Published : 14 Jun 2026, 08:16 PM
গ্যালারিতে তখনও দর্শক হাজার দশেক। রোমাঞ্চ-উত্তেজনার বিস্ফোরণে যেন ফেটে পড়ছিল গোটা মাঠ। কিন্তু তাসকিন আহমেদের বলে অ্যাডাম জ্যাম্পার ড্রাইভে বল সীমানার দিকে যেতেই নেমে এলো পিন পতন নীরবতা। অভাবনীয় এক জয়ের যে আশা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের চোখেমুখে তখন হতাশার আঁধার, ২২ গজে জ্বলজ্বল করছিল শুধু দুই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানের চওড়া হাসি।
কুপার কনোলির মহাকাব্যিক ১৪৯ রানের সঙ্গে শরিফুল ইসলামের বিরোচিত ৬ উইকেটে ম্যাচ পৌঁছে গিয়েছিল রোমাঞ্চকর এক মোড়ে। কিন্তু শেষ ওভারের ফয়সালায় শেষ পর্যন্ত পেরে উঠল না বাংলাদেশ। ১ উইকেটের জয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়াল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
শেষের অমন নাটকীয়তার আধঘণ্টা আগেও ম্যাচে অনায়াস জয়ের পথে ছিল অস্ট্রেলিয়া। শেষ ৫ ওভারে প্রয়োজন ছিল তাদের স্রেফ ৯ রান, উইকেট তখনও পাঁচটি। কিন্তু ম্যাচে ভিন্ন আবহের দোলা দিলেন শরিফুল। টানা দুই বলে উইকেট নিয়ে পূর্ণ করলেন তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট। পরে আরও এক উইকেট নিয়ে ম্যাচ আরও জমিয়ে তুললেন এই বাঁহাতি পেসার।
বাংলাদেশ তখন যেন রক্তের স্বাদ পেয়ে তেতে উঠেছে আরও। প্রবল চাপে পড়ে আরও খেই হারাল অস্ট্রেলিয়া। মুস্তাফিজুর রহমানের অনেক বাইরের বল স্টাম্পে টেনে আনলেন কনোলি। গর্জনে ফেটে পড়ল চারপাশ। উইকেট তখণ বাকি একটি, রান লাগে তখনও চার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাসকিন পারলেন না শেষ ওভারে দলকে স্মরণীয় এক জয় এনে দিতে।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে রোববার বাংলাদেশ তোলে ৫০ ওভারে ২৭৪ রান। ৮৮ বলে ৮৩ রান করেন তাওহিদ হৃদয়, ফিফটি করেন লিটন কুমার দাস ও মোসাদ্দেক হোসেন।
রান তাড়ায় অস্ট্রেলিয়া জিতে যায় তিন বল বাকি রেখে।
ইনিংস শুরু করতে নামা কনোলি দেখিয়েছেন, কেন তাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের এত আশা। একার হাতেই দলকে এগিয়ে নেন ২২ বছর বয়সী ক্রিকেটার। প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে ১৩ চার ও ৬ ছক্কায় ১৩৪ বলে করেন তিনি ১৪৯।
শেষের ওই উত্তেজনার পরও বলা যায়, কনোলি একাই হারিয়ে দিলেন বাংলাদেশকে। ২৭৫ রান তাড়ায় একজনই দেড়শ ছাড়িয়ে গেলে বাকি আর থাকে কী!
কনোলির কারণেই হোয়াইটওয়াশড হলো না অস্ট্রেলিয়া।

সিরিজে প্রথমবার টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। আগের ম্যাচ দুটির তুলনায় উইকেটে এ দিন ঘাস ছিল একটু কম। তবে নতুন বলে পেসারদের সহায়তা ছিল ঠিকই।
প্রথম ওভারেই প্রথম উইকেটের দেখা পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। জেভিয়ার বার্টলেটের বলে আলগা ড্রাইভে বল স্টাম্পে টেনে আনেন সৌম্য সরকার।
সেই ধাক্কা সামাল মোটামুটি সামলে নেন তানজিদ হাসান ও নাজমুল হোসেন শান্ত। তবে ইনিংস বড় করতে পারেননি কেউই। জুটি থেমে যায় অর্ধশত পেরিয়েই।
পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে আক্রমণে আসা স্পিনার ম্যাট রেনশকে উইকেট উপহার দিয়ে ফেরেন তানজিদ (২০ বলে ১৯)।
এতে রানের গতি যায় থমকে। পরের ৫ ওভারে রান আসে ৯। এর মধ্যেই রেনশকে সুইপ করার চেষ্টায় উইকেট হারান শান্ত (৫০ বলে ২৪)।
৬১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে নড়বড়ে হয়ে পড়া দলকে ভরসা জোগান লিটন ও হৃদয়।
লিটন শুরুতে টাইমিং করতে ভুগলেও উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাকেন। প্রথম বাউন্ডারি মারতে বল খেলেন তিনি ২৮টি।
হৃদয় ক্রিজে গিয়ে রানের চাকা সচল করেন। ফর্মে থাকলেও ইনিংস বড় করতে পারছিলেন না তিনি সাম্প্রতিক সময়ে। ওয়ানডেতে আগের ১৫ ইনিংসে তার ফিফটি পাঁচটি। তবে প্রতিটিতেই আটকে পড়েন ৬০ ছোঁয়ার আগে। আরও ২৫ ছুঁয়ে ফিফটি করতে পারেননি আরও সাত ইনিংসে। সেই জাল ছিড়ে এবার ইনিংস টেনে নিতে পারেন তিনি।
লিটন একটা পর্যায়ে ধুঁকছিলেন পায়ে ক্র্যাম্প করায়। তার রান যখন ফিফটির কাছে আর শতরানের কাছে জুটি, খেলা আর চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।
৯৫ রানের জুটিতে দলের ভিত তখন শক্ত হয়েছে বেশ। প্রথম ম্যাচে দুর্দান্ত ইনিংস খেলা মোসাদ্দেক হোসেন সেই ফর্মকে বয়ে আনেন এই ম্যাচেও। ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ে রানের গতিতে দম দেন তিনি। হৃদয়ের ব্যাট তখন আরও সাবলিল। দুজনের জুটিতে ৯০ রান আসে ৮১ বলে।
বেন ডোয়ার্শাসকে উড়িয়ে ফ্লিক করে হৃদয়ের ইনিংস থামে ৪৬তম ওভারে। এরপর শেষটা আর প্রত্যাশিত দ্রুততায় করতে পারেনি বাংলাদেশ।
৪৩ বলে ফিফটির পর একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েন মোসাদ্দেক। পরের ৮ বলে তিনি করতে পারেন মোটে ৬ রান।
৪৮তম ওভারে ফিরে ফিফটি পূরণ করেন লিটন। ১১ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে মিরপুরে প্রথম ফিফটি পেলেন তিনি ২৮তম ইনিংসে।
শেষ ওভারে লিটনের ছক্কার পরও শেষ ৫ ওভারে রান আসে মাত্র ৩২। একসময় মনে হচ্ছিল, রান হতে পারে তিনশর আশেপাশে। শেষ পর্যন্ত হয়নি ২৭৫ রানও।
অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়ার শুরুটা ছিল আগ্রাসী। কনোলি ও জশ ইংলিস চার ওভারেই তুলে ফেলেন ৪০ রান।
নাহিদ রানার জায়গায় একাদশে ফেরা শরিফুল ইসলাম পঞ্চম ওভারে আক্রমণে এসেই জোড়া উইকেট এনে দেন দলকে। ইংলিস (১২ বলে ২১) ধরা পড়েন মোসাদ্দেকের হাতে, পায়ের পেছন দিয়ে বোল্ড হন রেনশ (০)।

তাসকিনের বলে শর্ট কাভারে সৌম্যর দারুণ রিফ্লেক্স ক্যাচ অল্পতে ফেরায় অ্যালেক্স কেয়ারিকেও। কিন্তু কনোলিকে থামানোর কোনো পথ পায়নি বাংলাদেশ। তার ব্যাটে রানের স্রোত থাকায় রান রেটের চাপে পড়তে হয়নি অস্ট্রেলিয়াকে। তরুণ ব্যাটসম্যানকে সঙ্গ দেন অন্যরা। টানা তিনটি ষাটোর্ধ্ব জুটিতে দলকে জয়ের কাছে নিয়ে যান তিনি।
৬৪ রানের জুটি আসে মার্নাস লাবুশেনের (২৯) সঙ্গে, ৬৮ রানের জুটি ক্যামেরন গ্রিনকে (২৭) নিয়ে এবং সিরিজে প্রথম খেলতে নামা অলিভার পিকের (২৭) সঙ্গে জুটি ৬৪ রানের।
তখনও পর্যন্ত ভাবা যায়নি, কত নাটক জমা আছে এই ম্যাচে!
পিককে ফিরিয়ে জুটি ভাঙার পরের বলেই শরিফুল বোল্ড করেন দিলেন জেভিয়ার বার্টলেটকে। পরের ডেলিভারিতে হ্যাটট্রিক হলো না একটুর জন্য।
এরপর নিজের বলে বেন ডোয়ার্শাসের ক্যাচ নিতে পারলেন না মুস্তাফিজ। পরের ওভারেই সেই ডোয়ার্শাস ক্যাচ ক্যাচ দিলেন পয়েন্টে। বাংলাদেশে পঞ্চম বোলার হিসেবে এক ম্যাচে ছয় উইকেটের স্বাদ পেলেন শরিফুল।
দুই বল পর সেটি হতে পারত প্রথম বোলার হিসেবে সাত উইকেট। কিন্তু জ্যাম্পার ব্যাটে ছোবল দিয়ে আসা বল গালিতে মুঠোয় জমাতে ব্যর্থ হলেন তানজিদ হাসান।
১৪৯ রানে দাঁড়িয়ে টানা তিন ওভারে স্ট্রাইক না পেয়ে আরেক প্রান্ত থেকে কনোলি দেখছিলেন সতীর্থদের আসা-যাওয়া।
অবশেষে ৪৯তম ওভারে তিনি পেলেন স্ট্রাইক। কিন্তু তার অসাধারণ ইনিংসের সমাপ্তিও হলো হতাশা। ওভারের তৃতীয় বলে আলগা শটে যখন তিনি ড্রেসিং রুমের পথ ধরলেন, সুবাস সুবাস তখন পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। ৫ রানের মধ্যে ৪ উইকেট নিয়ে অপেক্ষা তখন আর একটি উইকেটের।
শেষ পর্যন্ত মধুর সমাপ্তি হলো না। অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করা আর আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের আটে ওঠাও হলো না।
তবে ওয়ানডেতে ক্রমে উন্নতির পথে থাকা বাংলাদেশ পেল সামনের পথচলায় প্রেরণার অনেক রসদ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৭৪/৪ (সৌম্য ২, তানজিদ ১৯, শান্ত ২৪, লিটন ৫৮*, হৃদয় ৮৩, মোসাদ্দেক ৫৬*, শেখ মেহেদি ৩; বার্টলেট ৮-০-৪৭-২, মেরেডিথ ৭-০-৪১-০, ডোয়ার্শাস ৮-০-৫৫-১, গ্রিন ৬-২-১৮-০, রেনশ ৯-০-৪৪-২, জ্যাম্পা ১০-০-৪৮-০, লাবুশেন ২-০-১০-০)।
অস্ট্রেলিয়া: ৪৯.৩ ওভারে ২৭৭/৯ (কনোলি ১৪৯, ইংলিস ১৯, রেনশ ০, কেয়ারি ৮, লাবুশেন ২৯, গ্রিন ২৭, পিক ২৭, বার্টলেট ০, জ্যাম্পা ৪*, মেরেডিথ ২*; তাসকিন ৭.৩-১-৫৯-১, মুস্তাফিজ ১০-০-৫৬-১, শরিফুল ১০-১-৪৮-৬, শেখ মেহেদি ১০-১-৩৭-১, তানভির ৭-০-৩৮-০, মোসাদ্দেক ৬-০-৩৬-০)
ফল: অস্ট্রেলিয়া ১ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: কুপার কনোলি।
ম্যান অব দা সিরিজ: মোসাদ্দেক হোসেন।