বাবার অধরা স্বপ্ন পূরণ করে আভিশকার ছুটে চলা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিপিএল খেলার অভিজ্ঞতা, নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বাবার প্রভাব, খেলোয়াড়ি জীবনের লড়াই-সংগ্রাম, বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ নানান বিষয়ে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের শ্রীলঙ্কান ওপেনার আভিশকা ফার্নান্দো।

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদশাহাদাৎ আহমেদ সাহাদসিলেট থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Jan 2024, 04:17 AM
Updated : 28 Jan 2024, 04:17 AM

‘ক্যামেরার সামনে কথা বলতে হবে? ক্যামেরায় আমি স্বচ্ছন্দ নই’- খানিক ইতস্তত করে বললেন আভিশকা ফার্নান্দো। ভিডিওধারণ করা হবে না আশ্বস্ত করতেই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের ওপেনার। তবে লাজুক অভিব্যক্তি দেখে একদমই বোঝার উপায় নেই কিছুক্ষণ আগে ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে তিনি খেলেছেন ৫০ বলে ৯১ রানের ইনিংস। চলতি বিপিএলে এখন পর্যন্ত যা সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।

পরে শুরুর লাজুকতা ধরে রেখেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিপিএল খেলার অভিজ্ঞতা, নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বাবার প্রভাব, খেলোয়াড়ি জীবনের লড়াই-সংগ্রাম, বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ নানান বিষয়ে কথা বলেছেন চট্টগ্রামের শ্রীলঙ্কান ওপেনার।

অসাধারণ ইনিংস খেললেন। শুরুটা ভালো হলো। বিপিএল নিশ্চয়ই উপভোগ করছেন?

আভিশকা: আমার জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার বিপিএল খেলতে এলাম। আর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে চতুর্থবার। দুইবার আমি টি-টেন লিগ খেলেছি। সব মিলিয়ে আমার জন্য ভালোই অভিজ্ঞতা।

প্রথমবার যখন (২০১৯ সালে, চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে) বিপিএল খেলতে এসেছিলাম, তখন প্রায় সব ম্যাচেই রান করেছি। দারুণ ছিল সেটি। এবারও শুরুটা ভালো হয়েছে। আরও কিছু ম্যাচ আছে। আশা করি ফেরার আগে দলকে ভালো কিছু দিয়ে যেতে পারব।

এলপিএল ভালো কাটিয়েছেন। বিপিএলটাও ভালো শুরু হয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চোখ রাখছেন নিশ্চয়ই?

আভিশকা: আমাকে প্রথমে টি-টোয়েন্টি দলে ফিরতে হবে। আমি এখন শুধু ওয়ানডে দলে আছি। আশা করি টি-টোয়েন্টি দলেও ফিরব। তারপর বিশ্বকাপে যেতে পারব। ওই টুর্নামেন্টের আগে আমাদের ন্যাশনাল টি-টোয়েন্টি লিগের ছয় ম্যাচ আছে, প্রস্তুতি পর্ব আছে। সেসব ম্যাচ খেলে রান করতে হবে। আশা করি শিগগিরই টি-টোয়েন্টিতেও ফিরব।

আপনার আন্তর্জাতিক অভিষেক ম্যাচের কথা যদি বলি, কোনো রকম স্বীকৃত ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা ছাড়াই বড় মঞ্চে সুযোগ পেলেন। শুরুতেই আপনার সামনে মিচেল স্টার্কের মতো বোলার। ওই মুহূর্তটা কেমন ছিল?

আভিশকা: সেদিন আমি খুব খুশি ছিলাম। কোনো ধরনের লিস্ট ‘এ’ বা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ না খেলে সরাসরি জাতীয় দলে খেলতে নেমেছিলাম। তবে আমি কখনও ভয় পাই না। কারণ এটিই তো আমার মূল লক্ষ্য। আমার বাবার চাওয়া পূরণ করে আমি জাতীয় দলে খেলছি। তো সেটি দারুণ মুহূর্ত ছিল।

স্রেফ ১৮ বছর বয়সে ছন্দে থাকা স্টার্কের মোকাবেলা করা...

আভিশকা: এটি দারুণ চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আমার মনে হয়, আমি স্রেফ ২ বল খেলেছিলাম (হাসি)। তবে সেদিন আমার শুরু ছিল। সেদিন থেকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলছি আমি।

আপনার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বাবার প্রভাবের কথা অনেক শোনা যায়...

আভিশকা: আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরুর পুরোটা জুড়েই বাবা। উনার নিজেরও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। স্কুল ক্রিকেটেও খেলেছেন। কিন্তু এরপর আর এগোতে পারেননি। তখন থেকেই তার আশা, আমি ক্রিকেটার হব। স্রেফ ৪ বছর বয়সে আমি খেলা শুরু করি। তখন থেকেই আমার বাবা আমার ক্যারিয়ারের মূল চরিত্র।

বাবার কথা একটাই, আমি জাতীয় দলে খেলব। আমার মনে হয়, সেটি আমি করেছি। তবে এখনও অনেক দূর যাওয়া বাকি। শুরুর দিনগুলোতে বাবা প্রতিদিন আমার সঙ্গে থাকতেন। অনুশীলনে সাহায্য করতেন।

তাহলে বলা যায়, নেট বোলার হিসেবে বাবাকেই পেয়েছেন?

