Published : 01 Jan 2026, 05:14 PM
মোহাম্মাদ আমিরের নিখুঁত ইয়র্কারে স্রেফ ব্যাট পেতে দিলেন শামীম হোসেন। গর্জন উঠল গ্যালারিতে। উল্লাসে মেতে উঠল সিলেটের ডাগ আউট। ওই বলে ছক্কা হলে ম্যাচ গড়াত সুপার ওভারে। কিন্তু কোনো রানই হলো না। শেষ পর্যন্ত ব্যবধান ওই ৬ রানের।
ম্যাচ শেষের মিনিট ১৫ আগেও নিশ্চিতভাবে কারও ভাবনার সীমানায় ছিল না এমন কিছু। আজমাতউল্লাহ ওমারজাইয়ের অসাধারণ অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে সহজ জয়ের পথেই ছিল সিলেট। শেষ দুই ওভারে ঢাকার প্রয়োজন ছিল ৪৫ রান। উইকেট বাকি দুটি। কার্যত শেষ হয়ে যাওয়া সেই ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে প্রাণ ফেরান শামীম হোসেন। টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের অসাধারণ প্রদর্শনীতে জাগিয়ে তোলেন অভাবনীয় এক জয়ের সম্ভাবনা। তবে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেননি একার লড়াইয়ে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দুই দিন বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হলো বিপিএল। গ্যালারির দর্শকদের উল্লাসে ভাসিয়ে ঢাকা ক্যাপিটালসকে ৬ রানে হারাল সিলেট টাইটান্স।
শামীমের ওই শেষের তাণ্ডবের আগে ম্যাচ ছিল পুরোটাই ওমারজাইময়। আইএল টি-টোয়েন্টি খেলে আগের রাতেই সিলেটে দলের সঙ্গে যোগ দেন আফগান অলরাউন্ডার। পরদিন মাঠে নেমেই দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে তিনি সিলেটের জয়ের নায়ক। ব্যাট হাতে বিধ্বংসী ফিফটির পর বল হাতেও কার্যকর উপহার দেন ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার সিলেট টাইটান্স ২০ ওভারে তোলে ৫ উইকেটে ১৭৩ রান। রান তাড়ায় বেশির ভাগ সময় খুঁড়িয়ে এগোতে থাকা ঢাকা পরে শামীমের চোখধাঁধানো ইনিংসের পর থামে ১৬৭ রানে।

২৪ বলে ৫০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন ওমারজাই। বিপিএলে ২১ ম্যাচে তার প্রথম ফিফটি এটি। পরে বল হাতে উইকেট নেন তিনটি।
৯ চার ও ৩ ছক্কায় ৪৩ বলে ৭৯ রানে অপরাজিত থাকেন শামীম। টি-টোয়েন্টিতে তার ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস এটি।
ম্যাচের শুরুতে টস হেরে ব্যাটিং পেয়ে একটু হতাশই ছিলেন সিলেট অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। গুমোট আবহাওয়ায় তার চাওয়া ছিল আগে বোলিং। ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটাও ভালো করতে পারেনি তারা। পাওয়ার প্লেতে ২ উইকেট হারিয়ে রান তুলতে পারে মাত্র ৩৪।
দ্বিতীয় ওভারে তাসকিন আহমেদকে দুটি চার মেরে রান তালুকদার বিদায় নেন পরের ওভারে সালমান মির্জার বলে। মিড অনে দারুণ ক্যাচ নেন সাব্বির রহমান।
পরের ওভারেই তাসকিনের স্লোয়ারে উইকেট হারান তিনে নামা মিরাজ। এবার অনেক দৌড়ে ভালো ক্যাচ নেন সালমান।
ওপেন থেকে নেমে একপ্রান্তে ধুঁকছিলেন সাইম আইয়ুব। ফর্মে থাকা পারভেজ হোসেন ইমন ক্রিজে যাওয়ার পর রানের গতি বাড়ে একটু। নবম ওভারে নাসির হোসেনকে ছক্কা মারার পর সাইফ উদ্দিনকেও ছক্কায় উড়িয়ে দেন তিনি সোজা ব্যাটে দৃষ্টিনন্দন শটে।
প্রথম ১২ ওভারে কোনো বাউন্ডারি মারতে পারেননি সাইম। তার রান তখন ৩১ বলে ২২।

পরে একটি ছক্কা মারতে পারেন তিনি সাইফ উদ্দিনের বলে। পরের বলেই জীবন পেয়ে আউট হয়ে যান তিনি ওই ওভারেই। ৩৪ বল খেলে রান করতে পারেন কেবল ২৯।
পারভেজের ইনিংস শেষ হয় পরের ওভারেই। সাইফ হাসানের বলে ক্যাচ দেন তিনি প্রিয় সুইপ খেলে। চার নম্বরে আগের দুই ম্যাচে ৬৫ ও ৬০ রানের ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যান এবার করেন ৩২ বলে ৪৪।
ওমারজাই ক্রিজে গিয়ে চারটি ডেলিভারি দেখে খেলেন। এরপর তোলেন ঝড়। তাসকিনের এক ওভারে বাউন্ডারি মারেন তিনটি। এরপর শেষের আগের ওভারে দুটি ছক্কা দুটি চার মারেন সালমান মির্জাকে।
তাতে অবদান আছে প্রতিপক্ষেরও। ১৫ ও ২৭ রানে জীবন পান তিনি, দুবারই ক্যাচ ছাড়েন শামীম হোসেন।
শেষ ওভারে তাসকিনকে প্রথম বলে ছক্কা ও শেষ বলে বাউন্ডারি মেরে পৌঁছে যান তিনি পঞ্চাশে।
শেষ দিকে ৬ বলে ১৩ রান করেন ইংলিশ অলরাউন্ডার ইথান ব্রুকস। জুটিতে আসে ২০ বলে ৫১ রান।
শেষ ৫ ওভারে ৭৪ রান তোলে সিলেট।
রান তাড়ায় ঢাকা লড়াই থেকে ছিটকে পড়ে পাওয়ার প্লেতেই। প্রথম ওভারেই মেডেন নিয়ে শুরু করেন মোহাম্মদ আমির। সিলেটের পাকিস্তানি পেসার পরের ওভারে দুর্দান্ত ডেলিভারিতে উপড়ে দেন আফগান ব্যাটসম্যান জুবাইদ আকবারির স্টাম্প।
তিনে নেমে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেন উসমান খান। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে বোল্ড হয়ে যান তিনি (১৫ বলে ২১) নাসুম আহমেদের বলে।
ওমারজাইকে একটি ছক্কা মারা ছাড়া বাকি সময়টায় সাইফ ভুগছিলেন প্রচণ্ড। ১৭ বলে ৯ রান করে আউট হন তিনি ওমারজাইয়ের বলেই। আফগান তারকা এক বল পরই ফিরিয়ে দেন ঢাকার অধিনায়ক মিঠুনকে (০)।
পরের ওভারে ড্রেসিং রুমে ফেরেন অভিজ্ঞ নাসির হোসেনও। ঢাকার রান তখন ৫ উইকেটে ৪৩।
এরপর সাব্বির হোসেন ও শামীম হোসেন চেষ্টা করেন দলকে লড়াইয়ে ফেরাতে। সেই প্রচেষ্টা খুব দীর্ঘায়িত হয়নি। দুটি ছক্কা মারার পর আরেকটির চেষ্টায় উইকেট হারান সাব্বির (১৯ বলে ২৩)।
ঢাকার ইনিংসের বাকিটুকু শুধুই শামীমের গল্প। তিনি ছন্দে থাকে যেমন খেলেন, এই ইনিংসে ছিল সেসবের সবটুকুই। আগ্রাসন, পেশির জোর আর উদ্ভাবনী শট, ছিল সবই।
আমির ও ওমারজাইয়ের টানা দুই ওভারে ইমাদ ওয়াসিম ও সাইফ উদ্দিন আউট হওয়ার পর শেষ তিন ওভারে ৫৬ রান প্রয়োজন হয় ঢাকার। শামীম তখন খেলছেন ২৭ বলে ৩৭।
মূলত দেখার ছিল, তিনি ফিফটি করতে পারেন কি না। কিন্তু তার মনে ছিল ভিন্ন কিছু। খালেদকে ছক্কা মেরে তার শেষের ঝড়ের শুরু। ১৯তম ওভারে ওমারজাইকে মারেন দুটি চার ও একটি ছক্কা। শেষ ওভারে তার পরও ছিল ২৭ রানের প্রায় অসম্ভব সমীকরণ।
সেখানেও ম্যাচ জমিয়ে দেন শামীম। আমিমের মতো বোলারের ওভারে রিভার্স স্কুপে একটি ছক্কাসহ চার মারেন তিনটি। কিন্তু শেষ বলটিতে পাকিস্তানি পেসার উতরে যান অভিজ্ঞতা দিয়ে।
নবম উইকেটে ২২ বলে ৫১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে তাসকিনের অবদান ৫ বলে ৩, শামীমের ১৭ বলে ৪৫!
ঢাকা জিততে না পারলেও বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য দারুণ সুখবর শামীমের এই ইনিংস।
তিন ম্যাচে সিলেটের এটি দ্বিতীয় জয়, দুই ম্যাচে ঢাকার প্রথম পরাজয়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
সিলেট টাইটান্স: ২০ ওভারে ১৭৩/৫ (সাইম ২৯, রনি ১১, মিরাজ ৬, পারভেজ ৪৪, আফিফ ১৩, ওমারজাই ৫০*, ব্রুকস ১৩*; ইমাদ ৩-০-১৪-০, তাসকিন ৪-০-৪৬-১, সালমান ৪-০-৪৬-২, নাসির ৩-০-২০-০, সাইফ উদ্দিন ৪-০-৩২-০, সাইফ হাসান ২-০-১৩-১)।
ঢাকা ক্যাপিটালস: ২০ ওভারে ১৬৭/৮ (সাইফ হাসান ৯, আকবারি ১, উসমান ২১, মিঠুন ০, নাসির ৫, শামীম , সাব্বির ২৩, ইমাদ ৮, সাইফ উদ্দিন ০, তাসকিন ৩*; আমির ৪-১-৩০-০, নাসুম ৪-০-২৬-২, ওমারজাই ৪-০-৪০-৩, মিরাজ ৩-০-১৯-১, খালেদ ৩-০-২৫-০, সাইম ১-০-১৪-০, আফিফ ১-০-৬-০)।
ফল: সিলেট টাইটান্স ৬ রানে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: আজমাতউল্লাহ ওমারজাই।