Published : 27 Jun 2026, 06:25 PM
নাম দেখেই তার শেকড় সম্পর্কে আভাস সম্পর্কে আভাস পাওয়া যায়। পরিচয়ের একটু গভীরে গিয়ে জানা গেল, জন্ম রাজস্থানে, বেড়ে ওঠা, ক্রিকেট শেখা ও ক্রিকেটের পথে এগিয়ে চলা, সবই সেখানেই। বছর পাঁচেক আগেও ছিলেন দেশেই। সেই জেয় মুন্ড্রা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকেই নাড়িয়ে দিলেন ভারতকে। আয়ারল্যান্ডের স্মরণীয় এক জয়ের নায়কদের একজন তিনি।
তার এই উত্থানের পেছনে আছে চমকপ্রদ গল্প। আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন তিনি পড়াশোনা করতে ও কাজ করতে। এখনও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা আছে। এসবের মধ্যেই বাঁহাতি এই পেসার নিজেকে জানান দিলেন ক্রিকেট বিশ্বে।
বেলফাস্টে শনিবার দুই ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথমটিতে ৩৪ রানের জয় পায় আয়ারল্যান্ড। ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১২ বারের দেখায় আইরিশদের প্রথম জয় এটি।
১৮৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামা ভারতকে প্রথম ধাক্কা দেন মুন্ড্রা। দলের দ্বিতীয় আর নিজের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই তিনি বিদায় করে দেন সাঞ্জু স্যামসনকে। বাইরের বল কাট করতে গিয়ে স্টাম্পে টেনে আনেন ভারতীয় ওপেনার।
পরে সাতে নামা শিভাম দুবে যখন পাল্টা আক্রমণ করে ভারতের আশা একটু জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, বাধা হয়ে দাঁড়ান এই মুন্ড্রা। ১২ বলে ২৫ রান করা ব্যাটসম্যানকে থামান নিজের বলে ক্যাচ নিয়ে।
এই ম্যাচেই অভিষিক্ত আরেক পেসার ম্যাট হলার্ড ৩ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ হন। তবে ৪ ওভারে ২৫ রান দিয়ে ২ উইকেট নেওয়া মুন্ড্রাও অবদান রাখেন দারুণ।
বেশ গতিময় বোলিং উপহার দেন তিনি। গতি ছাড়ায় ৮৮ মাইলও। সঙ্গে স্লোয়ারের মিশেলে তিনি ছিলেন কার্যকর।
হলার্ডও এখনও পুরোপুরি আইরিশ নন। তার বেড়ে ওঠা দক্ষিণ আফ্রিকায়। জোহানেসবার্গ থেকে বছর দুয়েক আগে এসেছেন আয়ারল্যান্ডে। দারুণ গল্প আছে তারও। তবে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক রাঙানোর পর স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল বেশি মুন্ড্রাকে নিয়েই।
রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর থেকে ৯৫ মাইল দূর টঙ্ক জেলায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সেখানেই এসএস একাডেমিতে শিখেছেন ক্রিকেট। ক্যারিয়ার খুব বেশি এগোয়নি। কোভিডের সময় তো সবকিছু থমকেই গেল। তিনিও ঠিক করলেন, এবার জীবন গোছানোর লড়াইয়ে নামবে ।

২০২১ সালে পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। ইলেকট্রনিক্স ও কমিউনিকেশন্সে মাস্টার্স করতে থাকেন ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পাশাপাশি ক্লাব ক্রিকেট খেলতে থাকেন টুকটাক।
পড়াশোনা শেষে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনটেল-এ কাজ করেছেন। সেখানে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন চাকরি খুঁজছেন ২৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। আয়ারল্যান্ড ক্রিকেটের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে এখনও নেই তিনি। চাকরি তাই জরুরি তার জন্য। তার ভিসার বিষয়টিও চাকরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দ্রুত সমাধান তাই প্রয়োজন তার।
পড়াশোনা আর কাজের ফাঁকে ক্রিকেট খেলতে গিয়েই তিনি নজরে পড়ে রায়ান ইগলসনের। আয়ারল্যান্ডের বোলিং কোচ তিনি। বছর দেড়েক আগে একটি ক্রিকেট ক্লিনিক পরিচালনা করছিলেন তিনি। মুন্ড্রা নেখানে প্রতি সপ্তাহান্তে দুই দিন করে গিয়ে কোচিং নিতেন। চার মাস তিনি সেখানে কাজ করেন ইগলসনের সঙ্গে।
ক্লাব ক্রিকেটে লিনস্টার লাইটনিংয়ের হয়ে নিয়মিত খেলছিলেন এবং পারফর্ম করছিলে মুন্ড্রা। তবে জাতীয় দল থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। স্বীকৃত ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা বলতে ছিল একটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ, ছয়টি লিস্ট ‘এ’ আর পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ।
তবু আয়ারল্যান্ড দলে সুযোগটি এসে গেল, তাদের ছয় পেসার চোটে পড়ায়।
ব্যস, এরপর তো মাঠে নামলেন, খেললেন, জয় করলেন!
ম্যাচের পর মুন্ড্রা শোনালেন তার রোমাঞ্চের কথা।
“আমার জন্য, আমার পরিবারের জন্য এবং আমার দলের সবার জন্য এটা ছিল বড় মঞ্চ। তারা সবাই আমার পাশে ছিল। আমি শুধু শান্ত থেকে আমার কাজটা চালিয়ে যেতে চেয়েছি। এটাই আমাকে ভালো করতে সহায়তা করেছে।”
“দারুণ উত্তেজনাও অনুভব করছিলাম। ভারতের বিপক্ষে নিজেকে পরীক্ষা করা এবং প্রথম বলেই উইকেট পাওয়া, অসাধারণ ব্যাপার। তবে আমি চেষ্টা করছিলাম উচ্ছ্বাসে ভেসে না যেতে, কারণ তখনও আমাদের ৯টি উইকেট নেওয়া বাকি ছিল।”
পেছন ফিরে তাকিয়ে নিজের ক্রিকেট ও জীবনের গল্প কিছুটা তুলে ধরলেন তিনি।
“আমি আসলে ভারতেই ক্রিকেট শিখেছি। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল টঙ্কে, যেখানে আমি ইমতিয়াজ আলীর কাছে অনুশীলন করেছি। সেখানেই একজন ক্রিকেটার হিসেবে আমার প্রাথমিক পথচলা শুরু হয়। পরে এসএস ক্রিকেট ক্লাবের কোচ মোহন স্যারের কাছে কোচিংয়ে আমি ফাস্ট বোলিংয়ের ওপর মনোযোগ দিতে শুরু করি।”
“আয়ারল্যান্ডে আসি মূলত কোভিডের পর। তখন সবকিছু থমকে গিয়েছিল। আমি তাই পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আমি এখানে মাস্টার্স ডিগ্রি করতে এসেছি এবং এর পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগও দেখতে পাই। এখানে চমৎকার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, মাঠগুলো দারুণ এবং পরিবেশটি খুবই আন্তরিক। আমার একমাত্র কাজ ছিল ভালো খেলা। বাকি সবকিছু আপনাআপনি ঠিক হয়ে যেত। আমার হাতে একমাত্র আমার পারফরম্যান্সই ছিল, তাই আমি কঠোর পরিশ্রম করে গেছি। এভাবেই আমি আজ এই পর্যায়ে পৌঁছেছি।”
অভিষেকে সাড়া ফেললেও পা মাটিতেই রাখছেন মুন্ড্রা। তবে বড় স্বপ্ন এখন তার চোখে।
“ক্রিকেট আয়ারল্যান্ড আমাকে এই সুযোগ দিয়েছে। নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান মনে করছি। তবে এটা স্রেফ দায়িত্ব পালন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি শুধু সেটাই করে যাচ্ছি, যা এতদিন করে এসেছি।”
“কী হয়ে গেল, ব্যাপারটা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিরি সম্ভবত। তবে এটা একটা বড় সিঁড়ির ছোট্ট একটি ধাপ এবং আশা করি, সামনে আরও অনেক কিছু আসবে।”