আভিশকা: হ্যাঁ (হাসি)। আমি তার সঙ্গেই ক্লাবে যেতাম। সেখানে ছোট মাঠে অনুশীলন হতো। তিনি বোলিং করতেন, আমি ব্যাটিং করতাম। ছোট পিচে জোরে বোলিং করতেন। ওই চ্যালেঞ্জ সামলে খেলতাম। বাবাই আমার ক্যারিয়ারের মূল চরিত্র। আমার প্রথম কোচও তিনি। 

পরে স্কুল ক্রিকেট দিয়ে পুরোপুরি শুরু এই যাত্রা। এরপর অনূর্ধ্ব-১৩, অনূর্ধ্ব-১৫ দলে সুযোগ পাই। যখন আমি অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে খেলি, তখন আমার বয়স ১৬। আমার আন্তর্জাতিক অভিষেকও হয়েছে স্রেফ ১৮ বছর বয়সে।

আপনার হাতেও মনে হয় বাবার ট্যাটু করা...

আভিশকা:
হ্যাঁ! হ্যাঁ! বাবার কোলে আমি… (বাম বাহু দেখিয়ে) এই ছবিটি আমি হাতে ট্যাটু করিয়ে রেখেছি। গত বছরের এপ্রিলে করা এটি। আর এখন সামনের মাসে আমি নিজেই বাবা হচ্ছি। অসাধারণ অনুভূতি।

এত অল্প বয়সে অভিষেকের পর একটা লম্বা বিরতি দেখা যায় আপনার ক্যারিয়ারে। ওই সময়ে অনেক কিছুর ভেতর দিয়েই যেতে হয়েছে আপনাকে...

আভিশকা: (প্রশ্ন শেষ করার আগেই) ২০১৬ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের পর আমি দুই বছর খেলার বাইরে ছিলাম। তখন আমার দুইবার ডেঙ্গু হয়। ২০১৯ সালে পুনরায় খেলা শুরু করি। 

খুব কঠিন সময় ছিল তখন। ১০-১১ মাস কোনো ধরনের ক্রিকেট খেলতে পারিনি। ক্লাব ক্রিকেট দিয়ে ফিরি। এরপর একটু একটু করে ফিট হতে থাকি। ২০১৯ সালে ‘এ’ দলের একটা ম্যাচ খেলেছি। সোজা বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছি।

দুইবার ডেঙ্গুর কথা বলছিলেন, দুইবার করোনার সঙ্গেও তো যুদ্ধ করতে হয়েছে!

আভিশকা:
আসলে আমার মনে হয় সবকিছুই হয়ে গেছে। এখন মনে হয় চিকুনগুনিয়া হওয়া বাকি (হাসি)। 

 
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আপনাকে শ্রীলঙ্কার পরবর্তী অরভিন্দ ডি সিলভা বলা হয়। এসবের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতেন?

 
আভিশকা:
 ২০১৯ বিশ্বকাপ আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার ছিল। সেখান থেকে আমি অনেক আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। ওই আসরে একটা শতক করেছিলাম। তখন খুব খুশি ছিলাম। ২০২১ সালে আমার এসিএল (অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট) ইনজুরি হয়। সেখানে আরও এক বছর গেল এভাবে। এরপর এলপিএল দিয়ে খেলায় ফিরেছি। সে বছর জাতীয় দলেও ফিরেছি।

২০১৯ বিশ্বকাপে চান্দিকা হাথুরুসিংহে ছিলেন শ্রীলঙ্কার কোচ। তিনি বলেছিলেন, আপনি হবেন শ্রীলঙ্কার পরবর্তী তারকা...

আভিশকা: হ্যাঁ! তিনি অনেক আশাবাদী আমাকে নিয়ে। বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচের আগে কিছুটা চাপ মনে হয়েছিল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ম্যাচে আমি ৪৯ রান (৩৯ বলে) করেছিলাম। এরপর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি আশা করি, সবাই যা বলাবলি করেছে, তা যেন সত্যি প্রমাণ করতে পারি। আমার অনেক রান করতে হবে। আমার মতে, আমার সামনে অনেক পথ বাকি আছে।

মাহেলা জয়াবর্ধনে সবসময় আপনার প্রশংসা করেন। আশার কথা বলেন। তার সঙ্গে আপনার রসায়নটা কেমন?

আভিশকা: আমার যে কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি আমার পাশে থাকেন। আমি সব সময় তার সঙ্গে কথা বলি। কারণ তিনি তো কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান। এখন তিনি আমাদের জাতীয় দলের সঙ্গেও আছেন। সবসময়ই আমাকে সাহায্য করেন তিনি। 

ঘরোয়া বা ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টিতে আপনি ১৩০-র ওপর স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করেন। কিন্তু জাতীয় দলে ৩০টির বেশি ম্যাচ খেলেও একশ ছোঁয়নি স্ট্রাইক রেট। এর কারণ কী মনে হয়?

