Published : 21 Aug 2025, 07:46 PM
তোফায়েল আহমেদের বলে যখন আউট হলেন ব্লেইক ম্যাকডোনাল্ড, বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ক্রিকেটারদের উল্লাস দেখে মনে হলো ম্যাচই বুঝি জিতে গেছেন তারা। পঞ্চম উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছিল মেলবোর্ন স্টার্স একাডেমি। জয় তখন অনেক দূরের পথ। কে জানত, সেই পথই তারা পাড়ি দেবে বুক চিতিয়ে আর বাংলাদেশ আরেকবার নাস্তানাবুদ হবে একটি একাডেমি দলের কাছে!
১৭টি স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি খেলে যার সর্বোচ্চ রান স্রেফ ১৫, সেই জোনাথান মের্লোর ব্যাটে তুলাধুনা হলো বাংলাদেশ ‘এ’ দলের বোলাররা। অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজে মেলবোর্ন স্টার্স একাডেমি জিতে গেল ৩ উইকেটে।
এই আসরে পার্থ স্কর্চার্স একাডেমির কাছেও হেরেছে বাংলাদেশ।
পাঁচ ম্যাচে তিন পরাজয়ে নুরুল হাসান সোহানের দলের বিদায় এখন প্রায় নিশ্চিত। সেমি-ফাইনালে উঠতে হলে শেষ ম্যাচে শুধু জিতলেই হবে না, রান রেটের ভীষণ কঠিন সমীকরণও মেলাতে হবে। অন্য দলগুলির ফল পক্ষে না এলে এমনকি শেষ ম্যাচের আগেই নিশ্চিত হতে পারে সোহানদের বাদ পড়া।
ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে এই ম্যাচে ২০ ওভারে ১৫৬ রান তোলে বাংলাদেশ। টানা তৃতীয় ম্যাচে ফিফটি করতে পারেননি কোনো ব্যাটসম্যান।
সেই পুঁজি নিয়ে বোলাররা একসময় আশা জাগিয়েছিলেন জয়ের। কিন্তু জোনাথান মের্লোর দুর্দান্ত ইনিংস স্টার্স একাডেমিকে এনে দেয় জয়।
৩৮ বলে ৬১ রান করে ম্যাচের সেরা মের্লো, অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটেও যিনি খুব পরিচিত নাম নন।
শুধু মের্লো কেন, স্টার্স একাডেমির কোনো ক্রিকেটারই ঘরোয়া ক্রিকেটের দলগুলিতেই নিয়মিত নন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা তো দূরের কথা। বাংলাদেশের একাদশের ৮ জনেরই আছে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। কয়েকজন তো অনেক ম্যাচের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা খুব ভালো হয়নি। উদ্বোধনী জুটিতে মোহাম্মাদ নাঈম শেখ ও জিসান আলম ২৭ রান তোলে চার ওভার খেলে।
বাঁহাতি স্পিনার ডগলাস ওয়ারেনের ঝুলিয়ে দেওয়া বলে সুইপের চেষ্টায় এলবিডব্লিউ হন জিসান। আগের চার ম্যাচের তিনটিতে আগ্রাসী শুরু করা তরুণ ওপেনার এ দিন ফেরেন ১৩ বলে ১৩ রান করে।
সাইফ হাসান ক্রিজে যাওয়ার পরপরই একটি ছক্কা মারেন। কিন্তু দলের ইনিংস খুব গতিময় হয়নি। বিশেষ করে, বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার হ্যামিশ ম্যাকেঞ্জিকে খেলতেই পারছিলেন না ব্যাটসম্যানরা।
পাওয়ার প্লেতে কেবল চারবার বল সীমানা ছাড়া করতে পারে বাংলাদেশ। ছয় ওভারে ভিন্ন ছয় বোলার ব্যবহার করেন মেলবোর্ন স্টার্সের অধিনায়ক ক্যাম্পবেল কেলাওয়ে।
ম্যাকেঞ্জির বেশ বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে স্টাম্পে টেনে আনেন নাঈম (২১ বলে ১৯)। ক্যারিয়ারে অনেকবারই এভাবে আউট হয়েছেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। টুর্নামেন্টের পাঁচ ম্যাচে অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের রান মোট ৭৯।
ম্যাকেঞ্জির পরের বলেই লেংথ পড়তে ভুল করে এলবিডব্লিউ নতুন ব্যাটসম্যান আফিফ।
অষ্টম ওভারে বাংলাদেশের রান তখন ৩ উইকেটে ৫০।
বাংলাদেশের ইনিংস প্রাণের ছোঁয়া পায় পরের জুটিতে। চতুর্থ উইকেটে সাইফ ও নুরুল হাসান সোহান যোগ করেন ৬৩ রান।
সোহানের শুরুটা ছিল অস্বস্তিময়। তবে একটু থিতু হয়ে পাল্টা আক্রমণ করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সাইফও খেলেন ভালো কয়েকটি শট।
তবে ৩২ রানে সহজ ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গিয়েও আর এগোতে পারেননি সোহান। আগের দিনের মতোই আউট হন ৩৩ রানে (২৭ বলে)।
ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি রকিবুল হাসান (৪)।
ম্যাকেঞ্জি আক্রমণে ফিরে থামান সাইফ হাসানকে (৩৫ বলে ৪৫)।

রানের গতিটাও কমে যায় ওই সময়ে। ১৪ থেকে ১৮ পর্যন্ত পাঁচ ওভারে রান আসে কেবল ২৬!
