরনের বোলার থাকলে খুব সুবিধা হয়, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে।”

“এবার বিপিএলে আলিস ভালো করেছে। সামনে বিশ্বকাপ আছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য রেডি কি না, সেটি আরও দেখতেই আমরা ওকে টিম ম্যানেজমেন্টের তত্ত্বাবধানে রাখতে চেয়েছি। আরও ভালোভাবে ওকে দেখা যাবে তাহলে।”

প্রধান নির্বাচক যেটিকে ‘ব্যতিক্রমী’ স্পিনার বলছেন, আধুনিক ক্রিকেটে তাদেরকেই ‘মিস্ট্রি’ স্পিনার বলা হয়। আলিসকেও তেমনি স্পিনার হিসেবে কোনো সুনিদিষ্ট ঘরানায় ফেলা কঠিন। বল ঘোরাতে পারেন দুই দিকেই। টপ স্পিন, ফ্লোটার ভালো পারেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সুইং ও সিমও করাতে পারেন।

আধুনিক ক্রিকেটে স্পিনারদেরও সুইং করানো এখন আর নতুন কিছু নয়। অজান্তা মেন্ডিস, সুনিল নারাইনরা টুকটাক যা শুরু করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়েছে অনেক স্পিনারের মধ্যে। বিশেষ করে ইমাদ ওয়াসিম, মাহিশ থিকসানার মতো টি-টোয়েন্টিতে নতুন বলে বোলিং করা স্পিনাররা নিয়মিতই সুইং করান। অনেক পার্ট টাইম স্পিনারও এই ঝলক দেখাতে শুরু করেছেন। আলিস এই ঘরানাই অনেকটা রপ্ত করেছেন। স্কিলে নিজের উন্নতির ছাপ এবারের বিপিএলে দারুণভাবেই রেখেছেন তিনি।

তবে অনেক চমক দেখালেও তার ক্যারিয়ারের এগিয়ে চলা খুব চকমকে নয়। ২৭ বছর বয়সই বলে দিচ্ছে, এই পর্যায়ে আসার পথটা তার মৃসণ ছিল না। ঢাকার ক্রিকেটে তার পথচলা শুরু বছর দশেক আগে দ্বিতীয় বিভাগ লিগ দিয়ে। বছর তিনেক পর সুযোগ মেলে প্রথম বিভাগে। প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলা তখন তার স্বপ্ন।

প্রথম বিভাগে খেলার সময়ই ২০১৯ বিপিএলে ঢাকা ডায়নামাইটসের নেটে বোলিংয়ের সুযোগ পান। নেটেই তাকে দেখে মনে ধরে যায় কোচ খালেদ মাহমুদের। সাভারের ছেলেটিকে মূল স্কোয়াডে জায়গা করে দেন তিনি। ১১ জানুয়ারি ২০১৯ রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিষেক হয়ে যায়। তার মাথায় ক্যাপ পরিয়ে দেন সুনিল নারাইন, যাকে আদর্শ মেনেই এই ঘরানার বোলিং শেখার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

তখনও আলিস দেশের ক্রিকেটে অচেনা এক নাম। তবে সেদিনই নিজেকে চিনিয়ে দেন তিনি। শুধু মাঠে নেমে নয়, ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সেই।

দেশের প্রধান স্টেডিয়ামে গ্যালারিভরা দর্শকের সামনে প্রথমবার খেলতে নেমে স্নায়ুর চাপে পড়েই হয়তো সহজ দুটি ক্যাচ ফসকে যায় তার হাত থেকে। তবে নিজেকে ঠিকই সামলে নিয়ে জ্বলে ওঠেন বোলিংয়ে। বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ৮৩ রান করা রাইলি রুশোকে ফিরিয়ে প্রথম উইকেটের স্বাদ পান। এরপর ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি অষ্টাদশ ওভারে হ্যাটট্রিক করে। এমনকি শেষ ওভারে চাপের সঙ্গে লড়াই জিতে দলকে এনে দেন ২ রানের জয়।

বড় রানের ম্যাচে ২৬ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হয়ে তিনি তোলপাড় ফেলে দেন। সবাই তার সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে।

কিন্তু তার সেই স্বপ্নময় সময় দ্রুতই বিষাদে পরিণত হয় বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায়। প্রথম বিভাগ ক্রিকেটেও তার অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে কিছুটা শুধরে নেন। আবার তাকে পড়তে হয় সংশয়ের মুখে। সেই প্রশ্নকে সঙ্গী করেই পরের দুই ম্যাচে আঁটসাঁট বোলিং করেন। সপ্তাহ দুয়েক পর অ্যাকশনের পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই চতুর্থ ম্যাচেই চোট পেয়ে ছিটকে পড়েন।

গুরুতর সেই চোটের পরে অস্ত্রোপচার করাতে হয় তাকে। ৮ মাসের মতো ছিলেন মাঠের বাইরে। ফেরার পর অ্যাকশনের পরীক্ষা দিয়ে বোলিংয়ের সবুজ সঙ্কেত পান। ২০২০ বিপিএলে খেলেন খুলনা টাইগার্সের হয়ে। এক ম্যাচে মোটামুটি ভালো করলেও আরেক ম্যাচে ছিলেন খরুচে। আগের বছরের সেই ধার প্রায় উধাও। একাদশের বাইরে চলে যান। ওই বিপিএলে আর কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি।

