রোনালদোকে প্রেরণা মেনে জীবনের নানা বাঁকে রবিউলের ছুটে চলা

রোনালদোকে আদর্শ মেনে আর দুই বড় ভাইয়ের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে ক্রিকেটে পথ খুঁজে নিয়েছেন বিপিএলে আলো ছড়ানো এই পেসার।

শাহাদাৎ আহমে সাহাদচট্টগ্রাম থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Jan 2023, 05:26 AM
Updated : 14 Jan 2023, 05:26 AM

রবিউল হকের সঙ্গে বয়সভিত্তিক দলে খেলা সাইফ হাসান, আফিফ হোসেন, হাসান মাহমুদ, মোহাম্মদ নাঈম শেখরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রেখেছেন অনেক আগেই। কিন্তু জাতীয় দলের আশপাশে থাকার মতো কিছুও এতদিন করতে পারেননি রবিউল। অবশেষে নিজেকে পাদপ্রদীপের আলোয় কিছুটা হলেও আনতে পারছেন এই পেসার। বল হাতে আলো ছড়াচ্ছেন তিনি এবারের বিপিএলে। আলাদা করে নজর কড়েছে তার উদযাপনও।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে মোহাম্মদ নাবিকে আউট করে লাফিয়ে উঠে দুই হাত ছড়িয়ে কিংবা খুলনা টাইগার্সের বিপক্ষে উইকেট পেয়ে দুই হাত বুকের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা উদযাপনে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে মনে করিয়েছেন রবিউল। পর্তুগিজ মহাতারকাকে দেখে ‘৭ নম্বর’ জার্সিও পরেন ২৩ বছর বয়সী পেসার।

চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে শুক্রবার রাতে খুলনার বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সের পর সংবাদ সম্মেলনে রবিউল শোনান তার জীবনের গল্প। জীবনের নানা বাঁকে হোঁচট খেয়ে যখন মুখ থুবড়ে পড়েছেন, আবার তাকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে সহস্র মাইল দূরে থাকা রোনালদোর অদৃশ্য প্রেরণা। নানা প্রতিকূলতার বন্ধুর পথে তাকে বন্ধু হয়ে এগিয়ে নিয়েছেন দুই বড় ভাই। কত ত্যাগ তাদের! 

জীবনের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে শুরুর দিকের রবিউল ভোলেননি তার প্রথম জীবনের কোচদের কথাও।

নিউ জিল্যান্ডে হওয়া ২০১৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপটা তেমন ভালো কাটেনি রবিউলের। চার ম্যাচে উইকেট পেয়েছিলেন ৩টি। তবু দেশে ফেরার পরপরই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে তাকে দলে নেয় শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব। অভিষেক আসরেই ১৪ ম্যাচে ২৭ উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। পরের মৌসুমে খেলাঘর সমাজ কল্যাণ সমিতির হয়ে ১১ ম্যাচে পান ২২ উইকেট।

দুই আসরে ভালো করলেও পেসারদের চিরশত্রু চোট থাবা বসায় আততায়ী হয়ে। লম্বা সময় বাইরে কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর আলোয় আসতে সময় লেগে যায় তার। অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় প্রিমিয়ার লিগে অংশগ্রহণও। গত মৌসুমে প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবে সুযোগ পেলেও ৪টির বেশি ম্যাচে মাঠে নামা হয়নি তার। বিরুদ্ধ স্রোত তাকে ঠেলে দেয় অনেক দূরে।

এরপর আবার তার লড়াই শুরু ক্রিকেটের মূল মোহনায় ফেরার।

জাতীয় ক্রিকেট লিগ দিয়ে শুরু হওয়া ঘরোয়া মৌসুমটা ভালোই কাটছে রবিউলের। দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আসরে চ্যাম্পিয়ন রংপুর বিভাগের হয়ে চার ম্যাচে একবার ৫ উইকেটসহ তার শিকার ১৭ উইকেট।

পরে বিসিএলের দীর্ঘ পরিসরের সংস্করণে এক রাউন্ডে ৬১ রানে নেন ৪ উইকেট। এই দুই টুর্নামেন্টের মাঝে বিসিএলের ওয়ানডে সংস্করণে ৩ ম্যাচে ৬ উইকেট নেন ওভারপ্রতি স্রেফ ৪.০৩ রান খরচায়। তবু বিপিএলে দল পাওয়ার পর বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না রবিউল।

খারাপ সময় পেছনে ফেলে ছুটতে থাকা এই পেসারের বিপিএলটাও বেশ ভালো যাচ্ছে। কুমিল্লার বিপক্ষে ২ উইকেট দিয়ে শুরুর পর মাঝে ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে ম্যাচে তার শিকার এক ব্যাটসম্যান। খুলনার বিপক্ষে ২২ রান দিয়ে ৪ উইকেট পেয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কারও জেতেন তিনি।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অবধারিতভাবেই আসে রবিউলের উদযাপন নিয়ে প্রশ্ন। মুখে হাসি নিয়ে তিনি শোনান তার জীবনের প্রেরণার উৎস আর আদর্শের কথা।

“আমার উদযাপন নিয়ে সবাই অনেক উৎসুক। উদযাপনের পেছনে যে আইকনিক মানুষটা (রোনালদো) আছেন, তিনি আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আসল কথা হচ্ছে, প্রত্যেকটা খেলোয়াড় কাউকে না কাউকে অনুসরণ করে, আমিও একজনকে অনুসরণ করি।”

“উনার ওয়ার্ক এথিকস বলেন, কঠোর পরিশ্রমী, অনেক শক্ত মানসিকতার। খুব খারাপ পরিস্থিতিতেও দলকে যেকোনো ভাবে কামব্যাক করাতে পারেন, বড় মঞ্চেও। এরকম একটা বিশ্ব মহাতারকার কাছ থেকে কিছুটা হলেও যদি আমি নিজের ভেতর নিতে পারি... কঠোর পরিশ্রম বলেন, শক্ত মানসিকতা বলেন, যেটা হোক… সেটা আমার জন্য অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার।”

১০ বছর বয়সে ক্রিকেটে হাতেখড়ি রবিউলের। তার আগে থেকেই ফুটবলের রোনালদোর ভক্ত তিনি।

“উনার (রোনালদো) খেলা দেখি ২০০৬-০৭ থেকে। হয়তো যখন উনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিয়েছেন, তারপর থেকে উনাকে অনুসরণ করি। উনাকে দেখলে মনে হয়, উনি জেতার জন্য যে কোনো কিছু করতে পারেন, যে কোনো কিছু।”

“ছোটবেলায় হয় না যে, কাউকে ভালো লাগলে মনে প্রাণে বসে যায়… ওরকমই। রিয়াল মাদ্রিদে দুর্দান্ত সময় কাটানোর পর, এত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, এত ট্রফি... জুভেন্টাসে যাওয়ার পর... এখনও যেভাবে শক্ত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন, এটা অনেক বড় কিছু। এগুলোই অনুসরণ করা হয়। নিজেকেও ওভাবে উজ্জীবিত করি যে, একটা মানুষ কঠোর পরিশ্রম দিয়ে এত কিছু করতে পারলে আমিও মানুষ, আমিও ইনশাআল্লাহ অনেক কিছু করতে পারব।”

ধাক্কা খেয়ে টালমাটাল হলেও আবার সোজা হয়ে ছুটে চলার যে প্রেরণা, সেটির ছাপ দেখা গেছে খুলনার বিপক্ষে রবিউলের বোলিংয়েও। নিজের প্রথম ওভারে জোড়া বাউন্ডারিতে ১২ রান দেন তিনি। তবে পরের তিন ওভারে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে স্রেফ ১০ রান দিয়ে উইকেট নেন  চারটি।

রবিউলের কণ্ঠে ফুটে উঠল, তার জীবনবোধই এখানে মিশে গেছে ক্রিকেেটর ২২ গজে।

টি-টোয়েন্টিতে যে কোনো ওভারেই বাউন্ডারি হওয়াটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে চট্টগ্রামের উইকেটে ১৭০-১৮০-১৯০, এমনকি ২০০ রানও তাড়া করা সম্ভব। যে রকম বললাম, কামব্যাক করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা খারাপ পরিস্থিতি থেকে কামব্যাক করার জন্য একটা শক্ত মানসিকতার প্রয়োজন হয়। চাপের মুখে যখন অনুধাবন করতে পেরেছি যে প্রথম ওভারটা অনেক খরুচে হয়ে গেছে, তখন চিন্তা করেছি যে যখনই পরের ওভার আসে, শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”

নিজের বিপিএল ক্যারিয়ারেও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখছেন রবিউল। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে চিটাগং ভাইকিংসের হয়ে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে অভিষেক তার। রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৪ ওভারে খরচ করেন ৫৪ রান।

পরের ম্যাচে ৩.৩ ওভারে দেন ৪৭ রান। রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে নিজের শেষ ওভারে দুইটি বিমার করায় পুরো স্পেল শেষ করা হয়নি রবিউলের। ওই বছরের ডিসেম্বরে পরের আসরে খুলনা টাইগার্সের জার্সিতে প্রথম ম্যাচে ৪ ওভারে ২৫ রান দিলেও পরের ম্যাচে ৩ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে জায়গা হারান তিনি।

প্রায় তিন বছর পর বিপিএলে পুনরায় সুযোগ পেয়ে এরই মধ্যে তিন ম্যাচে পেয়েছেন ৭ উইকেট। ওভারপ্রতি রান খরচ করেছেন ৭.২৭।

পেছন ফিরে তাকিয়ে রবিউল বললেন, শুরুর সেই ধাক্কাই তাকে পোক্ত করেছে আরও।

“প্রথম বিপিএলে তো অনেক ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে! তিনটা ছয়, (বিমারে) নো বল... শুরুর দিকে আমার মতে এসব হওয়া ভালো। একটা তরুণ ক্রিকেটারের জন্য খুবই ভালো। তাহলে তার শেখার চাহিদাটা, শক্তভাবে কীভাবে কামব্যাক করা যায়- এ জিনিসগুলো খুব ভালো শিখতে পারবে।”

“আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি যে, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলে এসে প্রথমবারই প্রিমিয়ার লিগে ভালো করেছিলাম। তারপর বিপিএলে সুযোগ পেয়েছি। হয়তো সুযোগটা কাজে লাগাতে পারিনি। তবে ওইখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি। পরের বছর খেলেছি, ওইখান থেকেও অনেক কিছু শিখেছি। ক্রিকেট খেলতে হলে প্রতিনিয়ত নিজের উন্নতি করতে হবে। যত দিন আছি উন্নতির জায়গায় নিজেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”

বহু দূরের রোনালদো থেকে রবিউলের জীবনের গল্পে উঠে আসে পরিবারের নায়কদের কথা। আবেগে কণ্ঠ ধরে আসে তার। বড় দুই ভাই রাশেদ আনাম ও রাকিব সরকারও ক্রিকেট খেলতেন স্থানীয় পর্যায়ে। তাদের দেখেই ক্রিকেট করেন রবিউল।

কিন্তু বাবা এনামুল হক চাননি ক্রিকেটে অনিশ্চয়তার আর ঝুঁকির পথে তিন ছেলেকে ঠেলে দিতে। তাই বড় দুই ভাই ক্রিকেট ছেড়ে দিয়ে সুযোগ করে দেন ছোট ভাইকে। তাদের ত্যাগের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ছুঁয়ে যায় রবিউলকে।

“আসলে আমার দুই কোচ হচ্ছেন আমার বড় ভাই ও মেঝ ভাই। সবসময় ফোন দিলেই উনারা আমাকে খেলার ব্যাপারে এত জ্ঞান দেন… উনারা আসলে... আমার বড় ভাই আমার হিরো। উনি জীবনের সবকিছুর ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমার এই ক্রিকেট খেলার জন্য। কী বলব… ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি। বড় ভাই, মেঝ ভাই… তাঁরা আমার ক্যারিয়ারের জন্য সব কিছুই করেছেন।”

বাবার সবুজ সঙ্কেত পেয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করলেও ক্যারিয়ারের আনন্দের দিনটি বাবাকে দেখাতে না পারার আফসোস রবিউলের। গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়েছেন তার বাবা।

“বাবা আমার ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা করতেন। আমি ইনজুরিতে ছিলাম প্রায় দেড় বছর। তখন আমার ক্যারিয়ারে কী হবে, সেটা নিয়ে অনেক ভাবতেন বাবা। হয়তো আজকে বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন এরকম লাইভ ম্যাচে দেখলে।

নীলফামারির সৈয়দপুরের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকায় গিয়ে ফ্রেন্ডস ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলেন রবিউল। একাডেমির কোচ নাদিম সাজ্জাদের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে আলো ছড়ান বয়সভিত্তিক পর্যায়ে। বিপিএলের মতো মঞ্চে উদ্ভাসিত পারফরম্যান্সের পর ছোটবেলার কোচকে একপ্রকার গুরুদক্ষিণাই যেন দিলেন রবিউল।

“আরেকজনের কথা না বললেই নয়। তিনি আমার একাডেমির কোচ নাদিম সাজ্জাদ ভাই। যখন আমি অনূর্ধ্ব-১৮ খেলি, তখন আমার কিছুই ছিল না। উনি এতটা সাহায্য করেছেন, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। উনাকে কখনও কিছু দিয়ে ধন্যবাদ জানাতে পারিনি। তবে নাদিম ভাই, আমি আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক