Published : 20 Jan 2026, 08:55 AM
বিপিএলের এলিমিনেটর ম্যাচের আগে সিলেট টাইটান্স দলে যোগ করেছে ক্রিস ওকসকে। ইংল্যান্ডের ২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের নায়কদের একজন তিনি, জিতেছেন ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও। তবু ওকস মানে সবকিছুর আগে কার্যকর এক টেস্ট অলরাউন্ডার। তিনি নিজেও টেস্ট ক্রিকেটের তুলনীয় কিছু দেখেন না। গত দুই বছরে ইংল্যান্ডের হয়ে শুধু টেস্টই খেলছিলেন। কিন্তু গত অগাস্টে ভারতের বিপক্ষে ওভাল টেস্টে ফিল্ডিংয়ের সময় কাঁধে চোট পেয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েন। সেই চোটই শেষ করে দেয় তার টেস্ট ক্যারিয়ার।
পরে সেরে উঠে তিনি খেলেছেন গত মাসে আইএল টি-টোয়েন্টিতে। এখন এলেন বিপিএলে। তার পরিচয় এখন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটার, তবে হৃদয়জুড়ে আছে টেস্ট ক্রিকেটই। ৩৬ বছর বয়সী ইংলিশ ক্রিকেটার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শোনালেন টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি তার আবেগ ও ভালোবাসা, কিংবদন্তিদের সঙ্গে খেলা, ওয়ানডে ক্রিকেটের বাঁকবদলের সঙ্গী হওয়া ও আরও অনেক গল্প।
সিলেটের হয়ে বিপিএল খেলতে এলেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটার হিসেবে ক্যারিয়ারের এই অধ্যায়টি কেমন?
ক্রিস ওকস: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের জীবনের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন! কোথায় খেলতে চাই বা এই ধরনের কিছু বেছে নেওয়ার সময়ের অভাব নেই এখন।
ইংল্যান্ডের হয়ে অনেকবারই বাংলাদেশে এসেছি। বিপিএলের অংশ হওয়া আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। সিলেট দলের হয়ে খেলতে রোমাঞ্চিত।
মইন আলির সঙ্গে কথা হয়েছিল এখানে আসার আগে?
ওকস: হ্যাঁ, কথা বলেছি মইনের সঙ্গে। বেশ অনেকটা আলোচনাই হয়েছে। আরও আগে এখানে আসার আশা করেছিলাম, তবে সবকিছু তখন ব্যাটে-বলে হয়নি। তার পরও ভালো লাগছে যে, শেষ পর্যন্ত আসতে পেরেছি।
আপনার কাঁধের কি অবস্থা এখন? গত অগাস্টের শুরুতে ওভাল টেস্টে ওই চোটে পড়ার পরই বলা হলো, আপনাকে অ্যাশেজে রাখা হবে না, পরে অবসরই নিয়ে ফেললেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে। কিন্তু ডিসেম্বরেই আইএল টি-টোয়েন্টিতে খেললেন, অ্যাশেজে খেলার সামান্যতম সম্ভাবনাও কি ছিল?
ওকস: জানি না… যখনই অবসর ঘোষণা করেছি এবং সেটা করেছি, নিজের সিদ্ধান্তেই… আমি একরকম খুশিই ছিলাম সিদ্ধান্তটি নিয়ে, পরে চোটের অবস্থা বা সেরে ওঠা কিংবা পুনর্বাসন যেমনই হোক। পরে সত্যি বলতে, প্রত্যাশার চেয়েও একটু দ্রুত সেরে উঠি। ধারণা করেছিলাম, আরও কিছু সমস্যা হতে পারে, তবে তা হয়নি।
অবশ্যই পুনবার্সনে ও ফিটনেস নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছি। মাঠে ফিরতে পারা তাই স্বস্তির ছিল। তবে সিদ্ধান্ত যখন নিয়েই ফেলেছিলাম (অবসরের), তখন আর কোনোভাবেই ফিরতাম না।
ব্যথাটা কি এখনও আছে? শারীরিক ব্যথার কথা বলা হচ্ছে না, মনের কোণে কি বেদনা লুকিয়ে আছে যে অ্যাশেজে যাওয়া হলো না!
ওকস: সত্যি বলতে, শারীরিক যন্ত্রণাও কিছুটা আছে এখনও। মাঝেমধ্যেই ব্যথা মাথাচাড়া দেয়, জড়তা আছে এখনও। এটাকে ঠিকঠাক রাখতে জিমে নিয়মিত কাজ করে যেতে হবে আমার।
মানসিক দিক থেকে তো অবশ্যই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা এমন কিছুর ভেতর দিয়ে যাওয়া। মোটেও চাইনি এমন কিছু হোক। তবু হয়ে যায়।
প্রায় ১৮ বছরের পেশাদার ক্রিকেটে এরকম চোট থেকে মুক্ত ছিলাম, ভালোই করেছি মনে হয়! খেলাটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ এসব।
অস্ট্রেলিয়ায় এবার যে ধরনের উইকেট খেলা হলো, নিশ্চয়ই আরও বেশি খারাপ লেগেছে খেলতে না পেরে!
ওকস: হ্যাঁ, কিছুটা। অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছি অনেকবার, কখনও এরকম উইকেট দেখিনি। এবারই যেতে পারলাম না। তবে খেলাটি আসলে কিছুটা বদলে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার উইকেট তো নিশ্চিতভাবেই বদলে গেছে।

ওভাল টেস্টে যখন চোট পেলেন, মাঠে পড়ে যাওয়ার পরই কি বুঝে গিয়েছিলেন, এতটা গুরুতর?
ওকস: হ্যাঁ, তখনই বুঝে গিয়েছিলাম। এত তীব্র ব্যথা জীবনে আর কখনও অনুভব করিনি! বুঝতে পারছিলাম, বিপদে পড়ে গেছি। নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম।
ওই চোটের পর এক হাত স্লিংয়ে ঝুলিয়ে আরেক হাতে ব্যাট ধরে শেষ ইনিংসে যখন ব্যাটিংয়ে নেমে গেলেন, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত কি সেটিই?
ওকস: অবশ্যই, পেছন ফিরে তাকিয়ে গর্বই লাগে। তবে ওই সময় এমন কিছু ভাবনায় ছিল না। তখন শুধু ভেবেছি, কীভাবে দলের কাজে লাগতে পারি, দলকে কীভাবে জেতাতে পারি।
একটি টেস্ট ম্যাচ জিততে, টেস্ট সিরিজ জিততে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়। ওই সিরিজের উত্তেজনা একদম শেষ সময় পর্যন্ত জিইয়ে ছিল, খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা। জিততে পারলে দারুণ হতো। আমার ভেতর কোনো সংশয়ই ছিল না যে এটা আমি অবশ্যই করতে চাই। পেছন ফিরে তাকালেও তৃপ্তি পাই যে, এমন কিছু করেছিলাম। তখন যদি ব্যাটিংয়ে না নামতাম, সেই অনুশোচনা নিয়ে নিজের সঙ্গে টিকতে পারতাম না।
দল অন্তপ্রাণ হিসেবে আপনার পরিচিতি সবসময়ই ছিল। এক হাতে ব্যাট করতে নেমে যাওয়া হয়তো চূড়ান্ত একটা পরিচায়ক, কিন্তু সবসময়ই বলা হতো, আপনার কাছে সবকিছুর আগে দল। সেটা কিভাবে এলো আপনার ভেতর?
ওকস: জানি না… হতে পারে, আমার বেড়ে ওঠা… বাবা, মা যেভাবে ছেলেবেলায় আমাকে গড়ে তুলেছেন, সেই সময়টা থেকেই এসেছে। ক্রীড়াবিদ হিসেবে তো সবসময়ই চাওয়া থাকে নিজের সেরাটা দেওয়ার, সেরা কিছুর চেষ্টা করার, মাঠে সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার, দলের জন্য কোনো কমতি না রাখার। সেটুকু করতে পারা মানে আর যা কিছুই হোক না কেন, নিজের কাজটুকু ভালোভাবে আপনি করেছেন।
সেভাবেই আমি বেড়ে উঠেছি। ভালো মানুষদের সঙ্গে সবসময় খেলেছি, যারা এই মূল্যবোধগুলি আমার ভেতর গেঁথে দিয়েছেন। এজন্য সবসময় তা একই রয়ে গেছে।
আপনার তো আরেকটি নামও আছে! ‘উইজার্ড’ নামও দেওয়া হয়েছিল আপনাকে। সেটার পেছনের গল্প কি?
ওকস: সেই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সময়ের গল্প সেটি। এখন যেমন একটি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ হচ্ছে। মালেয়েশিয়ায় যুব বিশ্বকাপে (২০০৮) খেলার আগে আমরা শ্রীলঙ্কায় সিরিজ খেলছিলাম। তখন নিজেদের ভেতর ডার্ট প্রতিযোগিতা করছিলাম আমরা এবং ছদ্মনাম প্রয়োজন ছিল। আমার নাম ছিল ‘উইজার্ড।’
ওই দলের ছেলেরা সেটিকেই ধরে রাখে এবং আমার নাম দিয়ে দেয় ‘উইজার্ড।’ পরে যত দলে খেলেছি, এক দল থেকে আরেক দলে সেই নাম বয়ে এনেছে সেই ছেলেরা এবং নামটি রয়ে গেছে।
পেশাদার ফুটবলও তো খেলার চেষ্টা করেছিলেন আপনি!
ওকস: হ্যাঁ, ছেলেবেলায় তো খেলেছি। বেড়ে ওঠার সময়টায় ফুটবল সবসময়ই ছিল আমার প্যাশনের জায়গা এবং সত্যি বলতে, এখনও আছে। এখনও অ্যাস্টন ভিলাকে ভালোবাসি প্রবলভাবে।
কালকে ভিলা একটুও ভালো করেনি, খুব বাজে ফলাফল (এভারটনের কাছে হার)।
আপনার ক্যারিয়ারে ফিরে তাকালে, ইংল্যান্ডের ২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের পথে আপনার পারফরম্যান্স দারুণ ছিল। লর্ডসে আপনার রেকর্ড দুর্দান্ত। আরও স্মরণীয় কিছু পারফরম্যান্স আছে। আপনি নিজে কোনটিকে এগিয়ে রাখেন?
ওকস: ২০১৯ বিশ্বকাপকে আমি মনে করি ক্যারিয়ার-নির্ধারক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে সবসময়ই চাওয়া থাকে বড় ম্যাচ খেলা, বড় মুহূর্তগুলোয় ভালো করা ও দেশকে জেতানো। দেশের মাঠে বিশ্বকাপ জয় মানে এর চেয়ে স্পেশাল কিছু আর হয় না।
মইনও (সিলেট দলের সতীর্থ) ছিল সেই দলে এবং এমন একদল ক্রিকেটার ছিল, আমরা যারা ২০১৫ সালের পর থেকে একসঙ্গে খেলছিলাম। লম্বা সময় ধরে ২০১৯ বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের গড়ে তুলেছি আমরা। ওই দল ও অনেক ক্রিকেটারের জন্যই সেটি ছিল ক্যারিয়ার-নির্ধারক।

অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডে অ্যাশেজও তো অনেক বড় ব্যাপার। অ্যাশেজেও আপনার স্মরণীয় পারফরম্যান্স আছে। বিশ্বকাপ জয় আর অ্যাশেজ জয়ের পার্থক্য কেমন?
ওকস: আলাদা তো বটেই। সাদা বলের ক্রিকেটই লাল বলের ক্রিকেটের চেয়ে আলাদা। দুই সংস্করণের আবেগ-অনুভূতিও আলাদা।
টেস্ট ক্রিকেট আমার ডিএনএতে আছে। ছেলেবেলা থেকেই টেস্ট ক্রিকেট দেখি। টেস্ট ক্রিকেটই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে ক্রিকেটে আসতে। সবসময় টেস্ট ক্রিকেটই দেখতাম।
এখনকার বাস্তবতা অবশ্যই ভিন্ন। এখনকার উঠতি ছেলেরা সাদা বলের ক্রিকেট অনেক বেশি দেখে। তবে আমার বেড়ে ওঠার সময় টেস্ট ক্রিকেটই বেশি দেখতাম। আমার বাবাও খেলাটিকে ঘিরে এভাবেই গড়ে তুলেছেন আমাকে। তিনি টেস্ট ক্রিকেট দেখতেন ও ভালোবাসতেন। ইংল্যান্ডে তাই সাদা বলের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেটের আবেদন ছিল বেশি।
যদিও ট্রফি জয়টাই শেষ পর্যন্ত আসল কথা। তবে টেস্ট ম্যাচে জয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং সাদা পোশাকে দেশের হয়ে মাঠে নামাই ছিল সবসময়ের লক্ষ্য।
টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার কথা বললেন, কিন্তু সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও আপনার রেকর্ড ও অর্জন বেশ ভালো। ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছেন, ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন, সাদা বলের ক্রিকেটে আপনার অর্জন নিয়ে আলোচনা একটু কম হয় বলে মনে হয়?
ওকস: হতে পারে… তবে যেটা বললাম, সাদা বলের ক্যারিয়ারে ফিরে তাকাই আমি, কিন্তু সবসময় টেস্ট ক্রিকেটারই হতে চেয়েছি। সবসময় জানতাম, এটিই সর্বোচ্চ চূড়া। যদিও সীমিত ওভারের স্বাদই আগে পেয়েছি, ২১ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের হয়ে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলেছি। এরপর আরও বেশি খেলতে চেয়েছি। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতেই মুখিয়ে ছিলাম, যে সংস্করণে যতটা সম্ভব।
দেশের হয়ে ১২২ ওয়ানডে ও ৩৩ টি-টোয়েন্টি খেলতে পেরে আমি খুবই সন্তুষ্ট, মূল কারণ, এতটা আশা করিনি। আমার মূল লক্ষ্যই ছিল টেস্ট ক্রিকেটকে ঘিরে। সাদা বলের ক্রিকেটেও ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারাটা বাড়তি ভালো লাগার।
২০১৯ বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালের সেরা বোলার ছিলেন আপনিই, অনেকেরই হয়তো মনে থাকে না!
ওকস: হ্যাঁ, সম্ভবত একটু আড়ালেই পড়ে থাকি… (হাসি)।
কেমন ছিল ওই দিনটি?
ওকস: প্রচণ্ড স্নায়ুর চাপের ম্যাচ ছিল। বিশ্বকাপ ফাইনালে স্নায়ুর চাপ থাকারই কথা। আমাদেরও চাপে থাকারই কথা। পেছন ফিরে তাকালে ভালো লাগে যে ভালো পারফর্ম করতে পেরেছিলাম ও তিনটি উইকেট নিতে পেরেছিলাম।
রান তাড়ায় আমরা জানতাম যে কাজটা সহজ হবে না। উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য খুব ভালো ছিল না। ২৪০ রান তাড়া কঠিনই ছিল। তবে অবশ্যই কেউ ভাবতে পারিনি সুপার ওভারে যাবে বা এত নাটক হবে। পাগলাটে ম্যাচ ছিল।
ইংলিশ ক্রিকেটারদের অনেকেই বলেন, ক্রিকেট দলের সেরা ফুটবলার আপনি!
ওকস: তাই নাকি? তা জানতাম না। তবে এখন আর ভালো ফুটবলার নই। হাঁটু দুটি এখন আর ভালো অবস্থায় নেই। তবে ফুটবল সময়ই ভালোবেসেছি,বেড়ে ওঠার সময় অনেক খেলেছি। ১৪ বছর বয়স নাগাদ ক্রিকেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করলাম। এরপর সেটিকে আঁকড়ে রাখাই আমার কাছে উপযুক্ত মনে হয়েছে। ক্রিকেটই তখন বেশি উপভোগ করছিলাম।
এখন আমি খুবই খুশি যে তখন ক্রিকেট বেছে নিয়েছিলাম। বেশ ভালো একটি ক্যারিয়ার গড়তে পেরেছি। ক্রিকেট থেকে অনেক পেয়েছি, আমারও ক্রিকেটকে অনেক দেওয়ার আছে।
বিশ্বকাপ জয়ের আগের কয়েক বছর আপনারা যেভাবে খেলেছেন, ওয়ানডে ক্রিকেটকেই বদলে দিয়েছেন এবং সেটির প্রভাব টেস্ট ক্রিকেটেও পড়েছে। কেমন ছিল সেই পথচলা?