সেই হতাশার সঙ্গে টুকটাক চোট লেগেই ছিল। ২০২০ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেকে ওল্ড ডিওএইএস ক্লাবের হয়ে ৩৬ রানে ২ উইকেট নেন। মৌসুমে ম্যাচ খেলতে পারেন ওই একটিই। ২০২১ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টিতে ১২ ম্যাচ খেলে উইকেট মেলে কেবল ৪টি।

এভাবেই ধুঁকতে ধুঁকতে চলছিল তার ক্যারিয়ার। ২০২২ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে শাইনপুকরের হয়ে একটি ম্যাচ খেলে খরুচে বোলিংয়ের পর আবার বাইরে ছিটকে যান। এবার একরকম হারিয়েই যান।

লম্বা বিরতির পর আবার তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায় ২০২৩ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে। প্রাইম ব্যাংকের হয়ে ৫ ম্যাচে ৬ উইকেট নেন ওভারপ্রতি ৪.১০ রান দিয়ে। খুব দারুণ কিছু না হলেও কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। বোলিং নিয়ে কাজ করে যেতে থাকেন। পাশে পান তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটর সফল কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে। এই কোচের কর্মক্ষেত্র সাকিব-মাসকো একাডেমিতে নিজেকে ঝালিয়ে নিতে থাকেন তিনি। ততদিনে অ্যাকশনে পরিবর্তন এসেছে। বোলিংয়ের স্কিল বাড়ছে আর রহস্য যোগ হতে শুরু করেছে। আর তিনি অপেক্ষা করছেন তখন সুযোগের।

বিপিএলের ড্রাফটে এবার তাকে কেউ নেয়নি। সালাউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে নিজেকে শাণিত করে যাচ্ছিলেন তিনি। তার জন্য দুয়ারটা খুলে যায় সৌভাগক্রমে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স জানতে পারে, শুরুর অনেক ম্যাচে তারা পাবে না সুনিল নারাইনকে। অনুশীলনে আলিসের বল খেলার পর তার উন্নতিটা বুঝতে পেরে লিটন কুমার দাস, ইমরুল কায়েসদের পরামর্শে তাকে কুমিল্লার স্কোয়াডে নিয়ে নেন কোচ।

চার বছর পর তিনি বিপিএলে ফেরেন গত ২৩ জানুয়ারি। এবার কোনো চমক নেই। ৩ ওভারে ৩০ রান দিয়ে উইকেট শূন্য থাকেন সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিমদের আক্রমণের সামনে। তবে বিস্ময় ঠিকই জমা রেখেছিলেন তিনি। সেসব মেলে ধরেন সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে। বিশ্বমানের রহস্য স্পিনারদের মতোই সেদিন স্পিন, টার্ন, সুইংয়ের মিশেলে সিলেটের ব্যাটসম্যানদের ঘোর লাগিয়ে উইকেট নেন ৪টি। সেই ম্যাচের পারফরম্যান্সেই মূলত জাতীয় নির্বাচকদের নজর কাড়ে তিনি।

পরের ম্যাচে রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে নতুন বলে তার সামনে একটা সময় অসহায় মনে হচ্ছিল বাবর আজমের মতো ব্যাটসম্যানকেও। সেদিন অবশ্য উইকেট পাননি। তবে পরের তিন ম্যাচে আবার আঁটসাট বোলিংয়ে উইকেট নেন চারটি।

বোলিংয়ের উন্নতি, স্কিল দিয়ে তিনি নজর কাড়ছিলেন বটে। তবে এখনই জাতীয় দলে তাকে নেওয়া হবে, এটা খুব বেশি কেউ ভাবতে পারেননি হয়তো। কিন্তু ওই যে, চমক ব্যাপারটিই তার সঙ্গে জুড়ে গেছে!

তার স্কিলে অবশ্যই আরও উন্নতির সুযোগ আছে। তবে আপাতত ভাবনার জায়গা তার ফিটনেস। ক্যারিয়ারজুড়ে অনেক চোটাঘাত সইতে হয়েছে বলেই শুধু নয়, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের মূল স্রোতে যেহেতু তিনি ছিলেন না, শীর্ষ মানের প্রথাগত ফিটনেস ট্রেনিং খুব বেশি পাননি ক্যারিয়ারে, তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফিটনেসের দাবি মেটানো নিয়ে কিছুটা সংশয় আছেই। সেটি বললেন প্রধান নির্বাচকও।

“তার ফিটনেসটা দেখার ব্যাপার আছে। এই পর্যায়ে তুলে না আনলে তো বুঝতে পারব না আসলে কতটা ফিটনেস আছে বা কতটা দরকার আরও। সবকিছুই দেখা হবে।”

“তবে আলিসের জন্য এটা বিশাল সুযোগ। এভাবে সুযোগ খুব বেশি কেউ পায় না। আশা করি, সে পারবে।”

কে জানে, হয়তো এখানেও কোনো চমক অপেক্ষায় রেখেছেন আলিস!