Published : 20 May 2026, 07:50 PM
তাইজুল ইসলামের ঝুলিয়ে দেওয়া বলে উঁচিয়ে মারলেন খুররাম শাহজাদ। কেউ একজন চিৎকার করে বললেন, “ক্যাচ তামিম ক্যাচ… আছে.. আছে…।” এখানে ‘আছে’ বলতে বোঝানো হচ্ছিল, বল সীমানার ভেতরই আছে, ক্যাচের সুযোগ আছে। লং অনের ফিল্ডার তানজিদ হাসান তামিম ঠিকই ক্যাচটি নিলেন। নিশ্চিত হলো বাংলাদেশের জয়। ওই মুহূর্তটিতে যেন থমকে গেল সময়। কিংবা ওখান থেকেই সূচনা হলো নতুন সময়, নতুন দিনের!
ওখানে সময় আটকে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। সিলেট টেস্টের এই জয় শুধুই একটি জয় নয়। গর্বের এক অধ্যায়ও। ক্রিকেটের অভিজাত সংস্করণে গৌরবের আঁচড় কাটার প্রতীক।
২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে তাদেরকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। সেই সফরে একটি জয় পেলেই তা হতো বড় প্রাপ্তি। সেখানে সিরিজ জয় তো ছিল অভাবনীয় অর্জন।
সেবারের জয়ে প্রত্যাশার সীমানা বেড়ে গেছে বলেই এবারের সিরিজে জয় ছিল খুবই প্রত্যাশিত এবং কাঙ্ক্ষিত। দেশের মাঠে স্পোর্টিং উইকেট তৈরি করে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল নিজেদেরও। দুই টেস্টে ১০ দিনে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হয়েছে দলকে, হতাশার কিছু মুহূর্ত এসেছে, শঙ্কা উঁকি দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চ্যালেঞ্জ মাড়িয়ে আবার ২-০ ব্যবধানের জয়ে নিজেদের রাঙিয়েছে দল।
ঘরে ও বাইরে, দুই জায়গাতেই পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা প্রথম দল বাংলাদেশ। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবার জিতল তারা টানা চার টেস্ট। প্রথমবার জায়গা করে নিল আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের সাত নম্বরে। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় উঠে এলো পাঁচ নম্বরে।
বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এমন ঝলমলে সময় আর কবে এসেছে!

বিশ্ব ক্রিকেটের বাস্তবতায় এমন কিছুই হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তো আনন্দময় দিনরাত্রি! সময় এখানে থমকে যেতেই পারে! গৌরবগাঁথা রচনা হতে পারে, উচ্ছ্বাসের প্রবাহে ভেতর-বাহির সিক্ত হতে পারে, উদযাপনের নানা আয়োজন থাকতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চলমান স্রোতে একটি সময়ে আটকে থাকার সুযোগ নেই। শীর্ষে থাকা দলগুলির জন্যও তো উৎকর্ষের চূড়ান্ত সীমা নেই। সেখানে বাংলাদেশের মতো তলানির দলগুলির জন্য নিত্যই চ্যালেঞ্জ নিজেদেরকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার।
বাংলাদেশের জন্যও তাই এখন হাতছানি নতুন ধাপে পৌঁছানোর। এই যে র্যাঙ্কিংয়ের সাত নম্বরে ওঠা বা টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচ জায়গা করে নেওয়া, এই বছরের অস্ট্রেলিয়া সফর ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পরও কি এই অবস্থান থাকবে?
নতুন সময়ের বাংলাদেশকেই সেই জবাব দিতে হবে।
ম্যাচের পর নাজমুল হোসেন শান্তর সংবাদ সম্মেলনেও উঠে এলো সবকিছুই। ঘাম ঝরানোর ফল পাওয়ার তৃপ্তি যেন ছিল বাংলাদেশ অধিনায়কের কণ্ঠে, তেমনি ছিল সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাড়নাও।
“প্রত্যেকটি টেস্ট ম্যাচই জিততে পারলে ভালো লাগে। তার মধ্যে যদি এরকম দাপট এমন মানসম্পন্ন দলের বিপক্ষে জিততে পারি, অবশ্যই অনেক গর্বের ব্যাপার। অনেক পরিশ্রম ছিল, প্রত্যেক ক্রিকেটার যে প্রস্তুতি নিয়েছে, কষ্ট করেছে এবং মাঠে গিয়ে দলের জন্য খেলার চেষ্টা করেছে…কেউ ব্যর্থ হয়েছে, কেউ কেউ দলের জন্য করতে পেরেছে… তবে সবার একটাই চিন্তা ছিল যে, কীভাবে এই দুটি ম্যাচ আমরা জিততে পারি। ওই জায়গাটা থেকে বলব যে, সবার ওই কষ্ট বিফলে যায়নি।”
“এখান থেকে আমাদের সামনের দিকে আরও এগিয়ে যেতে হবে এবং আমি মনে করি যে আরও কিছু কিছু জায়গা আছে, যদি আমরা ফাইন টিউন করে উন্নতি করতে পারি, তাহলে দল আরেকটু ভালো অবস্থানে যাবে।”
আগের অন্য সব জয় থেকে এবারের জয়ের একটি বাড় পার্থক্য হলো, মাঠের ভেতরে ছোট ছোট অনেক লড়াইয়ে জিতেছে বাংলাদেশ। মাঠে কথার লড়াই, স্লেজিং, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সবকিছুতেই এই দল ছাপ রেখেছে সত্যিকারের একটি টেস্ট দল হয়ে ওঠার। সিলেট টেস্টের চতুর্থ বিকেলে মোহাম্মাদ রিজওয়ানের সঙ্গে লিটন দাস ও শান্তর কথার উত্তাপের ভাইরাল ভিডিওতেই তা ফুটে উঠেছে স্পষ্ট হয়ে। যে আত্মবিশ্বাস, যে কর্তৃত্ব, যে মানসিকতা নিয়ে সেই লড়াইয়ে জড়িয়েছেন এবং নিজেদের উপস্থাপন করেছেন তারা, সেখাসেই ফুটে উঠেছে এই দলে বিজ্ঞাপন।
ম্যাচের পর শান্ত বললেন, কার্যকর একটি বোলিং আক্রমণ থাকায় মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সাহস তারা পেয়েছেন এবং এই লড়াই তারা দারুণ উপভোগ করেছেন।
“আমি বলব না একদম ওই জায়গাটাতে আমরা পুরোপুরিভাবে পৌঁছে গেছি, তবে আপনার হাতে যখন মানসম্পন্ন বোলিং আক্রমণ থাকবে, ওই কঠিন সময়টা (প্রতিপক্ষকে দেওয়া যায়)। মাঠে যে (মনস্তাত্ত্বিক) লড়াইগুলো হয়, তখন আমরা একটু এগিয়ে থাকি, কারণ আমাদের হাতে ওই ধরনের অস্ত্র আছে, আমরা বোলিং বা ফিল্ড প্লেসমেন্ট করে ওই আক্রমণ ওদেরকে করতে পারি।”
“টেস্ট ক্রিকেটে এই জিনিসগুলো হয় (কথার লড়াই), এটাই আসলে সৌন্দর্য। ওই মুহূর্তগুলোতে যারা মানসিকভাবে জিতবে, আমার মনে হয় বোলিং-ব্যাটিংয়েও তখন বাড়তি একটা সুবিধা পায়। কাজেই এটা ভালো লেগেছে। অধিনায়ক হিসেবে যখন দেখি যে আমরাও মাঠে ওদেরকে কটিন অবস্থায় ফেলতে পারছি, এটা অবশ্যই ভালো লাগার বিষয়।”
এবারের জয়ে আরেকটি বড় ব্যাপার ছিল টস। ২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে দুই টেস্টেই টস জিতে আগে বোলিং করেছিল বাংলাদেশ। এবার সবুজ উইকেটে মেঘলা আকাশের নিচে টস হেরে আগে ব্যাটিংয়ের কঠিন পরীক্ষায় নামতে হয়েছে। তার পরও দল জিতেছে। এখানে দলের উন্নতিতে সন্তুষ্ট অধিনায়ক।
“আমার মনে হয় এরকম খুব একটা খুব কমই হয়েছে (টসে হেরে দুটি ম্যাচ জয়)। আমরা সবসময় ড্রেসিং রুমে আলাপ করতাম যে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বা কঠিন সময়ে আমরা কীভাবে দলকে একটা ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারি। এই টেস্টে আমি বলব যে টসে হারার পরে এরকম কঠিন সময়ে ব্যাটসম্যানরা ভালো রান দিয়েছে দুই টেস্ট ম্যাচেই…ব্যাটিং অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল, তাদের ভালো টেস্ট বোলারও ছিল। এখানে আমি বলব বিশাল উন্নতি হয়েছে।”
এই জায়গায় যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি উন্নতির জায়গাও কম নেই। অধিনায়ক সুনির্দিষ্ট করে বললেন দুটি দিক।
“আমাদের বোলিং আক্রমণ ভালো, তবে নতুন বলে আমরা অনেক রান দিয়ে ফেলি অনেক সময়। এই জায়গাটাতে যদি আমরা শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে কঠিন সময় দিতে পারি, তাহলে দলের জন্য ভালো হবে। টপ অর্ডারদেরও ভালো করতে হবে। লাল বলে কঠিন কন্ডিশনে ব্যাটিং করাটা অনেক চ্যালেঞ্জের। এই জায়গাটাতে যদি একটু বড় জুটি আমরা…। এই দুটি জায়গায় যদি আমরা আরেকটু ঠিক করতে পারি, তাহলে দলটা আরও ভালো অবস্থানে থাকবে।”
অপেক্ষা এখন সেই ‘আরও ভালো অবস্থানের।’ বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই ফুরফুরে সময়ে দাঁড়িয়ে আকাঙ্ক্ষা আরও তরতাজা সুবাতাসের।