ওকস: পেছন ফিরে তাকিয়ে, ওই দলের সবাই আমরা ওই পথচলাকেই যত্নে লালন করি। কারণ, ২০১৫ সালে এমন একটা তলানি থেকে আমরা উঠে এসেছিলাম… ওয়ানডেতে মোটেও ভালো ছিলাম না আমরা… ২০১৫ বিশ্বকাপে আমরা তুলাধুনা হই…বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায় নেই।
এরপর ওয়েন মর্গ্যান ও ট্রেভর বেলিস মিলে আমাদের মানসিকতা, ধরন, ঘরানা বদলে দেয়। হ্যাঁ, ওয়ানডে ক্রিকেটকেই কিছুটা বদলে দিয়েছিলাম আমরা। সবসময়ই লক্ষ্য ছিল আরও বেশি কিছুর, ৩০০, ৩৫০, ৪০০… কখনোই না থেমে ছুটে চলা, সবসময় আগ্রাসী হওয়া, বোলারদের চাপে রাখা… এটাই ছিল মন্ত্র। কিছু বাজে পারফরম্যান্সও তখন হয়েছে। তবে সেটি আমাদেরকে বুঝতে সহায়তা করেছে যে, কীভাবে খেলতে চাই।
সেই পথচলায় আমরা সবাইকেই হারিয়েছি। দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল। বিশ্বের সব জায়গায় গিয়ে জিতেছি। বাংলাদেশেও জিতেছি (২০১৬)… সফরকারী দলগুলির জন্য সবচেয়ে কঠিন জায়গাগুলির একটি। ওই দলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল সেটিই… ভারত, অস্ট্রেলিয়া, সব জায়গায় জিতেছি। বিশ্বের এক নম্বর দল হয়েছি। যেখান থেকে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, সেই ভ্রমণটাই দারুণ ছিল।
তলানির কথা বলছিলেন। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে অ্যাডিলেইডে ওই পরাজয়ের ম্যাচে আপনি বেশ ভালো ব্যাট করছিলেন। ইংল্যান্ডের শেষ ভরসা ছিলেন। শেষ দুই ওভারে যখন ১৬ প্রয়োজন, স্টুয়ার্ট ব্রড ও জিমি অ্যান্ডারসনকে কি বলেছিলেন, মনে পড়ে এখন?
ওকস: বেশ ভালোই ব্যাট করছিলাম সেদিন! আমার কেবল মনে আছে, আমরা শুধু উইকেট হারাচ্ছিলাম। ক্রিস জর্ডানের রান আউটের কথা মনে আছে? ক্রিজে ঢুকে গেলেও ব্যাট বাউন্স খেয়ে ওপরে উঠে যাওয়ায় আউট হয়ে গিয়েছিল। এখন তো নিয়ম বদলে গেছে, এই সময়ে হলে আউট হতো না।
দিনটি আসলে আমাদের ছিল না। উইকেট ব্যাটিং সহায়ক ছিল, বাংলাদেশকে ২৭৫ রানে রেখেছিলাম, ম্যাচটি হারা উচিত হয়নি আমাদের। ওই উইকেটে ওই রান তাড়া করার মতোই ছিল।
ব্রডি ও জিমিকে কী বলেছিলাম, এখন আর মনে নেই। তবে মনে আছে, চাচ্ছিলাম যতটা সম্ভব কাছাকাছি যেতে। জানতাম, বেশির ভাগ রান আমাকেই করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হয়নি!
টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দুই পেসার, সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলা দুই পেসারের সঙ্গে খেলেছেন আপনি। জেমস অ্যান্ডারসন ও স্টুয়ার্ট ব্রডের মতো দুজন পেসারের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ওকস: অসাধারণ…। একদম শেষ ভাগটুকু বাদ দিলে আমার পুরো ক্যারিয়ারই তাদের সঙ্গে খেলেছি। সম্ভবত ১০টি টেস্ট খেলেছি, যেখানে এই দুজনের কেউ ছিল না।
তাদের ক্রিকেট বোধ ও জ্ঞানের সংস্পর্শ পাওয়াটা অদ্ভুত ও অসাধারণ। এরকম দুজন পেসার ছিল বলে কখনও কখনও আমার খেলার সুযোগ হয়নি। তবে তাদের কাছ থেকে এত কিছু শিখেছি, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা, বোলিং নিয়ে কথা বলা, তাদেরকে ট্রেনিং করতে দেখা… জিমিকে কাছ থেকে দেখা, তিনি ছিলেন আমার আইডল, যেভাবে তিনি বল সুইং করাতেন…। আমার জন্য ব্যাপারটি ছিল তাদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব শেখা।
জিমি ১৮৮ টেস্ট খেলেছে, ব্রডি ১৬৭টি… পেস বোলার হয়ে এই পরিমাণ টেস্ট খেলা সত্যি বলতে অবিশ্বাস্য।
ইংল্যান্ডের আগের প্রজন্মের ফাস্ট বোলাররা তো এত টেস্ট খেলতে পারেননি। ড্যারেন গফ, অ্যান্ডি ক্যাডিক, অ্যাঙ্গাস ফ্রেজার, ম্যাথু হগার্ড, স্টিভ হার্মিসন, সবারই ক্যারিয়ার শেষ ৫০-৬০ টেস্টে। কিন্তু অ্যান্ডারসন-ব্রডরা কিভাবে পারলেন?
ওকস: ২০১৫ সালের পর জিমি ও ব্রডি সেভাবে সাদা বলের ক্রিকেটে খেলেনি, এটা অবশ্য সহায়তা করেছে তাদের টেস্ট ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতে। দুজনই ছিলেন দারুণ পেশাদার, নিজের শরীরের দেখভাল দারুণভাবে করতেন, জিমে অনেক ঘাম ঝরাতেন।
এখনকার তরুণদের অনেকেই যথেষ্ট বোলিং করে না। যত বেশি বোলিং করবেন, শরীর কিন্তু তত বেশির জন্যই প্রস্তুত হবে, অভ্যস্ত হবে। জিমি ও ব্রডির ক্ষেত্রে যা হয়েছে। তরুণদের অনেকেই এখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট বা টেস্ট ক্রিকেটে যথেষ্ট খেলে না। এজন্য তাদের শরীর ফাস্ট বোলিংয়ের চাহিদার সঙ্গে সেভাবে মানিয়ে নিতে পারে না।

আপনারা কেউই নেই, এই প্রজন্মের ইংলিশ পেসারদের কেমন দেখলেন অ্যাশেজে?
ওকস: অস্ট্রেলিয়ায় ওরা খুব ভালো করেনি। গোটা দলই ভালো করেনি। সবচেয়ে হতাশাজনক ব্যাপার হলো, লড়াই করার মতো দল আমাদের ছিল। খুবই প্রতিভাবান দল। তবে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে সম্ভবত কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ ওরা নিতে পারেনি। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় ওরা জিততে পারেনি। বিশেষ করে, বোলিং আক্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল না বা ওই কন্ডিশন নিয়ে জানাশোনা ছিল না।
বাজবল এবং বাজ (ব্রেন্ডন ম্যাককালাম) টিকে থাকবে বলে মনে হয়?
ওকস: আমার তো সেরকমই মনে হয়। এটা ছুড়ে ফেলা এবং নতুন করে শুরু করা হবে বোকামি, কারণ গত তিন বছরে আমরা এত ভালো কিছু করেছি, দারুণ রোমাঞ্চকর সব টেস্ট ম্যাচ জিতেছি।
লোকে অনেক সময়ই ভুলে যায়, এই সময়টার আগে কী বাজে অবস্থায় ছিলাম আমরা… খুব বাজে দল ছিলাম, জিততে পারছিলাম না (১৭ টেস্টের একটি জিতেছিল ইংল্যান্ড)। হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়ায় বাজে সিরিজ গেছে আমাদের। কিন্তু এটাকে এখন বাতিল করে দেওয়া হবে অবিবেচকের মতো কাজ।
এই সময়ের আলোচিত এক প্রশ্ন, জো রুট কি পারবেন সাচিন টেন্ডুলকারের টেস্ট রান ও সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙতে?
ওকস: সুযোগ তো অবশ্যই আছে। আশা করি পারবে এবং পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। কারণ, জো আমার খুবই কাছের বন্ধু। সে বিশ্বমানের ব্যাটসম্যান এবং সব কন্ডিশনেই পারফর্ম করেছেন।
দীর্ঘস্থায়ীত্ব এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। লোকে যখন চেষ্টার পর চেষ্টা করেই যাচ্ছে আপনার দুর্বলতা বের করে কাজে লাগাতে, সেখানে দিনের পর দিন টানা উন্নতি করে যাওয়া মানে অসাধারণ ব্যাপার। অবশ্যই চাইব সাচিনকে সে পেরিয়ে যাক। আরও অন্তত দুই বছর তো খুব ভালোভাবেই খেলতে পারবে, আরও বেশিও পারে। এমন ফর্ম চলতে থাকলে রেকর্ড না ভাঙার কারণ নেই।
বেশ কজনের অধিনায়কত্বে খেলেছেন আপনি, অ্যালেস্টার কুক, জো রুট, বেন স্টোকস, সীমিত ওভারে ওয়েন মর্গ্যান, জশ বাটলার…। কে কেমন ছিল?
ওকস: বেশ জোর দিয়েই বলতে পারি, টেস্টে যাদের নেতৃত্বে খেলেছি, তাদের মধ্যে বেন স্টোকসই সেরা। সাদা বলের ক্রিকেটে সেরা ওয়েন মর্গ্যান।
ওয়েনের সঙ্গে ভালো কয়েকটি বছর কেটেছে আমার। একটু আগে যে পথচলার কথা বললাম ওয়ানডে ক্রিকেটে, সেখানে তার ভূমিকা ছিল প্রবল। ক্রিকেটার হিসেবে ও অধিনায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় নিতে। তার ট্যাকটিকস, চাপের মধ্যে ধীরস্থির থাকা… দলের সামনে যেভাবে কথা বলত, যেভাবে বার্তা ছড়িয়ে দিত… খুবই স্পষ্ট ও সবসময় গোছানো ছিল। মাঠের ভেতরে ও বাইরে তার সঙ্গ সবসময় উপভোগ করেছি।
টেস্ট নেতৃত্বের দিক থেকে বেন সবসময়ই আগ্রাসী, সবসময় চায় এক ধাপ এগিয়ে থাকতে। আমাকে সবসময় পরীক্ষায় ফেলত যে বোলার হিসেবে নিজের করণীয় জানি কি না বা কী করতে চাই। এমন নয় যে স্রেফ বলটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল যে ‘যা ইচ্ছা করো।’ সে শুনতে চাইত। তবে নিজের কাছে পরিষ্কার ছিল সে দলকে কীভাবে দেখতে চায়। এই দিকগুলো খুব উপভোগ করতাম।
গোটা ক্যারিয়ারে যাদেরকে বোলিং করেছেন, সেরা ব্যাটসম্যান কে?
ওকস: টেস্ট ক্রিকেটে সেরা ব্যাটসম্যান অবশ্যই স্টিভেন স্মিথ।
মূল কারণ, তাকে আউট করা খুব কঠিন। খুবই ব্যতিক্রমী ব্যাটসম্যান। আমার মতো যারা আউট সুইং বোলার, সে যেভাবে ব্যাট করে, আমার সেরা ডেলিভারিটি হয় তার ব্যাটের পাশ দিয়ে চলে যাবে অথবা ব্যাটের কানায় স্পর্শ করলেও তার পেছনের পায়ে লেগে পড়ে যাবে। আমার সেরা ডেলিভারিই সেটি, আউট করব কীভাবে! তাকে আউট করার একমাত্র পথ মনে হতো এলবিডব্লিউ করা। ।
গ্রেট ব্যাটসম্যান তো ছিলই আরও। ভিরাট কোহলি একজন, কেন উইলিয়ামসন… তবে টেস্টে স্মিথই সেরা।
সাদা বলের ক্রিকেটে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় ধরিয়েছে এবি ডি ভিলিয়ার্স। সে যা করতে পারত, অবিশ্বাস্য! চোখের পলকে ম্যাচ বের করে নিতে পারত।
একজন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় বা পেশাদার ক্রীড়াবিদের জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর ব্যাপার হলো, কেউ যখন তাকে নগণ্য করে তোলে। এবি ডি ভিলিয়ার্স সেটা করতে পারত।
ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় চলে এসেছেন। এই প্রজন্মের ইংলিশ পেসারদের নিয়ে কাজ করতে চাইবেন সামনে?
ওকস: অবশ্যই, খুবই ভালো লাগবে আমার। তবে এখনও বছর দুয়েক খেলতে চাই, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে ও কাউন্টিতে। ভবিষ্যৎ নিয়েও রোমাঞ্চের অনেক কিছু আছে সামনে।