Published : 10 Jun 2026, 12:03 PM
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) বিস্তারিত কিছু এখনও জানায়নি। বেন স্টোকসও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি এখনএ। কিন্তু নাইটক্লাবের ঘটনায় নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে, যা ইংলিশ ক্রিকেটকে টালমাটাল করার জন্য যথেষ্ট। আপাতত সবকিছুর কেন্দ্রে স্টোকস। তার নেতৃত্ব এখন সুতোয় ঝুলছে, নানা অনিশ্চয়তার কথা ছড়িয়ে পড়ছে ক্যারিয়ার নিয়েও।
ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার নিজের উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন স্টোকস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে তার অবসরের আশঙ্কার মধ্যে ইংল্যান্ডের এই টেস্ট অধিনায়ককে তার সম্ভাব্য বিকল্পগুলো বিবেচনা করার জন্য সময় দিয়েছে ইসিবি।
নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের পর একটি নাইটক্লাবের ঘটনা তদন্ত করছে ইসিবি এবং ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ওই ঘটনায় স্টোকস ও গাস অ্যাটকিনসন দলের কারফিউ ভঙ্গ করেছেন বলে বিবৃতিতে জানিয়েছিল ইসিবি। পরে সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে আসতে থাকে বিস্তারিত নানা কিছু।
জানা গেছে যে, রাগবি ইউনিয়নের ক্লাব সারাসেন্স এফসির সামোয়ান খেলোয়াড় টোটোয়া ওভার সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন তারা। এই ঘটনায় ইংল্যান্ডের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আহত হন এবং তার সেলাইয়ের প্রয়োজন পড়ে।
গত মৌসুমে মাঠের বাইরের ইংলিশ ক্রিকেটারদের নানা অসংযত আচরণের পর দলের আচরণ ও সংস্কৃতি উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর স্টোকসদের এই ঘটনায় তাদের আচরণগ সমস্যা নিয়ে বিতর্ক আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের পার্সন্স গ্রিনের হোয়াইট হর্স পাবে লর্ডসে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টে জয় উদযাপন করছিলেন ইংল্যান্ড টেস্ট দলের বড় একটি দল। ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক রাগবি খেলোয়াড়ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে, কয়েক ঘণ্টা পর রেক্স রুমসে একটি বচসার ঘটনা ঘটে। ‘চেলসির নটিয়েস্ট নাইটক্লাব’ হিসেবে এই ক্লাবটির পরিচিতি আছে এবং ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এটি খোলা থাকে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই ঘটনায় রাগবি খেলোয়াড় টোটোয়া ওভা, স্টোকস এবং অ্যাটকিনসন জড়িত ছিলেন। প্রতিবেদন অনুসারে, কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে অ্যাটকিনসনকে ঘুষি মারতে মারার চেষ্টা করেন ওভা। কিন্তু ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার ও ১২৫ কেজি ওজনের রাগবি খেলোয়াড়ের ঘুষিটি গিয়ে লাগে দুই ক্রিকেটারের সঙ্গে থাকা ইসিবির এক নিরাপত্তা কর্মীর গায়ে। সেখান থেকেই হাতাহাতির সূত্রপাত। স্টোকস এবং অ্যাটকিনসনের কোনো আঘাত লাগেনি ও দুজনেই অক্ষত আছেন বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, রাত ৯টার দিকে পাবটিতে আসেন স্টোকস এবং একজন কর্মী জানান যে, তখনই ইংল্যান্ড অধিনায়ককে ‘মাতাল’ দেখাচ্ছিল। তিনি রাতের বেশিরভাগ সময় বারের আশেপাশেই কাটান এবং ‘প্রচুর পরিমাণে’ ডাবল রাম ও কোকসহ অর্ডার করেন অনেক দফায়, যেগুলোর প্রতিটির দাম ছিল ২৫ পাউন্ড পর্যন্ত। ধারণা করা হচ্ছে, স্টোকস রাত ১১টার দিকে ওই স্থান ত্যাগ করেন।
