Published : 07 Jan 2026, 07:51 PM
“সেই কবেকার ভায়োলিন, বেজে যায় কতদিন…”, সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের ২২ গজে যেন শিরোনামহীনের গানটিরই ঝংকার তুললেন নাসির হোসেন। ভায়োলিনের বদলে তার হাতে ব্যাট। কিন্তু একইরকম সুরেলা। সেই সুরে যেমন মিশে থাকল উচ্ছ্বাস আর আনন্দ, তেমনি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল হাহাকারের ভৈরবীও। নাসির ছড়িয়ে দিলেন নস্টালজিয়া।
ক্রিকেটে কিছু কিছু দিন আসে দারুণ স্বপ্নময়। সবকিছুই সেদিন মনের মতো হয়। তবে তেমন একটি দিন বয়ে আনতে হলেও নিজেকে একটা পর্যায়ে ধরে রাখতে হয়। নাসির সেসব দিন অনেক পেছনে ফেলে এসেছেন বলেই মনে হচ্ছিল। হ্যাঁ, এবারের জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টিতে তিনি ভালো করেছেন বটে। তবে বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে পার্থক্য গড়ে দেবেন, সেই নাসির তো কেবল স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে বেড়ানোর ব্যাপার।
নাসির দেখালেন, শুধু অতীতের রোমন্থন নয়, নতুন রোমাঞ্চের জন্মও দিতে পারে তার ব্যাট!
ঢাকা ক্যাপিটালসের হয়ে ৫০ বলে ৯০ রানের অপরাজিত ইনিংস। দলের জয়ে ৬৭ শতাংশের বেশি রান তার একার ব্যাটে। ১৪ চার ও ২টি ছক্কা স্রেফ একেকটি বাউন্ডারি নয়, তার সামর্থ্যের নতুন জয়গানও।
হ্যাঁ, প্রতিপক্ষের বোলিং লাইন আপ খুব ক্ষুরধার নয়। তবে নাসির নিজেও তো তার ক্যারিয়ারের চূড়ায় নন! জাতীয় দল বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে এখন তিনি যোজন যোজন দূরে। নোয়াখালীর বোলিং আক্রমণে হাসান মাহমুদ, মোহাম্মাদ নাবি, জাহির খানরা আছেন, একদম দুর্বলও নয়। সিলেট স্টেডিয়ামের সবুজ প্রান্তরে যেন সেরা সময়ের তাজা হাওয়া ছড়িয়ে দিলেন এই ৩৪ বছর বয়সী নাসির।
১৫৬ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে তার আগের সেরা ছিল ৮০ রান। সেই ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বিপিএলেই রংপুর রাইডার্সের হয়ে ইনিংসটি খেলেছিলেন তিনি। এরপর এত বছর পেরিয়ে, এতটা পথ পাড়ি দিয়ে নিজেকে গেলেন তিনি ছাড়িয়ে।
২১ বলে করেছেন এ দিন ফিফটি। তেটা দ্রুততায় পঞ্চাশে পৌঁছতে পারেননি আগে কখনোই। এবারের বিপিএলেও এখনও পর্যন্ত দ্রুততম ফিফটির কীর্তি এটি।
এমন ঝড়ো শুরুর পর অনেক সময়ই ব্যাটসম্যানরা থমকে যান অতি রোমাঞ্চে পেছনে ছুটে। কিন্তু নাসিরের দিনটি তো ছিল জাদুকরি। দলকে জয়কে সঙ্গী করেই মাঠ ছাড়েন তিনি হাসি মুখে মাথা উঁচু করে।
বিপিএলের আগে গত সেপ্টেম্ব-অক্টোবরে জাতীয় লিগে খুব একটা খারাপ করেননি তিনি। আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী ধারা ভঙ্গের দায়ে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে মাঠে ফেরার অনুমতি পান তিনি গত এপ্রিলে। আড়াই বছর পর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ফিরে শুরুতে তিনি ভুগেছেন। পরে ব্যাট-বলের পারফরম্যান্স মিলিয়ে তিনটি ম্যাচে ম্যান অব দা ম্যাচ হন, এর মধ্যে ছিল ফাইনালও। তব সেই আসরে ঠিক উত্তাল ছিল না তার ব্যাট। স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৫.৭৮।
বিপিএলেও প্রথম তিন ইনিংস মিলিয়ে তার রান ছিল ৪১। স্ট্রাইক রেট একশর নিচে।
টুর্নামেন্টের মান যেমনই হোক, নাসির ২৩৮ স্ট্রাইক রেটে ফিফটি করতে পারেন, ব্যাট হাতে একাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন, অনেকেই এসব ভুলে গিয়েছিলেন। নাসির দেখালেন, এখনই সবটুকু মরচে পড়েনি তার ব্যাটিংয়ে।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই নাসির হাসতে হাসতে বললেন, “আগে তো কেউ সুযোগ দেয় নাই তিন নাম্বারে…!”
জাতীয় লিগে ইনিংস ওপেন করে ও তিন নম্বরে নেমেই কিছুটা সফল হয়েছিলেন তিনি। বিপিএলে আগের ম্যাচগুলোয় সেই সুযোগ পাননি। এই ম্যাচে ঢাকা ক্যাপিটালস বাইরে রাখে জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক সাইফ হাসানকে, ফর্মটা যার ভালো যাচ্ছে না খুব একটা। প্রথম সুযোগেই নাসির প্রমাণ করলেন, তিন নম্বরের জন্য তাকে বিবেচনা করাই যায়।
“ভালো লাগছে। কারণ আপনি যেখানেই পারফর্ম করেন না কেন, ভালো করলে ভালোলাগেই। টি-টোয়েন্টিতে আমার খুব ভালো লাগে ওপরে ব্যাটিং করতে। কারণ, ওই সময়টা একটু রান করা সহজ, পাওয়ার প্লের মধ্যে ৯টা ফিল্ডার (বৃত্তের)। তখন একটু ঝুঁকি নিলে যতটা সহজে রান করা যায়, পরে আর ততটা করা যায় না।”
“আমি সবসময় উপভোগ করি পাওয়ার প্লের মধ্যে ব্যাটিং করতে। আজকেও চেষ্টা করছি পাওয়ার প্লের মধ্যে যত বেশি সম্ভব রান করতে।”
সেটা তিনি পেরেছেন দারুণভাবেই। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে রাহমানউল্লাহ গুরবাজের বিদায়ের পর ক্রিজে যান তিনি। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে সেই ধাক্কা দলকে বুঝতেই দেননি। পাওয়ার প্লের ভেতরই ৫৬ রান করে ফেলেন। সেখানে ৫০ রানই আসে বাউন্ডারিতে, ১১ চার ও ১ ছক্কা!
এরপর পর অবশ্য ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝেই নিজের ইনিংস এগিয়ে নেন তিনি। ১৩৪ রান তাড়ায় অপরাজিত থাকেন ৯০ রানে।
প্রতিপক্ষ আর কিছু রান করলে হয়তো টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির স্বাদও পেতে পারতেন। তবে সেটা নিয়ে তার আক্ষেপ নেই।
“আমাদের দলের যে অবস্থা ছিল… আমরা পরপর দুই-তিনটা ম্যাচ হেরেছি। এই জয়টা দরকার ছিল, লক্ষ্য কম থাকাই ভালো। দল হিসেবে আমাদের জয়টা খুবই জরুরি ছিল মোমেন্টাম পাওয়ার জন্য।”
চলতি মৌসুমে জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টি ও জাতীয় লিগের বড় দৈর্ঘ্যের টুর্নামেন্টে রংপুরের শিরোপা জয়ে নাসিরের অবদান ছিল যথেষ্টই। এবার বিপিএলেও দারুণ ইনিংস খেললেন। নিষেধাজ্ঞার সময়টায় তার ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সেটিকেই পুনরুজ্জীবিত করে তিনি স্বপ্ন দেখছেন ক্যারিয়ার আরও অনেক লম্বা করার।
“যদি সুস্থ থাকি এখনও হয়তো পাঁচ-ছয় বছর খেলতে পারব। আমি বলব যে, সবসময় ভালো খেলার চেষ্টা করি এবং আমার যেটা জ্ঞান আছে, বুদ্ধি আছে, সেভাবে খেলার চেষ্টা করি এবং উইকেট পড়ে বোলিং করার চেষ্টা করি, উইকেট বুঝে ব্যাটিং করার চেষ্টা করি।”