আভিশকা:
আমি ওপেনিংয়ে খেলতে পছন্দ করি। কিন্তু জাতীয় দলে কিছু ম্যাচে ওপেনিংয়ে নেমেছি, কিছু ম্যাচে আবার চার নম্বরেও নেমেছি। কখনও কখনও আমি দ্রুত আউট হয়ে গেছি। তাই আমার স্ট্রাইক রেট ও গড় কমেছে।

মাহেলা জয়াবর্ধনেই তো বলেছিলেন, আপনি প্রথম ১৫ বল খেলার পর বেশি বিপজ্জনক। তাই ৪ নম্বরে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়…

আভিশকা: ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রস্তুতি পর্বে আয়ারল্যান্ড, বাংলাদেশ, ওমানের বিপক্ষে ম্যাচগুলোতে আমি ৪ নম্বরে খেলেছিলাম। সবগুলো ম্যাচেই মনে হয় পঞ্চাশের বেশি রান করেছিলাম। তাই আমিও চার নম্বরে খেলার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রথম ২-৩ ম্যাচে আমি রান পাইনি। এরপর তো বাদই পড়ে গেলাম। 

কয়েক বছর ধরে আপনাদের দেশে এলপিএল আয়োজিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে...

আভিশকা:
হ্যাঁ অবশ্যই! আমাদের ক্রিকেটের জন্য এটি অনেক বড় ব্যাপার। এলপিএলে খুব ভালো ক্রিকেট হচ্ছে। এতে আমাদের দেশের ক্রিকেটও সহজেই অনেক উপকৃত হচ্ছে। জাতীয় দলের পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটাররাও খেলার সুযোগ পাচ্ছে। সঙ্গে বিদেশি ক্রিকেটার তো আছেই। আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট এটি। প্রতি টুর্নামেন্ট শেষে আমাদের ক্রিকেটারদের ১০-২০ ভাগ উন্নতি হচ্ছে।
 
এলপিএল থেকে ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনি কতটা উপকৃত হয়েছেন?

আভিশকা:
আমি নিয়মিতই এলপিএল খেলি। সবগুলো আসর খেলেছি। প্রতি ম্যাচেই রানের খোঁজে থাকি। একবার সর্বাধিক রানও করেছি। এই টুর্নামেন্ট খেলার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা তো বাড়েই, আত্মবিশ্বাসও আসে অনেক।

এলপিএল-বিপিএলের কারণে বাংলাদেশে এখন নিশ্চয়ই অনেক বন্ধু হয়ে গেছে?

আভিশকা: হ্যাঁ! (মেহেদী হাসান) মিরাজ, (নাজমুল হোসেন) শান্ত... তাদের সঙ্গে আমি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছি। এখনও ভালো বন্ধুত্ব আছে। প্রায়ই কথা হয়। বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটার এলপিএল খেলতে যায়। আমরা এখানে আসি। এই কারণেও বন্ধুত্ব খুব ভালো।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে অন্যরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়... 

আভিশকা: মাঠে তো আমাদের সবার একটাই লক্ষ্য, ম্যাচ জিততে হবে। এজন্য কখনও কখনও উত্তেজনা, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলে আসে। তবে মাঠের উত্তেজনা সবসময় মাঠেই থেকে যায়। সীমানার বাইরে আমরা সবাই ভালো বন্ধু।

বিশ্বকাপে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসের ওই টাইমড আউটের পর বন্ধুত্ব কেমন এখন?

আভিশকা: হাহাহা। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ওই দলে খেলা সবার সঙ্গে এখনও ভালো বন্ধুত্ব আছে।

ওই ঘটনায় নাটের গুরু কিন্তু শান্ত... 

আভিশকা: হাহা! প্রথম ম্যাচে সিলেটের বিপক্ষে খেললাম আমরা। সেদিনও শান্তর সঙ্গে এটি নিয়ে কথা হয়েছে। হাহাহা।

২০২২ সালে আপনার অবসরের ব্যাপারে ছড়িয়ে পড়া গুজব নিয়ে শেষ করি। সেটি আসলে কীভাবে হলো?

আভিশকা: পুরোপুরি ভুয়া ঘটনা। আমি জানি না কীভাবে হয়েছিল। আমি তো টুইটার ব্যবহার করতে জানতাম না। কাকে টুইট করতে হবে, কীভাবে করতে হবে কিছুই জানতাম না। হাহা। 

কীভাবে যেন সবখানে ছড়িয়ে পড়ল, আমি নাকি অবসরে যাচ্ছি! আমার বন্ধুরা, কোচরা আমাকে বার্তা পাঠাচ্ছিল যে, আমি নাকি অবসর নিচ্ছি। আমি তো তখন অবাক! তাদের তখন বললাম যে, 'না! না! আমি অবসরে যাচ্ছি না।' পরে আবার এই বিষয়ে আমার টুইটও করতে হয়েছিল।