পাকিস্তানের স্বপ্ন ভেঙে বিশ ওভারের বিশ্বসেরা ইংল্যান্ড

পাকিস্তান পারল না ১৯৯২ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি করতে, প্রথম দল হিসেবে একইসঙ্গে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিমেলবোর্ন থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Nov 2022, 12:41 PM
Updated : 13 Nov 2022, 12:41 PM

মোহাম্মদ ওয়াসিমের বলে শটটি খেলেই বেন স্টোকস বুঝে গেলেন, কাজ হয়ে গেছে। যুদ্ধজয়ী গ্ল্যাডিয়েটরের মতো হুঙ্কার ছুড়লেন গ্যালারির দিকে তাকিয়ে। কিন্তু গ্যালারির ওই অংশে যে শশ্মানের নীরবতা! মাঠে থাকা ৮০ হাজার ৪৬২ দর্শকের ৮০ হাজারই সম্ভবত পাকিস্তানি সমর্থক। দূরে, উল্টো দিকের গ্যালারির কোনো একটি অংশ থেকে ইংলিশ সমর্থকদের আওয়াজ কিছু ভেসে আসছিল বটে। তবে মাঠের সমর্থনে কী আসে-যায়। টিভি পর্দায় স্টোকসদের বিশ্বজয়ের উল্লাসের স্বাক্ষী হলো গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। 

মেলবোর্নের মহামঞ্চে পাকিস্তানের ১৯৯২ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তির আশা মাড়িয়ে ইংল্যান্ড রচনা করল নতুন অধ্যায়। ৫ উইকেটের জয়ে টি-টোয়েন্টির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এখন ইংল্যান্ড। 

২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর সাদা বলের ক্রিকেটে যে বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে তারা, সেই ইংলিশ রেনেসাঁ পূর্ণতা পেল এই জয়ে। ইতিহাসে প্রথমবার কোনো দল একই সঙ্গে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন! 

স্টোকসের জন্য এই ফাইনাল ব্যক্তিগত এক অপূর্ণতা ঘোচানোর রোমাঞ্চকর গল্প। ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে জয়ের নায়ক তিনি। তবে টি-টোয়েন্টির সঙ্গে বোঝাপড়া তো বাকি ছিল! 

২০১৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে তার করা শেষ ওভারে টানা ৪ ছক্কায় কার্লোস ব্র্যাথওয়েট জন্ম দিয়েছিলেন ‘রিমেম্বার দা নেম’ আখ্যানের। এরপর স্টোকসের ক্যারিয়ারে যোগ হয়েছে অনেক কিছু। নিজেকে তুলে নিয়েছেন গ্রেটনেসের উচ্চতায়। কিন্তু সেই আক্ষেপটা রয়েই গিয়েছিল। গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনি খেলতে পারেননি। এ বছর বিশ্বকাপে দৃষ্টি রেখেই এই সংস্করণে ফেরেন দেড় বছর পর। যে লক্ষ্য, যে স্বপ্ন নিয়ে তার এই ফেরা, তার সবটুকুই তিনি পেলেন। 

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটির জন্য তিনি বেছে নিলেন এই মঞ্চকেই। দলের ইনিংসের হাল ধরে রাখলেন পুরোটা সময়, পার করিয়ে দিলেন শেষের বৈতরণীও। তার হাতেই ম্যাচ জয়ের শট। ২০১৬ বিশ্বকাপের শেষ সময়ের খলনায়ক এবার বিশ্বজয়ী নায়ক। 

ম্যান অব দা ম্যাচ অবশ্য স্যাম কারান। ৪ ওভারে স্রেফ ১২ রানে তার শিকার ৩ উইকেট। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে রোববার টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তান আটকে যায় ১৩৮ রানে। স্টোকসের ৪৯ বলে ৫২ রানের অপরাজিত ইনিংসে ইংল্যান্ড জিতে যায় ১ ওভার বাকি রেখে। 

পুঁজি যথেষ্ট না হলেও পাকিস্তান লড়াই করে যথেষ্টই। ম্যাচ জমিয়েও তুলতে পারে এক পর্যায়ে। কিন্তু তাদের সম্ভাবনায় বড় চোট হয়ে আসে শাহিন শাহ আফ্রিদির চোট। 

হ্যারি ব্রুকের ক্যাচ নিতে গিয়ে বাঁহাতি ফাস্ট বোলার চোট পান পায়ে। ২ ওভারের দুর্দান্ত প্রথম স্পেলের পর দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে কেবল একটি বল করতে পারেন তিনি। এরপর আস্তে আস্তে ছেড়ে যান মাঠ। পাকিস্তানের আশাও তাতে মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। 

তখন ২৯ বলে ৪১ রান লাগে ইংল্যান্ডের। ৬ উইকেট হাতে নিয়ে ফেভারিট তারাই। তবে আফ্রিদির ১১ বলে তো হতে পারত কত কিছুই!   

আফ্রিদি বেরিয়ে যাওয়ার পর বদলি হিসেবে বোলিংয়ে আসা ইফতিখার আহমেদের বলে চার-ছক্কায় ম্যাচের ফয়সালা অনেকটাই করে ফেলেন বেন স্টোকস। 

ছোট পুঁজি নিয়ে বোলিংয়ে যেমন শুরু দরকার, পাকিস্তানকে তা এনে দেন আফ্রিদিই। ভেতরে ঢোকা দারুণ এক ডেলিভারিতে প্রথম ওভারেই উড়িয়ে দেন অ্যালেক্স হেলসের বেলস। 

তবে জস বাটলার ঠিক করেই নেমেছিলেন, কোনোভাবেই চাপকে চেপে বসতে দেবেন না। দ্বিতীয় ওভারেই দুটি বাউন্ডারি মারেন তিনি নাসিম শাহকে। 

হারিস রউফ আক্রমণে এসে ফিরিয়ে দেন ফিল সল্টকে। পরের ওভারে নাসিমের ১৪৫ কিলোমিটার গতির ডেলিভারিতে নির্লিপ্তভাবে স্কুপ করে গ্যালারিতে পাঠান বাটলার। 

রউফের গতিময় এক ডেলিভারিতে অবশ্য বাটলার-শো থামে পাওয়ার প্লের ভেতরই (১৭ বলে ২৬)। তবে ৬.১ ওভারে ৫০ রান হয়ে যায় ইংল্যান্ডের। ছোট রান তাড়ায় এই দ্রুতগতির শুরু পরের ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ কমিয়ে দেয় অনেকটাই। 

এরপর কেবল প্রয়োজন ছিল ধস নামতে না দেওয়া। স্টোকস আর ব্রুকের ৩৯ রানের জুটি দলকে রাখে পথে। যখন পরিস্থিতি দাবি করে দ্রুত রান তোলা, স্টোকস আর মইনের ৩৩ বলে ৪৭ রানের জুটি তা মিটিয়ে দেয় পুরোপুরি। মইন কাজ শেষ করে ফিরতে না পারলেও কোনো ভুল করেননি স্টোকস। 

ম্যাচের প্রথম ভাগে শুরুটা ছিল ঘটনাবহুল। ‘নো’ বল দিয়ে শুরু করেন স্টোকস। পরের বল ওয়াইড। তবে ফ্রি হিটে রান নিতে ব্যর্থ মোহাম্মদ রিজওয়ান। 

প্রথম ওভারে রান আউটের হাত থেকেও বেঁচে যান রিজওয়ান। ক্রিস জর্ডানের সরাসরি থ্রো অল্পের জন্য লাগেনি স্টাম্পে। 

প্রথম ৪ ওভারে উইকেট হারায়নি পাকিস্তান। তবে ক্রিস ওকসের বলে রিজওয়ানের ছক্কা ছাড়া আর বাউন্ডারিও আসেনি। পঞ্চম ওভারে স্যাম কারানের বল স্টাম্পে টেনে আনেন রিজওয়ান। ৫ ওভার শেষে পাকিস্তান করে মোটে ১ উইকেটে ২৯ রান। 

সাহসী ব্যাটিংয়ে এবারের আসরে নজরকাড়া তরুণ মোহাম্মদ হারিস হয়তো ফাইনালের চাপ নিতে পারেননি। আরেকপ্রান্তে বাবর আজম টিকে থাকলেও গতি পাননি। ১০ ওভারে রান দাঁড়ায় তাই ২ উইকেটে ৬৮। 

টুর্নামেন্টজুড়ে দারুণ বল করা আদিল রশিদ আক্রমণে এসে প্রথম বলেই ফেরান হারিসকে (১২ বলে ৮)। পরে দারুণ এক গুগলিতে তিনি পুরো বোকা বানান বাবরকে। নিজের বলে দুর্দান্ত ফিরতি ক্যাচও নেন। পাকিস্তান অধিনায়ক পারেননি শুরুর মন্থরতা পুষিয়ে দিতে। ২৮ বল খেলে তার রান ৩২। 

সব মিলিয়ে ভীষণ বিবর্ণ এক আসর কাটালেন র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে থেকে আসর শুরু করা ব্যাটসম্যান। সেমি-ফাইনালের ফিফটি ছাড়া বলার মতো করতে পারেননি কিছুই। ১৩৩ বল খেলে রান করেছেন স্রেফ ১২৪, ডট বল ছিল ৬২টি! 

অনিয়মিত স্পিনার লিয়াম লিভিংস্টোনকে পেয়ে এক ওভারে চার ও ছক্কা মারেন শান মাসুদ। কিন্তু বেন স্টোকসের দুর্দান্ত ডেলিভারি শূন্যতেই থামায় ইফতিখার আহমেদকে।

মিইয়ে যাওয়া দলকে এরপর জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন মাসুদ ও শাদাব খান। রানের গতিতে একটু জোয়ার আসে। ৪ ওভারে ৩৯ রান যোগ করেন দুজন। কিন্তু প্রয়োজন ছিল অন্তত একজনের শেষ পর্যন্ত থাকা। পারেননি কেউ।

২৮ বলে ৩৮ করে কারানের শিকার মাসুদ। ১৪ বলে ২০ রান করা শাদাবকে থামান জর্ডান। তাদের বিদায়ে ঝিমিয়ে পড়ে ইনিংস। শেষ ২৮ বলে বাউন্ডারি মারতে পারে তারা কেবল ১টি। শেষ ৪ ওভারে রান আসে মোটে ১৮। 

ওই পুঁজি নিয়ে জিততে প্রয়োজন ছিল বোলারদের অসাধারণ পারফরম্যান্স। গ্যালারির তুমুল সমর্থন দিয়ে সেই আশাও জাগায় তারা। কিন্তু ইংল্যান্ডের পেশাদারীত্ব আর প্রতিজ্ঞার কাছে শেষ পর্যন্ত পাত্তা পায়নি কোনো কিছুই। 

সাদা বলের ক্রিকেটে বিশ্বের সেরা দল ইংল্যান্ড, এক নিঃশ্বাসে বলতে আর কোনো বাধা নেই। 

সংক্ষিপ্ত স্কোর: 

পাকিস্তান: ২০ ওভারে ১৩৭/৮ (রিজওয়ান ১৫, বাবর ৩২, হারিস ৮, শান ৩৮, ইফতিখার ০, শাদাব ২০, নাওয়াজ ৫, ওয়াসিম ৪, শাহিন ৫*, হারিস ১*; স্টোকস ৪-০-৩২-১, ওকস ৩-০-২৬-০, কারান ৪-০-১২-৩, রশিদ ৪-১-২২-২, জর্ডান ৪-০-২৭-২, লিভিংস্টোন ১-০-১৬-০) 

ইংল্যান্ড: ১৯ ওভারে ১৩৮/৫ (বাটলার ২৬, হেলস ১, সল্ট ১০, স্টোকস ৫২*, ব্রুক ২০, মইন ১৯, লিভিংস্টোন ১*; শাহিন ২.১-০-১৩-১, নাসিম ৪-০-৩০-০, হারিস ৪-০-২৩-২, শাদাব ৪-০-২০-১, ওয়াসিম ৪-০-৩৮-১, ইফতিখার ০.৫-০-১৩-০)। 

ফল: ইংল্যান্ড ৫ উইকেটে জয়ী। 

ম্যান অব দা ম্যাচ ও টুর্নামেন্ট: স্যাম কারান।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক