১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২ কার্তিক ১৪৩৩

রান তাড়ায় আবার হতাশা, বড় পরাজয়ে শুরু বাংলাদেশের

শেষদিকের এলোমেলো বোলিংয়ের পর ব্যাটসম্যানদের বাজে পারফরম্যান্সে ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারল না বাংলাদেশ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Oct 2026, 01:16 AM

Updated : 18 Oct 2026, 01:16 AM

তানজিদ হাসানের ব্যাটে রান তাড়ার শুরুটা হলো উড়ন্ত। এরপর একটু মনোযোগ হারালেন তিনি। কিন্তু বেঁচে গেলেন থার্ড ম্যান সীমানায় ব্লেসিং মুজারাবানির ভুলে। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্ক হবেন কী, পরের বলেই তানজিদ ক্যাচ দিলেন পয়েন্টে। সেই থেকে বাকিদেরও উল্টো পথে ছোটার শুরু। রান তাড়ায় আশা জাগানিয়া শুরুর পর পথ হারিয়ে বাংলাদেশ হেরে গেল বাজেভাবে।

তানজিদের বিদায়ের পর আর কোনো ব্যাটসম্যান পারেননি ন্যুনতম লড়াই করতে। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে তাই শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানে হেরে গেল বাংলাদেশ। আবু ধাবির জায়েদ স্টেডিয়ামে শনিবার দিবারাত্রির ম্যাচে আফগানদের ২৭১ রানের পিছু ছুটে বাংলাদেশ থমকে যায় ১৭২ রানে।

সবশেষ পাঁচ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের এটি চতুর্থ পরাজয়। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চার ম্যাচের মধ্যে এটি তৃতীয় হার। রান তাড়ায়ও দলের অবস্থা নাজুক। ২৪০ রানের বেশি লক্ষ্যে সবশেষ দশ ম্যাচের আটটিই হেরে গেল তারা।

প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের স্পিন খেলার টেকনিকে ঘাটতিও। মোসাদ্দেক হোসেন ও রিশাদ হোসেনের বিপক্ষে কার্যকরভাবে সুইপ ও রিভার্স সুইপ খেলে রান নেন ব্রেন্ডন টেইলর ও ক্রেইগ আরভাইন। কিন্তু সিকান্দার রাজা ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজার বলে বারবার পেছনের পায়ে গিয়ে খেলার চেষ্টা উইকেট দিয়ে আসেন তাওহিদ হৃদয়, সাইফ হাসান, মোসাদ্দেকরা।

ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক হিসেবে আগের ৯ ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেননি সিকান্দার রাজা। এবার রিচার্ড এনগারাভার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে প্রথম জয়ের স্বাদও পেলেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার।

ম্যাচ শুরুর আগেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। নিতম্বের চোটে ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে ছিটকে যান লিটন কুমার দাস। নেতৃত্বের দায়িত্ব পান সহ-অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। অধিনায়কত্বের প্রথম ম্যাচের অভিজ্ঞতাটা সুখকর হলো না তার। অসুস্থতার কারণে বিবেচনা করা হয়নি অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজকেও।

প্রথম ইনিংসের শেষ দিকে এলোমেলো বোলিংয়ে লক্ষ্যটা বেশ কঠিন হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্য। প্রায় ২০ বছরের ইতিহাসে আবু ধাবিতে ২৭০ রানের বেশি তাড়া করে জয়ের নজির আছে মাত্র দুইটি। তাই বাংলাদেশকে পাড়ি দিতে হতো চ্যালেঞ্জিং পথ।

সেই অভিযানে মুজারাবানির প্রথম বলেই চমৎকার শটে বাউন্ডারি মারেন তানজিদ। পরে ব্র্যাড ইভান্স ও মুজারাবানির এলোমেলো বোলিংয়ে শুরুটাও দারুণ পেয়ে যায় বাংলাদেশ। মূলত তানজিদের সৌজন্যেই প্রথম ৬ ওভারে রান আসে ৪৭।

সপ্তম ওভারে মুজারাবানির বাড়তি বাউন্সের ডেলিভারিতে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার। পরে প্রথম পাওয়ার প্লের শেষ বলে নিউম্যান নিয়ামুরির অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারি আলতো শটে ক্যাচ দেন তানজিদ।

স্ট্রোকসমৃদ্ধ ইনিংসে ৯ চার ও ১ ছক্কায় ৩৮ বলে ৪৬ রান করেন বাঁহাতি ওপেনার।

পরের ওভারে ইভান্সের স্টাম্প সোজা বল ভুল লাইনে খেলে এলবিডব্লিউ হন নাজমুল হোসেন শান্ত। দ্রুত ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

তবু রান রেট ধরে রেখেছিলেন হৃদয় ও সাইফ হাসান। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পরের দুই ওভারে আসে ১৮ রান। এরপর স্পিন আক্রমণে আসামাত্রই খোলসে ঢুকে যান দুই ব্যাটসম্যান।

শেষ পর্যন্ত রাজার বলে পেছনের পায়ে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন হৃদয়। পরে মাসাকাদজার বাঁহাতি স্পিনে কুপোকাত মোসাদ্দেক ও সাইফ। আর্ম বলে পেছনের পায়ে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ মোসাদ্দেক। অফ স্টাম্পের বাইরে হালকা টার্ন করা ডেলিভারিতে খোঁচা মেরে কট বিহাইন্ড সাইফ।

নুরুল হাসান সোহানও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ইভান্সের নিরীহদর্শন ডেলিভারি পুল করে সোজা ডিপ মিড উইকেট ফিল্ডারের হাতে দেন অভিজ্ঞ কিপার-ব্যাটসম্যান।

১২৯ রানে স্বীকৃত ব্যাটসম্যান সবার বিদায়ের পর ৩৩ বলে ২৩ রানের ইনিংস খেলে পরাজয়ের ব্যবধান কমান রিশাদ হোসেন। তাকে ফিরিয়ে ক্যারিয়ারের ১০০ উইকেট পূর্ণ করেন রাজা।

শুরুতে খরুচে হলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচের সর্বোচ্চ ৪ উইকেট নেন ইভান্স।

অথচ বড় পরাজয়ের ম্যাচটিতে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দারুণ। টস হেরে ফিল্ডিংয়ে নেমে নতুন বলে জিম্বাবুয়ের টপ-অর্ডার নাড়িয়ে দেন তাসকিন আহমেদ। প্রথম ওভারে ফেরান তিনি ব্রায়ান বেনেটকে, পঞ্চম ওভারে আরেক ওপেনার বেন কারানকে।

অভিষিক্ত টাফাডজোয়া সিগার শুরুটা ছিল ইতিবাচক। তাকেও বেশি দূর যেতে দেননি অভিজ্ঞ পেসার। প্রথম ৪ ওভারে তাসকিনের বোলিং বিশ্লেষণ ছিল ৪-১-১৩-৩।

মাত্র ২৪ রানে প্রথম তিনজনের বিদায়ের পর দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যানকে ক্রিজে পায় জিম্বাবুয়ে। পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দলের চাহিদা মিটিয়ে বড় জুটি গড়েন ব্রেন্ডন টেইলর ও ক্রেইগ আরভাইন।

ঝুঁকি না নিয়েও রানের গতি ধরে রেখে দলকে এগিয়ে নেন দুই ব্যাটসম্যান। জুটি গড়ার পথে দারুণ এক মাইলফলক ধরা দেয় টেইলরের। জিম্বাবুয়ের হয়ে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান ছিল এতদিন অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের, ২০৮ ইনিংসে ৬ হাজার ৭৮৬ রান। ৩০ থেকে চার মেরে তাকে টপকে যান টেইলর। ৪০ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান খেলেছেন একটি বেশি ইনিংস।

বড় জুটিতে একাধিকবার ভাগ্যের ছোঁয়া পায় জিম্বাবুয়ে। ২১তম ওভারে মোসাদ্দেকের বলে টেইলরকে স্টাম্পড করার সুযোগ হারান সোহান। বেঁচে গিয়ে ৬৫ বলে ক্যারিয়ারের ৪০তম ফিফটি পূর্ণ করেন টেইলর।

কয়েক ওভার পর ৬৪ বলে মাইলফলকে পৌঁছান আরভাইন। রিশাদ হোসেনের ওই ওভারেই তার বিরুদ্ধে হয় এলবিডব্লিউর জোরাল আবেদন। আম্পায়ার সাড়া দেননি। বাংলাদেশ রিভিউ নেয়নি। রিপ্লেতে দেখা যায়, রিভিউ নিলে ভাঙত জুটি।

জুটি ভাঙতে ৩৭তম ওভারে র সাইফ হাসানের হাতে বল তুলে দেন হৃদয়। তার দ্বিতীয় বলে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে কভারে ক্যাচ দিয়ে বসেন টেইলর। ১০ চারে ১০১ বলে ৮০ রান করে ফেরেন অভিজ্ঞ কিপার-ব্যাটসম্যান।

তার বিদায়ে ভাঙে ১৭৬ বলে ১৫০ রানের জুটি। সাইফের পরের ওভারে সোহানের দারুণ ক্যাচে ফেরেন সিকান্দার রাজা।

দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর ওয়েসলি মাধেভেরেকে নিয়ে রানের গতি বাড়ানোয় মন দেন আরভাইন। দুজন মিলে ২৮ বলে যোগ করেন ৩৭ রান। খরুচে বোলিংয়ের দিনে এই জুটি ভাঙেন রিশাদ হোসেন। সুইপ করতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ধরা পড়েন মাধেভেরে।

অন্য প্রান্তে আসা-যাওয়ার ভিড়ে ৯০ পেরিয়ে যান আরভাইন। তবে শেষ স্পেলে আক্রমণে ফিরে তার শতরানের আশা মিলিয়ে দেন শরিফুল ইসলাম। স্লোয়ার ডেলিভারিতে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন ৯৩ রান করা ৪১ বছর বয়সী ব্যাটার।

পরেও ইভান্সকেও আউট করে জিম্বাবুয়েকে আড়াইশর আগে থামানোর সম্ভাবনা তৈরি করেন শরিফুল। তবে শেষ ৪ ওভারে এলোমেলো বোলিংয়ে সেই সুযোগ হারান তাসকিন ও মোস্তাফিজুর রহমান।

নবম উইকেটে অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ২৬ বলে ৩৭ রান যোগ করেন নিয়ামুরি ও মাসাকাদজা। দুই ছক্কায় ১৫ বলে ২১ রান করেন মাসাকাদজা। নিয়ামুরির ব্যাট থেকে আসে ১৭ বলে ২১ রান।

শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের সেই স্কোরের ধারেকাছে যেতে পারেনি বাংলাদেশ।

টুর্নামেন্টের পরের ম্যাচে একই মাঠে সোমবার আফগানিস্তানের মুখোমুখি হবে জিম্বাবুয়ে। শারজাহতে আগামী বুধবার আফগানদের বিপক্ষে লড়বে বাংলাদেশ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

জিম্বাবুয়ে: ৫০ ওভারে ২৭১/৮ (বেনেট ০, কারান ৬, সিগা ১৬, টেইলর ৮১, আরভাইন ৯৩, রাজা ৪, মাধেভেরে ১৭, ইভান্স ৫, নিয়ামুরি ২১*, মাসাকাদজা ২১*; তাসকিন ১০-২-৪৪-৩, শরিফুল ১০-১-৪৭-২, মোস্তাফিজ ১০-২-৪৪-০, মোসাদ্দেক ৬--৩৬-০, রিশাদ ৯-০-৬৬-১, সৌম্য ২-০-১৫-০, সাইফ ৩-০-১৭-২)

বাংলাদেশ: ৩৩.৪ ওভারে ১৭২ (তানজিদ ৪৬, সৌম্য ৯, শান্ত ৪, সাইফ ২৬, হৃদয় ১৩, মোসাদ্দেক ১১, সোহান ৫, রিশাদ ২৩, শরিফুল ০, তাসকিন ১৬*, মোস্তাফিজ ৬*; মুজারাবানি ৮-০-২৩-১, ইভান্স ৬.৪-০-৪৫-৪, নিয়ামুরি ৬-০-৫৬-১, রাজা ৭-০-২৮-২, মাসাকাদজা ৬-০-১৮-২)

ফল: জিম্বাবুয়ে ৯৯ রানে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: ক্রেইগ আরভাইন।