Published : 21 Sep 2025, 11:03 AM
এক দলের ইনিংস শেষ হয়েছে দুই ওভারের বেশি বাকি থাকতে, আরেক দল গুটিয়ে গেছে তিন ওভার আগেই। কোনো দল ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে না পারলেও এই ম্যাচেই হয়েছে রেকর্ড! নারী ওয়ানডের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড চুরমার করে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার এই লড়াই উঠে গেছে অনন্য উচ্চতায়।
শুধু এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি রানই নয়, ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে দিল্লিতে শনিবার রানের সুনামিতে বয়ে গেছে রেকর্ডের জোয়ার।
রানের প্লাবন
৪৭.৫ ওভারে ৪১২ রানে অলআউট হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ৪৭ ওভারে ৩৬৯ রানে থেমেছে ভারত। দুই দল মিলিয়ে রান হয়েছে ৭৮১। নারী ওয়ানডেতে আগে কখনও ৬৮০ রানও হয়নি।
আগের রেকর্ড ছিল ২০১৭ সালে ব্রিস্টলে ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াইয়ে ৬৭৮। গত মে মাসে কলম্বোতে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে উঠেছে ৬৫১ রান।
অস্ট্রেলিয়ার সেরা
অস্ট্রেলিয়া যেভাবে ছুটছিল, একটা সময় তাদের সম্ভাব্য স্কোর ছিল ৪৫০ রানের আশেপাশে। কিন্তু ৩৪ রানের মধ্যে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে শেষ হয়ে যায় তাদের ইনিংস। তার পরও ৪১২ রান তুলে নিজেদের সর্বোচ্চ স্কোর স্পর্শ করে তারা।
প্রায় ২৮ বছর আগে ১৯৯৭ বিশ্বকাপে ডেনমার্কের বিপক্ষে ৪১২ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া, যে ম্যাচে ছেলে-মেয়ে মিলিয়েই ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি উপহার দিয়েছিলেন বেলিন্ডা ক্লার্ক।
সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড নিউ জিল্যান্ডের। ২০১৮ সালে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ডাবলিনে ৫০ ওভারে তারা তুলেছিল ৪৯১ রান।
রানের তালিকায় পরের চারটি সর্বোচ্চ স্কোরের তিনটিই নিউ জিল্যান্ডের। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪৫৫ ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে অন্য দুই ম্যাচে ৪৪০ ও ৪১৮। মাঝে ৪৩৫ রানের ইনিংস আছে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের।
ভারতের ‘প্রথম’
নারী ওয়ানডেতে এই প্রথম চারশ রান হজম করল ভারত।
আগের সর্বোচ্চ ৩৭১ রানও ছিল অস্ট্রেলিয়ার, গত ডিসেম্বরে ব্রিজবেনে। এছাড়া ভারতের বিপক্ষে ৩৪০ রানও করতে পারেনি কোনো দল। পরের দুই সর্বোচ্চ ৩৩৮ ও ৩৩১ রানও অস্ট্রেলিয়ারই।
অবিশ্বাস্য প্রচেষ্টা
আগে ব্যাট করা দল ৪১২ রান করার পর ম্যাচ কার্যত শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু অসাধারণ রান তাড়ায় এক পর্যায়ে ভারতের জয়টাই মনে হচ্ছিল অবশ্যম্ভাবী! স্মৃতি মান্ধানা যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, ভারত ইতিহাসের পানেই ছুটছিল। তিনি আউট হওয়ার পরও জিইয়ে ছিল সম্ভাবনা।
শেষ পর্যন্ত জিততে না পারলেও ৩৬৯ রান তোলে ভারত। নারী ওয়ানডে ইতিহাসে পরে ব্যাট করে এত রান নেই আর কোনো দলের।
আগের সর্বোচ্চ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। গত বছর বেঙ্গালুরুতে ভারতের ৩২৫ রানের জবাবে তারা থামে ৩২১ রানে।
পাওয়ার প্লের ‘পাওয়ার’
১০ ওভারে এ দিন ৯৬ রান তোলে ভারত। নারী ওয়ানডেতে ‘বল বাই বল’ পরিসংখ্যান থাকা ম্যাচগুলিতে এটি পাওয়ার প্লেতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর।
রেকর্ডটি অবশ্য স্পর্শ করা খুবই কঠিন। গত এপ্রিলে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ ওভারে ১৫৬ করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
বাউন্ডারির বন্যা
৯৯টি চার ও ১২টি ছক্কা হয়েছে এই ম্যাচে। নারী ওয়ানডেতে দুটিই রেকর্ড।
চার-ছক্কা মিলিয়ে ১১১ বাউন্ডারি। নারী ওয়ানডেতে এক ম্যাচে বাউন্ডারি একশ স্পর্শ করল এই প্রথম।
এর আগে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ চার ছিল ৮৩টি, সবচেয়ে বেশি ছক্কা ছিল ৮টি। দুটিই ২০১৭ সালে ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা লড়াইয়ে।
অস্ট্রেলিয়া ১১ ভারত ০
২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে ভারতের বিপক্ষে একাদশ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জিতে নিল অস্ট্রেলিয়া, হারেনি তারা একটিও।
সব দল মিলিয়ে তারা সবশেষ টানা ৯টি ওয়ানডে সিরিজই জিতে নিল। অ্যালিসা হিলির দলের সবশেষ সিরিজ হার ছিল ২০২৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ইংল্যান্ড ছাড়া অন্য কোনো দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সবশেষ ওয়ানডে সিরিজ জিততে পেরেছে সেই ১৯৯৯ সালে! দেশের মাঠে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল নিউ জিল্যান্ড।
মারদাঙ্গা মান্ধানা-১
৫০ বলে সেঞ্চুরি স্পর্শ করেন স্মৃতি মান্ধানা। ছেলে-মেয়ে মিলিয়েই ওয়ানডেতে ভারতের দ্রুতম শতরান এটি। নারী ওয়ানডে ইতিহাসের এটি দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি।
এই ম্যাচের প্রথম ভাগেই ৫৭ বলে সেঞ্চুরি করে অস্ট্রেলিয়ার বেথ মুনি দ্বিতীয় দ্রুততম শতকের রেকর্ডে স্পর্শ করেন পূর্বসূরী কারেন রোল্টনের কীর্তি। দুজনকেই পরে তিনে পাঠিয়ে মান্ধানা জায়গা করে নেন দুইয়ে।
৪৫ বলে সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি মেগ ল্যানিংয়ের, ২০১২ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে।
মারদাঙ্গা মান্ধানা-২
৬৩ বলে ১২৫ রানে থেমেছে স্মৃতি মান্ধানার ইনিংস। স্ট্রাইক রেট ১৯৮.৪১। নারী ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করা ইনিংসে এই স্ট্রাইক রেট দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
এখানেও ভারতীয় ওপেনার পেছনে ফেলেছেন এই ম্যাচের প্রথম ভাগের সেঞ্চুরিয়ান বেথ মুনিকে। ১০৪ বলে ১৩৮ রান করেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার, তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৮৪।
তিন অঙ্ক ছোঁয়া ইনিংসে দুইশ স্ট্রাইক রেটের একমাত্র ইনিংসটি এখনও মেগ ল্যানিংয়ের। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৫ বলে শতরানের ইনিংসে তিনি আউট হয়েছিলেন ৫০ বলে ১০৩ রান করে। স্ট্রাইক রেট ছিল ২০৬।
মারদাঙ্গা মান্ধানা-৩
স্মুদি মান্ধানার ওয়ানডে সেঞ্চুরি হয়ে গেল ১৩টি। স্পর্শ করলেন তিনি নিউ জিল্যান্ডের সুজি বেটসকে। তাদের ওপরে আছেন কেবল মেগ ল্যানিং (১৫টি)।
মারদাঙ্গা মান্ধানা-৪
১৩ সেঞ্চুরির সবকটিই স্মৃতি মান্ধানা করলেন ওপেন করতে নেমে। এখানে তিনিই সবার ওপরে।
নিউ জিল্যান্ডের সুজি বেটস ও ইংল্যান্ডের ট্যামি বাউমন্ট ১২টি করে শতরান করেছেন ইনিংস শুরু করতে নেমে।
মারদাঙ্গা মান্ধানা-৫
সিরিজের আগের ম্যাচটিতে ৯১ বলে ১১৭ রান করেছিলেন স্মৃতি মান্ধানা। টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি উপহার দিলেন তিনি। গত বছরও টানা দুটি শতরান করেছিলেন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।
নারী ওয়ানডেতে টানা দুই সেঞ্চুরি দুই দফায় করতে পেরেছেন আর কেবল ট্যামি বাউমন্ট (২০১৬ ও ২০১৫ সালে)।
টানা চার ওয়ানডেতে শতকের বিশ্বরেকর্ড নিউ জিল্যান্ডের সাবেক ব্যাটার অ্যামি স্যাটার্থওয়েটের।
আরুন্ধাতির দুঃস্বপ্ন
৩ উইকেট নিলেও ৮.৫ ওভারে ৮৬ রান দিয়েছেন আরুন্ধাতি রেড্ডি। ভারতের পেসার ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৯.৭৩।
ভারতে হয়ে এক ম্যাচে অন্তত ৫ ওভার বোলিং করা বোলারদের মধ্যে ওভারপ্রতি রান দেওয়ার হার এটিই সর্বোচ্চ। ২০১২ সালে ছয় ওভার বোলিং করে ওভারপ্রতি ৯.৩৩ রান দিয়েছিলেন রিমা মালহোত্রা।
ভারতের হয়ে এক ম্যাচে আরুন্ধাতির ৮৬ রানের চেয়ে বেশি গুনেছেন স্রেফ একজন বোলার। গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ১০ ওভারে ৮৮ রান দিয়েছিলেন প্রিয়া মিশ্রা।