শেষ দুই ওভারে ইয়াসির আলি চৌধুরি সৌজন্যে ২৯ রান তুলে দেড়শ ছাড়ায় দল। আগের ম্যাচে শেষ দিকে নেমে ১৩ বলে অপরাজিত ২২ রানের পর ইয়াসির এবার করেন ১৭ বলে ২৯।
রান তাড়ার শুরুতে স্যাম হার্পারের আগ্রাসনে বাংলাদেশকে চাপে ফেলে দেয় মেলবোর্ন স্টার্স একাডেমি। প্রথম তিন ওভারে রান আসে ৩০।
চতুর্থ ওভারে হাসান মাহমুদ আক্রমণে এসে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন দলকে। পুল করে সীমানায় ধরা পড়েন এখনও পর্যন্ত আসরের সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটসম্যান থমাস রজার্স (১২ বলে ১১)।
তিনে নামা ক্যাম্পবেল কেলাওয়ে ১ রানেই ক্যাচ দেন পয়েন্টে। তবে মুশফিকুর রহমানের ডেলিভারিটি ছিল ‘নো।’ জীবন পাওয়া ব্যাটসম্যানকে অবশ্য বেশি দূর যেতে দেননি রকিবুল হাসান। টুর্নামেন্টজুড়ে দারুণ বোলিং করা বাঁহাতি স্পিনার আক্রমণে এসে প্রথম বলেই ফেরান স্টার্স একাডেমির অধিনায়ককে (৮)।
স্টার্সের রানের গতিতে এরপর রাশ টানে বাংলাদেশ। বিপজ্জনক হার্পারকেও (১৮ বলে ২৯) বিদায় করেন রকিবুল। সাইফ হাসানের প্রথম বলেই বোল্ড লিয়াম ব্ল্যাকফোর্ড (১২)।
একটু পর তোফায়েল আহমেদের বলে যখন আউট জন ব্লেক ম্যাকডোনাল্ড (৫), স্টার্স একাডেমি তখন ধুঁকছে ৮১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে।
মের্লোর পাল্টা আক্রমণ শুরু হয় এরপর থেকেই। তাকে সঙ্গ দিয়ে স্রেফ উইকেট আগলে রাখেন ক্রিস হাউ। প্রতি ওভারেই বাউন্ডারিতে সময়ের দাবি মেটাতে থাকেন মের্লো।
চার ওভারে যখন প্রয়োজন ৩৭ রান, তোফায়েলের এক ওভারে দুই ছক্কা ও এক চার মেরে ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নিশ্চিত করে দেন মের্লো। ওই ওভার থেকে আসে ২২ রান।
মের্লো শেষ পর্যন্ত থাকতে পারেননি। হাসান মাহমুদের বলে স্কুপ খেলতে গিয়ে বোল্ড হন তিনি জয় থেকে ১১ রান দূরে।
পরে হ্যামিশ ম্যাকেঞ্জি আউট হলেও শেষ ওভারে চার বল বাকি রেখেই জিতে যায় স্টার্স একাডেমি।
শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স একাডেমি। ম্যাচ শুরু শনিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টায়।
পাঁচ ম্যাচে চার পয়েন্ট পাওয়া বাংলাদেশের রান রেটও বেশ বাজে (-০.৫৬১)। পাঁচ ম্যাচের সবকটি জিতে ১০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে শিকানো কিংসমেন। ছয় পয়েন্ট আছে চারটি দলের। বাংলাদেশ ছিটকে পড়তে পারে তাই শেষ ম্যাচে মাঠে নামার আগেই।
বাংলাদেশ ‘এ’ দল: ২০ ওভারে ১৫৬/৭ (নাঈম ১৯, জিসান ১৩, সাইফ ৪৫, আফিফ ০, সোহান ৩৩, রকিবুল ৪, ইয়াসির ২৯, তোফায়েল ১*, নাঈম ১*; হাউ ২-০-১২-০, আরিয়ান ৪-০-২৮-১, বার্থসেল ৩-০-৩৪-১, ওয়ারেন ৪-০-৩৮-১, ম্যাকেঞ্জি ৪-০-১৯-৩, মের্লো ২-০-১৭-১, কেলাওয়ে ১-০-৬-০)।
মেলবোর্ন স্টার্স একাডেমি: ১৯.২ ওভারে ১৫৭/৭ ( হার্পার ২৯, রজার্স ১১, কেলাওয়ে ৮, ব্ল্যাকফোর্ড ১২, মের্লো ৬১, ম্যাকডোনাল্ড ৫, হাউ ১৫*, ম্যাকেঞ্জি ৬, আরিয়ান ১*; নাঈম ৩-০-২৭-০, জিসান ১-০-৯-০, হাসান ৩.২-০-২১-১, মুশফিক ৪-০-৩৬-১, রকিবুল ৪-০-২৩-২, সাইফ ২-০-৯-১, তোফায়েল ২-০-১৮-১)।
ফল: মেলবোর্ন স্টার্স একাডেমি ৩ উইকেটে জয়ী।