ইংল্যান্ড রাগবি দলের অধিনায়ক মারো ইতোজে, বেন আর্ল এবং জেমি জর্জের সঙ্গেও কথা বলতে দেখা যায় স্টোকস এবং অ্যাটকিনসনকে। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ও রাগবি দলের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকজন প্রাক্তন ক্রিকেটারের সঙ্গে মিলে ‘দা বাউন্ডারি’ পাবটি প্রতিষ্ঠা করেন জর্জ, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ব্যাটার জ্যাক ক্রলির দীর্ঘদিনের বন্ধু আর্ল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্রিকেটার এবং রাগবি খেলোয়াড়রা তাদের সামনের অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে আলোচনা করেছিলেন, এরপর রাগবি দলটি রেক্স রুমসের দিকে রওনা হয়। পাবের একজন কর্মী জানান, সন্ধ্যার শুরুতে স্টোকসের সঙ্গে জর্জের যথেষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ আড্ডা হয়েছিল।
এরপর কোনো এক পর্যায়ে পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়। যতটা জানা গেছে, ভিআইপি এরিয়ায় টেবিল নিয়ে বিবাদের জেরেই এই বচসার সূত্রপাত হয়।
সারাসেন্স এফসি ঘটনাটির তদন্ত করছে বলে নিশ্চিত করেছে এবং এই ক্লাবে ওভার ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, স্টোকস বা অ্যাটকিনসন কেউই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত করেননি।
তবে সূত্রপাত না করলেও পার পাচ্ছেন না দুই ক্রিকেটার। দলীয় প্রোটোকল ভাঙার জন্য নিশ্চিতভাবেই তাদের দুজনকে শাস্তি দেবে ইসিবি। তবে, ইংল্যান্ড অধিনায়ক অবসর নিয়েই ফেলতে পারেন, এই শঙ্কা থেকে বোর্ড কর্তারা সুযোগ দিয়েছেন তাকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ও সিদ্ধান্ত নিতে।
স্টোকসের অবসরের ব্যাপারটি ছড়িয়ে পড়ে তখনই, মঙ্গলবার সকালে যখন জরুরি কার্যনির্বাহী বোর্ডের বৈঠক ডাকা হয়। সেই সময়ে এমন জোরাল ইঙ্গিত ছিল যে, স্টোকস বিরক্ত হয়ে পড়েছেন এবং ১৫ বছরের ক্যারিয়ারের ইতি টানতে আগ্রহী তিনি। স্টোকস এবং ইসিবির মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি এতটাই তীব্র যে, কেউ কেউ আশঙ্কা করেছিলেন, অবসরের সিদ্ধান্তের কথা হয়তো শুধুমাত্র ইনস্টাগ্রাম পেজে একটি পোস্টের মাধ্যমেই জানাবেন স্টোকস।
অবসরের ব্যাপারটি এখনও পুরোপুরি উবে যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে, স্টোকস সেই চরম পদক্ষেপটি নেওয়ার চিন্তা থেকে সরে এসেছেন। সবচেয়ে ভালো উপায় কী হবে, তা নির্ধারণ করতে তিনি তার দীর্ঘদিনের এজেন্ট, ইংল্যান্ড ও ল্যাঙ্কাশায়ারের সাবেক ব্যাটসম্যান নিল ফেয়ারব্রাদারের সঙ্গে দেখা করবেন। ৩৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার হয়তো পরবর্তী অ্যাশেজের পর ২০২৭ সালে তার কেন্দ্রীয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার সুযোগটি গ্রহণ করতে পারেন।
অন্য ভাবনাও আছে। অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়ে খেলাটি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন তিনি।
আপাতত, স্টোকস এবং অ্যাটকিনসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানা আরোপের কথা ভাবা হচ্ছে, যা সম্ভবত তাদেরকে নিউ জিল্যান্ড সিরিজের বাকি ম্যাচগুলো থেকে ছিটকে দিতে পারে। দ্বিতীয় টেস্ট শুরু আগামী বুধবার ওভালে। স্টোকস তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা জানার পর শুক্রবারের আগেই দল ঘোষণা করবে ইসিবি।
শোনা যাচ্ছে, স্টোকস তুলনামূলকভাবে ভালো মেজাজেই আছেন, তবে রাতে এত দেরি করে বাইরে থাকার জন্য তিনি অনুতপ্ত এবং এই ঘটনার ফলে তার সতীর্থদের উপর যে ধারাবাহিক প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। এমনও ধারণা করা হচ্ছে যে, এই পরিস্থিতিতে নিজের দায় থাকা সত্ত্বেও, ইসিবি যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, তাতে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন।