Published : 10 Aug 2025, 08:18 AM
চুক্তির মাঝপথেই গত বছর বিসিবির চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন টনি হেমিং। বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন তিনি অনেক অভিমান, আক্ষেপ ও ক্ষোভকে সঙ্গী করে। খ্যাতিমান সেই কিউরেটরকে আবার ফিরিয়ে এনেছে বিসিবি। তিনি ফিরে আসায় বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে বিসিবির দীর্ঘদিনের কিউরেটর গামিনি সিলভার।
এই মুহূর্তে ছুটিতে শ্রীলঙ্কায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে গেছেন অনেক বছর ধরেই আলোচিত-সমালোচিত গামিনি। বিসিবি সভার আগেই শনিবার প্রথম প্রহরে ঢাকায় চলে এসেছেন হেমিং। পরে বোর্ড সভায় চূড়ান্ত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান এই কিউরেটরের নিয়োগ। তার চুক্তির মেয়াদ দুই বছর।
ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে খ্যাতিমান পিচ কিউরেটরদের একজন এই হেমিং। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন টার্ফ ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। তিনি একজন মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকও। তার কাজের অভিজ্ঞতা ব্যাপক ও বিস্তৃত। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি দীর্ঘদিন। পার্থের এখনকার মূল টেস্ট ভেন্যু অপ্টাস স্টেডিয়ামে তিনি ছিলেন অ্যারেনা ম্যানেজার।
দুবাইয়ে আইসিসি ক্রিকেট একাডেমি ও দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিনি ছিলেন প্রধান কিউরেটর। ওমান ক্রিকেট একাডেমিতে ছিলেন আইসিসি পিচ পরামর্শক। আইসিসি ক্রিকেট একাডেমিতে কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক প্রেজেন্টার ও এডুকেটর হিসেবেও। এমনকি ফুটবলের মাঠ নিয়েও কাজ করার অভিজ্ঞতা তার আছে সৌদি আরবের রিয়াদে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক ফুটবল স্টেডিয়ামের অ্যারেনা ম্যানেজার হিসেবে।
এমন একজন কিউরেটরকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বিসিবি নিয়ে আসে দুই বছরের চুক্তিতে। কিন্তু এক বছর পরই আচমকা পদত্যাগ করে তিনি পিসিবির প্রধান কিউরেটরের দায়িত্ব নেন গত বছরের জুলাইয়ে।
দায়িত্ব ছাড়ার পর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, বিসিবিতে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তিনি পাননি। গামিনির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছিলেন ‘শ্রীলঙ্কান সিন্ডিকেটের’ কথা। সেই হেমিংকে আবার আসতে রাজি করিয়েছে বিসিবি। পিসিবির চাকরি ছেড়ে দিয়ে ফিরেছেন তিনি ঢাকায়।
এবার পদবি যেমন ভিন্ন- হেড অব টার্ফ ম্যানেজমেন্ট, তেমনি বদলে যাবে তার কাজের ধরনও। মাঠ ও পিচ তৈরি সংক্রান্ত ব্যাপারে এখন তিনিই সবার ওপরে। বিসিবি গ্রাউন্ডস বিভাগের আওতায় টার্ফ ম্যানেজমেন্ট নামে আলাদা একটি উইং তৈরি করছে বিসিবি। সেই বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করবেন হেমিং।
বিসিবির সভা শেষে শনিবার বোর্ড পরিচালক ইফতেখার রহমান জানান, শুধু উইকেট তৈরি বা দেখভাল করাই নয়, দেশের কিউরেটরদের তৈরি করার কাজটিও করবেন হেমিং।
“টমি হেমিংয়ের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। টার্ফ ম্যানেজমেন্ট নামে আমরা একটি আলাদা ইউনিট বানাচ্ছি। সেটির প্রধান হিসেবে কাজ করবে সে। আমাদের যত আন্তর্জাতিক ভেন্যু আছে, সবগুলো সে দেখভাল করবে এবং সব মাঠের কিউরেটররা তার তত্ত্বাবধানে থাকবে। পিচগুলোর উন্নতি বলুন, রিলেয়িং বলুন, তার তত্ত্বাবধানেই হবে।”
“তাকে আনার ব্যাপারে বোর্ড পরিচালকদের ইচ্ছা ছিল এবং আমাদের সভাপতি মহোদয়ের যে চাওয়া, সে (হেমিং) আমাদের কিউরেটরকে প্রশিক্ষিত করবে, যাতে ভবিষ্যতে আমাদেরই এমন সম্পদ গড়ে ওঠে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই চারজন মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আগেই। এখন তাদের নিয়ে কাজ করে হেমিং আমাদের নিজেদের কিউরেটরদের উন্নতি করাবে। কাজেই হেমিংয়ের মূল কাজ দুটি- আন্তর্জাতিক ভেন্যুগুলোর পিচ দেখভাল করা ও স্থানীয় কিউরেটরদের ট্রেনিং দেওয়া।”
গত বছর বিসিবির দায়িত্ব ছাড়ার পর নানা অভিযোগের পাশাপাশি হেমিং আঙুল তুলেছিলেন বিসিবি পরিচালক ও গ্রাউন্ডস বিভাগের প্রধান মাহবুব আনামের দিকেও। সেই মাহবুব এখনও আছেন গ্রাউন্ডস বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে।
তবে এবার হেমিং খুশিমনেই এসেছেন বলে মনে করেন ইফতেখার।
“সে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা দুই-তিন কিউরেটরের একজন। তিনি ফিরে এসেছেন, তার মানে গতবারের তার কাজের অভিজ্ঞতা হয়তো ভালো ছিল। আমরা যখন আবার প্রস্তাব দিয়েছি, সেই কারণেই হয়তো রাজি হয়েছেন।”
হেমিং আসায় সম্পূরক প্রশ্নও উঠে যাচ্ছে, গামিনি সিলভার ভবিষ্যৎ তাহলে কি? সাবেক এই টেস্ট আম্পায়ার গত ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন বিসিবির কিউরেটর হিসেবে। মিরপুরের উইকেটের মান নিয়ে নানা সময়েই অনেক প্রশ্ন উঠেছে, তীব্র সমালোচনাও হয়েছে, দেশি-বিদেশি ক্রিকেটাররা নানারকম কথা বলেছেন, সমালোচনা করে এমনকি একসময় জরিমানাও গুনতে হয়েছে তারকা ক্রিকেটার তামিম ইকবালকে। কিন্তু গামিনির চুক্তি বারবারই বাড়িয়েছে বিসিবি। সেটির পেছনেও নানা গুঞ্জন ও গল্প ছড়িয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে।
অবশেষে প্রথমবার তার চাকরি এখন নড়বড়ে হয়েছে। শনিবারের বোর্ড সভা শেষে বিসিবি পরিচালক ইফতেখার অবশ্য সুনির্দিষ্ট করে বলতে চাইলেন না এখনই।
“সময়ই বলবে, গামিনি থাকছেন নাকি থাকছেন না। এখন যে ব্যাপারটি হয়েছে, গামিনির চুক্তি এক বছর বাড়ানো হয়েছে। তাকে বরখাস্ত করতে হলে দুই মাস আগে নোটিশ দিতে হবে। আজকেই তো টনি হেমিং এসেছে, গামিনিকে নিয়ে এখনই বলা কঠিন।”
গত মাসেই কেন গামিনির চুক্তির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হলো, সেই প্রশ্নে ইফতেখারের উত্তর,” তখন আমাদের অপশন ছিল না।”
গামিনিকে নিয়ে বারংবার প্রশ্নে বিসিবির এই পরিচালকের আরেকটি উত্তরে অনেকটা স্পষ্টই ফুটে উঠল, ৬৪ বছর বয়সী এই কিউরেটরের বিদায় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
“এটা সামনে দেখেন কী হয়… আমরা তার ওপরে একজনকে এনেছি। তাকে কিছুটা সময় দেই আমরা, গ্রাউন্ডস কমিটি অবশ্যই বসবে, সবারই ভালোমন্দ আছে। ওকে সপ্তাহ-দশদিন সময় দিলে বোঝা যাবে আরও।”
“আমরা যদি খুশি হতাম (গামিনিকে নিয়ে), তাহলে কিন্তু টনি হেমিংয়ের কাছে আমরা যেতাম না। আমরা উন্নতির প্রক্রিয়ায় যাচ্ছি। সব বিভাগেই উন্নতির চেষ্টা করছি আমরা।”
শনিবারের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বোর্ড সভায় নিশ্চিত হয়েছে জাতীয় দলের বিশেষজ্ঞ ব্যাটিং কোচ হিসেবে জুলিয়ান উডের নিয়োগও। তিনি মূলত পাওয়ার হিটিংয়ের বিশেষজ্ঞ। তাকে বলা হয় ক্রিকেট বিশ্বের প্রথম পাওয়ার হিটিং কোচ। বিপিএলে কাজ করে গেছেন তিনি দুই মৌসুমে। কাজ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দলে। সম্প্রতি পাওয়ার হিটিংয়ের টোটকা দিয়েছেন তিনি শ্রীলঙ্কাকেও। সামনের এশিয়া কাপ ও আগামী বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চোখ রেখে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের পাওয়ার হিটিং নিয়ে কাজ করবেন ৫৬ বছর বয়সী এই ইংলিশ কোচ।
মনোবিদ হিসেবে ডেভিড স্কটের নিয়োগও চূড়ান্ত হয়েছে এই সভায়। এছাড়াও ভারতের কাদাম্বা টেকনোলজিস থেকে জাতীয় দলের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট আনার ব্যাপারটিও অনুমোদন পেয়েছে। আগেও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই অ্যানালিস্ট এনেছে বিসিবি।