Published : 02 Jan 2026, 01:00 PM
“সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের পাশেই কুক রোডে থাকতাম। একটা ঘটনা কখনোই ভুলব না। একদিন দেখলাম লাল ফেরারিতে করে মাইকেল স্ল্যাটার আসছেন। নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস্য করতে পারছিলাম না, একজন টেস্ট ক্রিকেটারকে দেখেছি আমি! এমন বাবা-মায়ের সন্তান, দুই বেড রুমের ছোট্ট ঘরে যারা লড়াই করছিলেন বাচ্চাদের নিয়ে টিকে থাকতে… আমি ভেবেছিলাম, একদিন টেস্ট ক্রিকেটার হব এবং যে কোনো গাড়ি ইচ্ছে, চালাতে পারব…”, লাজুক হাসিতে বলছিলেন উসমান খাওয়াজা। তিনি পেরেছেন, খুব ভালোভাবে পেরেছেন। ৮৮ টেস্ট খেলে, তবেই থামছেন।
তবে এই পর্যন্ত আসার পথটুকু তার জন্য সহজ ছিল না। তার শেকড়, তার ধর্ম, তার গায়ের রঙ, তার জন্য পদে পদে প্রতিবন্ধকতা হয়েছে সবকিছুই। বিদায় ঘোষণার ৫০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে তার কণ্ঠে যেমন ছিল গর্ব, ছিল তৃপ্তি, তেমনি ছিল বর্ণবাদ ও বৈষম্য নিয়ে প্রচণ্ড আক্ষেপ ও তীব্র ক্ষোভ। ক্যারিয়ারের শেষ সময়টায় তার প্রতি আচরণের জন্য তিনি স্রেফ ধুয়ে দিলেন অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম ও সাবেক ক্রিকেটারদের।
অ্যাশেজের সিডনি টেস্ট দিয়েই ১৫ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানছেন খাওয়াজা। সিডনিতে শুক্রবার আবেগময় সংবাদ সম্মেলনে অবসরের ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। সেখানে ছিলেন তার স্ত্রী র্যাচেল, দুই মেয়ে, তার বাবা তারিক খাওয়াজাসহ পরিবারের অনেকেই।
১৯৮৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর খাওয়াজার জন্ম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। তার চার বছর বয়সে বাবা তারিক ও মা ফৌজিয়া পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়াতে। তার বাবা পরে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন সৌদি আরবে।
খাওয়াজা বেড়ে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়াতেই। সেসময় বিমানের প্রতিও তার ছিল প্রবল আগ্রহ। ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসে বিমান চালনা নিয়েই তিনি স্নাতক করেন এবং পরে সনদপ্রাপ্ত পাইলট হন। তবে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন ক্রিকেটকে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট ক্যাপ পান ২০১১ সালে।
১৫ বছর পর ৮৮ টেস্ট খেলে ৬ হাজারের বেশি রান করে থামছে তার ক্যারিয়ার। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এখনও পর্যন্ত টেস্ট খেলেছেন ৪৭৩ জন। খাওয়াজার চেয়ে বেশি টেস্ট খেলতে পেরেছেন মাত্র ১৮ জন।
গর্ব তো তার হতেই পারে!
কিন্তু সেই গর্বের ঠিকানা ছোঁয়ার পথ তার জন্য ছিল কন্টকাকীর্ণ। ছেলেবেলা থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে বৈষম্যের ছোঁয়া তিনি পেয়েছেন।
“সবসময়ই নিজেকে ভিন্ন অনুভূত হয়েছে আমার, এমনকি এখনও। আমি মিশ্র বর্ণের ক্রিকেটার। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দল, আমার মতে… আমাদের সেরা দল। আমাদের গর্ব ও আনন্দ। তবে এটাও বলতে হবে, অনেক দিক থেকেই নিজেকে ভিন্ন মনে হয়েছে আমার। ভিন্নতা ছিল আমার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে, ভিন্নতা ছিল যেভাবে অনেক কিছু হয়েছে।”
এই চলতি অ্যাশেজের উদাহরণ টেনেও তিনি দেখিয়েছেন। পার্থে প্রথম টেস্ট চলার সময় পিঠের সমস্যায় পড়ে ইনিংস ওপেন করতে পারেননি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। সেই চোট তাকে ছিটকে দেয় পরের টেস্ট থেকেও। তখন যেভাবে সমালোচনা হয়েছে তাকে নিয়ে, সেটির পেছনে শুধু ক্রিকেটীয় কারণ দেখেন না খাওয়াজা।
“আমার পিঠে জড়তা ছিল, সেটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু যেভাবে সংবাদমাধ্যম ও সাবেক ক্রিকেটাররা আমাকে আক্রমণ করেছে… দিন দুয়েক সেটি মানিয়ে নিতে পারতাম আমি, কিন্তু টানা পাঁচ দিন আমাকে এসব সইতে হয়েছে এবং সেটা আমার পারফরম্যান্সের কারণে নয়।”
“ব্যাপারটি ছিল একদমই ব্যক্তিগত, আমার প্রস্তুতি সংক্রান্ত। কিন্তু যেভাবে সবাই প্রস্তুতি নিয়ে আমার দিকে তেড়ে এসেছে… এটা এদিক থেকে ব্যক্তিগত ছিল যে, ‘সে দলের প্রতি নিবেদিত নয়, কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবে, সে আগের দিন গলফ প্রতিযোগিতায় খেলেছে, সে স্বার্থপর, সে যথেষ্ট কঠোর অনুশীলন করে না, খেলার আগের দিন অনুশীলন করেনি, সে অলস’, এরকম অনেক কিছু।”
খাওয়াজার বিশ্বাস, তার শেকড়, তার গায়ের রঙের কারণেই তাকে এতটা আক্রমণ করা হয়েছে।
“এসব একই ধরনের ধারণা, বর্ণবাদী স্টেরিওটাইপ, যেসবকে সঙ্গী করে গোটা জীবন কাটিয়েছি। ভেবেছিলাম আমাদের সংবাদমাধ্যম, পুরোনো ক্রিকেটাররা এবং সবাই এসবকে পেছনে ফেলে এসেছে। তবে দেখলাম অবশ্যই আমরা সেসব পেছনে ফেলতে পারিনি, কারণ আমি কখনও দেখিনি অস্ট্রেলিয়া দলের কারও প্রতি এমন আচরণ করা হয়েছে।”

খাওয়াজা এই পিঠের চোটে পড়েছিলেন গলফ খেলতে গিয়ে। সেজন্য সংবাদমাধ্যমে ও বিশ্লেষকরা তাকে তুলাধুনা করে ছেড়েছেন। কিন্তু অন্য অনেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারকে এসব ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে, দাবি খাওয়াজার।
“এখনও কিছুটা বাকি আছে (বৈষম্য), যা নিয়ে প্রতিটি দিন লড়াই করতে হচ্ছে আমাকে, যা খুবই হতাশার। অসংখ্যজনের কথা বলতে পারি, ম্যাচের আগে গলফ খেলতে গিয়ে যারা চোটাক্রান্ত হয়েছে। আপনারা কিচ্ছু বলেননি। কেউ কিছু বলেনি।”
“এমন উদাহরণও দিতে পারব, যেখানে কেউ কেউ ম্যাচের আগের রাতে প্রচুর পান করার পর চোট পেয়েছে। কেউ একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি। এরকম হতেই পারে, তারা নাদান অস্ট্রেলিয়ান বাচ্চা, তাই না? আমার জন্য এটাই ছিল হতাশার। আমি যখন চোট পেলাম, সবাই আমার বিশ্বাসযোগ্যতা ও ব্যক্তি হিসেবে আমাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলল।”
গত মৌসুমের একটি উদাহরণও তুলে ধরলেন খাওয়াজা, যখন হ্যামস্ট্রিংয়ে জড়তার কারণে তিনি শেফিল্ড শিল্ডের শেষ ম্যাচটি খেলতে পারেননি। পরে তাকে দেখা যায় মেলবোর্নে ফর্মুলা ওয়ান প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে। মিথ্যে চোটের কথা বলে তিনি ফর্মুলা ওয়ান দেখতে গিয়েছিলেন, এমন অভিযোগ তোলা হয়েছিল। খাওয়াজা পরে আবেগময় সংবাদ সম্মেলনে সেসবের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন।
খাওয়াজার সঙ্গে ফর্মুলা ওয়ান দেখতে গিয়েছিলেন ন্যাথান লায়নও। চোটের কারণে তিনিও শেফিল্ড শিল্ডের শেষ ভাগে খেলতে পারেননি। আরেক তারকা স্টিভেন স্মিথও মৌসুমের শেষ ভাগে ঘরোয়া ক্রিকেটে না খেলে ছুটি কাটিয়েছেন নিউ ইয়র্কে।
সেই সময়টায় ফিরে গিয়ে খাওয়াজা আবারও বললেন, শুধু তাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে তখনও। তিনি জানেন, এখন এত কথা বলার জন্যও তার দিকে আঙুল উঠবে। কিন্তু ভবিষ্যতের খাওয়াজাদের জন্য কথা বলা জরুরি মনে করেছেন তিনি।
“একটি ম্যাচে খেলতে না পারায় আপনারা আমাকে তুলাধুনা করেছেন (গত মৌসুমে)। আমার সতীর্থদের অনেকেই ছিল, আপনাদের তাদের নিয়ে ‘টু’ শব্দটি করেননি। এসব আমার সামলাতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আমি জানি, এখানে বসে এসব প্রসঙ্গে কথা বললে লোকে বলবে, ‘ওকে, উজি এখানে এসে আবার বর্ণবাদী কার্ড খেলছে’, কিন্তু আমাকে ভুলভাবে তুলে ধরবেন না।”
“আমার মনে হয়েছে, প্রসঙ্গটি তুলে ধরা জরুরি। এসব নিয়ে কথা বলতে চাইনি, কিন্তু আমি চাই, পরের উসমান খাওয়াজাকে যেন এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে না হয়। আমি তাকে দেখতে চাই সবার সঙ্গে এক কাতারে, তাদের নিয়ে বর্ণবাদী ধারণা করতে চাই না। তাদের প্রতি সেরকম আচরণই করা উচিত, আমার সঙ্গে খেলা অন্য দুর্দান্ত সব ক্রিকেটারের প্রতি যেমন করা হয়।”
এত প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এতটা পথ পাড়ি দেওয়ায় গর্বও আছে তার। তৃপ্তি আছে অনেককে অনুপ্রাণিত করতে পারায় ও অনেকের জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ায়।
“আশা করি, আমি অনুপ্রাণিত করেছি লাখো শিশুকে, বিশেষ করে যারা অনুভব করে তারা ভিন্ন কেউ। যারা অনুভব করে, তারা অংশভুক্ত নয়। কিংবা যাদের বলা হয়, তারা কখনোই পারবে না। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠার পুরো সময়টায় এসব অনুভব করেছি। কিন্তু আমাকে এখানে দেখে নিশ্চয়ই অনেকে বিশ্বাস করবে, চাইলে সবকিছুই করা সম্ভব। স্রেফ চেষ্টা করে যেতে হবে।”