Published : 21 Apr 2026, 03:56 PM
জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘অবস্থানের’ অভিযোগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৬৮ জন শিক্ষককে পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
পটপরিবর্তনের পর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ‘নিষিদ্ধ’ হওয়া শিক্ষকদের অনেকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলায় ‘উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ। আবার কোনো কোনো শিক্ষক ২০২৪ সালের ৩ অগাস্ট ‘নীল দল’ এর মিছিলে অংশগ্রহণ করায় শিক্ষার্থীদের ‘বয়কটের’ শিকার হয়েছেন।
এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তবে দীর্ঘ ২০ মাস পেরোলেও তদন্ত শেষ হয়নি; অভিযোগ নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগও নেই।
অভিযোগ ওঠা শিক্ষকদের অনেকেই বলছেন, গত দেড় বছরে কারো বিচার হয়নি। মূলত ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ জেরে তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না।
জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় মাস বাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পান উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ। দায়িত্ব নিয়ে তিনি ‘জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া শিক্ষক-কর্মকর্তা শনাক্ত কমিটি’ গঠন করেন; তবে এরপর আর সেই কাজে গতি আনতে পারেনি।
এ বিষয়ে জানতে তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তা শনাক্ত করতে গঠিত কমিটির প্রধান কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান গত অগাস্টে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “এ কমিটির কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা অনেকের কাছে তথ্য চেয়েছিলাম, তেমন সাড়া পাইনি।
“আমরা এখন বিভাগের চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি ‘সাদা দল’কে চিঠি দেব, তারা যেন তথ্য প্রমাণসহ আমাদের কাছে তথ্য পাঠায়।”
বর্তমানে কোনো অগ্রগতি আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সোমবার অধ্যাপক ছিদ্দিকুর বলেন, “এ কমিটির তো কোনো কাজ হয়নি। কারণ সাবেক উপাচার্য (নিয়াজ আহমদ খান) এসব বিষয়ে দায়িত্ব নিতে চাইতেন না। আমি এ কমিটি বাদে আরও কয়েকটি কমিটিতে ছিলাম।
“অন্তত তিন-চারটার প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেগুলোর একটারও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এখন এ কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। আমি যতটুকু জানি, পরবর্তী সিন্ডিকেট মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা হবে।”
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১২৮ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
যে কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট এ সিদ্ধান্ত দেয়, সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলাসংক্রান্ত তথ্যানুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক কাজী মাহফুজুল হক সুপন এক দল শিক্ষকের বিরুদ্ধে হামলায় উস্কানি দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
গত বছরের ১৭ মার্চ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলা হয়েছে।
“ওই সময় থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত হামলাকারীদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা গেছে। আর অন্তত ৭০ জন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে হামলাকে উসকে দিয়েছেন।”
শিক্ষকদের উসকানি দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক সুপন রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের ১৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত সহিংসতার বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছিল। আমরা সেটার তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।
“কিন্তু সেসময় আমাদের কাছে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল। আমরা তা জানিয়েছি। তবে আমাদেরকে শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্ত করতে বলা হয়নি।”
তদন্ত কতদূর?
‘আওয়ামীপন্থি’ আখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষককে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে, তাদের বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি। তবে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর মধ্যে আইন বিভাগের চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের তোলা অভিযোগ যাচাই করতে একটি তদন্ত কমিটি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চার শিক্ষকের (সাদেকা হালিম, জিনাত হুদা, আ ক ম জামাল উদ্দিন ও মশিউর রহমান) বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি এবং মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়।
এর মধ্যে কয়েকটি কমিটির প্রতিবেদন অনেক আগে জমা দেওয়া হয় বলে ভাষ্য কমিটি সংশ্লিষ্টদের।
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের দুই শিক্ষকের এবং মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে করা দুই তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক মাহফুজুল হক সুপন বলেন, “আমি দুইটা তদন্ত কমিটিতে ছিলাম। আমি সেগুলোর প্রতিবেদন জাম দিয়েছি অনেক আগেই।”
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর অভিযোগ গঠন করা হয় গত বছরের নভেম্বরে।
এতদিনেও সব কমিটির তদন্ত শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের অধিকাংশ তদন্ত কমিটির সদস্যরা হচ্ছেন শিক্ষক। উনাদের ক্লাস-পরীক্ষা আছে।
“এর মধ্যে উনারা যতটুকু করতে পারছেন, সেটা করছে। আমরাও কোনো হস্তক্ষেপ করছি না, যাতে তদন্তে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ না আসে।”
দীর্ঘ সময় পেরোলেও একদিকে যেমন বিচার সম্পন্ন হয়নি, তেমনই অভিযোগ ওঠা শিক্ষকরা ক্লাসেও ফিরতে পারেনি।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, “আমরা প্রথম দিকে যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, সব কিছু স্থবির ছিল। চারিদিকে বিশৃঙ্খল অবস্থা। সেখান থেকে আমরা একটা একটা শেষ করে, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।
“সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি প্রতিবেদন দিয়েছে। আর কয়েকটি এখনো কাজ করছে। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর চার্জশিট গঠন করাও হয়েছে।
“আমরা যদি তাড়াহুড়ো করে প্রতিবেদন দিয়ে দিতে বলি, সেটা আদালতে গিয়ে অনেক সময় না টিকতে পারে। তাই আমরা—যারা তদন্ত কমিটিতে আছেন, তাদেরকে কোনো প্রকার প্রেসার দিচ্ছি না যাতে তারা একটা প্রতিবেদন যথাযথভাবে তৈরি করতে পারে।”

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, “আমাদের সর্বশেষ সিন্ডিকেট মিটিং হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে। এর আগে যে প্রতিবেদনগুলো এসেছে, সেগুলো একটা খামে করে আসে এবং উপাচার্য মহোদয় সেটা ওপেন করে সিন্ডিকেটে আলোচনা হয়।
“সেক্ষেত্রে এখানে কাউকে বাঁচিয়ে বা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আর আমাদের একটা সিন্ডিকেটে তো সব একসাথে নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া সম্ভব না। একটা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আসার আগে বিভাগ, ডিন, একাডেমিক কাউন্সিল হয়ে সিন্ডিকেটে আসে। সেখানে সময়ের একটা ব্যাপার তো আছেই।”
জানতে চাইলে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “আমি নতুন এসে যোগদান করেছি। এখন আমার পূর্ববর্তী উপাচার্য যেখানে রেখে গেছেন, সেখান থেকে আমি দেখব।”
পাঠদানে বিরত শিক্ষকরা কী বলছেন
‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ ও ‘মবের’ ভয়ে ক্লাসে আসতে না পারার কথা বলেছেন পাঠদান থেকে অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষকরা।
তাদের অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
বেশিরভাগই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি। মোটাদাগে তাদের ভাষ্য, কোনো অপরাধ করে থাকলে তার বিচার হোক। রাজনৈতিক কোনো দলকে সমর্থন করা তো অপরাধ হতে পারে না।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাহান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি নীল দল করার কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে বয়কট করেছে। সেখানে আমাদের শিক্ষকরাও জড়িত ছিল। এরপর আমাকে নিয়ে বিভাগে একটা তদন্ত কমিটি করেছে। সেখানে আমার কোনো অপরাধ পায়নি।
“তার পরও আমি আগে যে কোর্সগুলো পড়াতাম, তা এখন আমাকে নিতে দিচ্ছে না। আমাকে বিভাগ থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। এখন আমি যদি অপরাধ করে থাকি, তাহলে আমার বিচার হোক। কিন্তু এভাবে শিক্ষককে ক্লাস নিতে না দেওয়া তো অসম্মানের।”
শিক্ষকের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “মাঝখানে তো বের হলেই একরকম মবের শিকার হওয়ার পরিস্থিতি ছিল। আমাদের বিভাগের আরেক শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের মুচলেকা দিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে।
“আমি তো সে কাজ কখনও করব না। আমি শিক্ষক হিসেবে আমার যথাযথ সম্মান চাই।”
পাঠদান থেকে ছিটকে পড়া আইন বিভাগের প্রভাষক শাহরিমা তানজিম অর্নি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সময় তো খুব বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ছিল। এরপর তো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্লাস হয়নি। তারপর যখন ক্লাস শুরু হল সেসময় যখন গেলাম, আমি শুনেছি আমি শিক্ষার্থী থাকাকালে ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় আমাকে কয়েকটা ব্যাচ বয়কট করেছে।
“এরপর তো আর ক্লাসে যাওয়া হয়নি। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যখন বিভাগের এসি মিটিংয়ে গেলাম; সেখানে ১৫-২০ জন শিক্ষার্থী—যারা প্রথম বর্ষের আমার ক্লাস পায়নি, সরাসরি শিক্ষার্থীও না, তারা এসে মব করেছে।

প্রভাষক অর্নি বলতে থাকেন, “এরপর আমরা যখন সেখান থেকে চলে আসি, আমাদেরকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়ে চিঠি পাঠায়। কিন্তু কেন অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সেটা একবারও স্পষ্ট করেনি।
“এরপর শুনলাম আমাদের নামে তদন্ত কমিটি হয়েছে; সেটা আজ প্রায় দেড় বছর হয়ে যাচ্ছে, আমাদের সাথে একবারও বসেনি।”
কোনো অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি হওয়া দরকার মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাদের যদি অপরাধ থাকে, বিচার হোক। কিন্তু আমরা বিভাগকে জানিয়েছি যে- এখন তো নতুন ব্যাচ এসেছে, আমরা ক্লাসে ফিরব কি না।
“এখনো আমাদেরকে তদন্ত কমিটির নাম দিয়ে এভাবে রেখে দেওয়া হয়েছে।”
‘রাজনীতি করছে দুই পক্ষই’
অভিযোগ ওঠা শিক্ষকরা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা—উভয় পক্ষই বিচার প্রশ্নে ‘রাজনীতি’ করছেন বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য অধ্যাপক সামিনা লুৎফা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এ শিক্ষক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। তাই কোনো শিক্ষক যদি অপরাধ করে থাকেন, সেটা তদন্ত বা সত্যানুসন্ধানের মধ্যদিয়ে তাদের বিচার হওয়া দরকার ছিল।
“সেক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর অনেক সময় পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে তাদের বিচার কার্য সম্পন্ন করতে না পারা এটা এক ধরনের ব্যর্থতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের উচিত ছিল যথাযথ বিচারের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে একটা লিগ্যাসি তৈরি করে দেওয়া উচিত ছিল।”
অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, “যারা ৫ অগাস্টের আগে শিক্ষার্থীদের হামলার সাথে জড়িত ছিল, তাদেরকে পাঠদান থেকে সরিয়ে একটা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা না করে আগে এটাকে দীর্ঘায়িত করা—এটাও তো রাজনীতি।
“যারা ক্লাসে ফিরতে পারছেন না, তারা রাজনীতি করছেন। আর এখন যারা বিচার না করে দীর্ঘায়িত করছেন, তারাও রাজনীতি করছেন।”
শিক্ষকদের পাঠদান থেকে বিরত রাখার মধ্য দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিশ্বাসের জায়গায় একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সামিনা লুৎফা বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিশ্বাসের জায়গা ছিল ৫ অগাস্টের পর, সেটা তদন্ত ও বিচার ঠিকভাবে না হওয়ায় সে বিশ্বাস ভেঙে গেছে। যার কারণে আমরা দেখেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ডিনদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করছেন।
“আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আওয়ামীপন্থি শিক্ষককে ডাকসুর সদস্যরা হেনস্তা করছেন; আমরা তার প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমরা নিজেরাও বারবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি যেন বিচার কাজ শেষ করে; তারা সেটা করেনি।”
এক সেমিস্টার পিছিয়েছে কয়েকটি বিভাগ
সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে যারা ভর্তি হয়েছিলেন, তাদের এখন ষষ্ঠ সেমিস্টারে পড়ার কথা। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—শিক্ষার্থীরা এখনো পঞ্চম সেমিস্টার শেষ করতে পারেনি।
ওই শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, “ছয়জন শিক্ষক দিয়ে ১২০০ জনের ক্লাস নেওয়া খুবই কঠিন। শিক্ষকের ঘাটতি তো আছেই।
“সাথে জুলাই অভ্যুত্থানের দুই মাস পর আমরা ক্লাস শুরু করেছিলাম, তারও একটা প্রভাব পড়েছে।”
একই শিক্ষাবর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে পড়েছেন।
বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিদ বলেন, “আমাদের ব্যাচমেইটরা (অন্য বিভাগে) এখন ষষ্ঠ সেমিস্টারে। আর আমরা এখনো পঞ্চম সেমিস্টার ফাইনাল দিচ্ছি।”
‘অপচয় হচ্ছে অর্থের’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধের নির্দেশনা দেয়নি প্রশাসন। অর্ধশতাধিক শিক্ষক পাঠদানে আসতে না পারলেও তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন।
তাতে প্রতিমাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ লাখ টাকার মত ‘অপচয়’ হচ্ছে, তাতে ২০ মাসে প্রায় ১২ কোটি টাকা গেছে। পাশাপাশি অভিযোগ ওঠাদের অনেকেই এখনো পাচ্ছেন আবাসিক সুযোগ-সুবিধা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের এক নেতা বলেন, “কোনো শিক্ষক যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত।
“কিন্তু সেই সকল শিক্ষকরা অপরাধী কি না—যাচাই না করে পাঠদান থেকে বিরত রাখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের অপচয় এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে।”
অভ্যুত্থান কালের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উপাচার্য হিসেবে সবশেষ দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই পদত্যাগ করে গাঢাকা দিয়েছেন। এরপর তিনি আর অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপও নেয়নি পরবর্তী প্রশাসন।
তবে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে মামলা রয়েছে; তার বিরুদ্ধে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সাক্ষ্য দিয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম।
‘অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম’ থেকে বিরত থাকলেও অধ্যাপক হিসেবে মাকসুদ কামাল বেতন-ভাতা ঠিকই পাচ্ছেন জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব পরিচালক দপ্তর।
সাবেক উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ বর্তমানে অবসরে চলে গেছেন। তাকে নিয়েও কোনো তদন্ত কমিটি হয়নি।
আর সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদও অবসরে যাওয়ায় কোনো জটিলতার শিকার হননি।
অন্যদিকে সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) সীতেশ চন্দ্র বাছারকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

পাঠদান থেকে বিরত রাখা হয়েছে যাদের
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি চার শিক্ষক। তারা হলেন- অধ্যাপক রহমত উল্লাহ, অধ্যাপক জামিলা আহমেদ চৌধুরী, প্রভাষক শাহরিমা তানজিম অর্নি ও আজহার উদ্দিন ভূঁইয়া।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে পাঠদানে বিরত রয়েছেন—রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নিলুফার পারভীন, অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদা, অধ্যাপক সাদেকা হালিম, অধ্যাপক আকম জামাল উদ্দিন ও অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান, টেলিভিশন, চলচিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া, শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক মারিয়া হোসাইন; নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাহান, অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এ বি এম নাজমুস সাকিব ও সুমাইয়া ইকবাল।
কলা অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন—ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এ এম আমজাদ, অধ্যাপক আকসাদুল ইসলাম, সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সঞ্চিতা গুহ, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক নীলিমা আকতার, পালি ও বুদ্ধিস্ট স্টাডিজের শিক্ষক রাকিবুল ইসলাম, আরবি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ, অধ্যাপক আব্দুল কাদির, সহযোগী অধ্যাপক মু নাসীর উদ্দিন, সহযোগী অধ্যাপক বেলাল হোসাইন, দর্শন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রেবেকা সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক মন্দিরা চৌধুরী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ, অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক কাজী ফারজানা আফরীন, সহকারী অধ্যাপক ইসমাইল হক সরকার টিটু, সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম সানা, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর দে ও উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদুল ইসলাম।
ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন—ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক শবনম জাহান, অ্যাকাউন্টিং ও ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, অধ্যাপক মুশফিকুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক রুমানা আহমেদ ও জামীল শরীফ, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম (বর্তমানে কারাগারে), অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক আফজাল হোসেন ও সহযোগী অধ্যাপক সামশাদ নওরীন।
বিজ্ঞান অনুষদ শিক্ষকদের মধ্যে যারা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে অব্যাহতি পেয়েছেন, তারা হলেন—গণিত বিভাগের অধ্যাপক চন্দ্র নাথ পোদ্দার, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কায়সার আহমেদ রকি ও কামরুজ্জামান।
জীববিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে পাঠদানে বিরত রাখা হয়েছে—মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুর রহমান ও সংকর চন্দ্র মন্ডল, মনোবিজ্ঞান বিভাগের কামাল উদ্দিন, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমল হোসেন ভূঁইয়া এবং অণুজীব বিজ্ঞানের অধ্যাপক সাবিতা রিজওয়ানা রহমানকে।
ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে পাঠদানে বিরত রয়েছেন—ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক আফরোজা শেলী।
চারুকলা অনুষদের শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন—গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক সিদ্ধার্থ দে, অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র গাইন, মৃৎশিল্প বিভাগের অধ্যাপক রবিউল ইসলাম, ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক নাসিমুল কবির ও কারুশিল্প বিভাগের জাহাঙ্গীর হোসেন।
আর্থ ও এনভায়রমেন্ট সায়েন্সেস অনুষদের যেসব শিক্ষক পাঠদানে ফিরতে পারছেন না, তাদের মধ্যে আছেন ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। আর ফার্মেসি অনুষদের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছারকে পাঠদানে বিরত থাকতে হচ্ছে।
বিভিন্ন ইনস্টিটিউট থেকে যারা ক্লাসে ফিরতে পারছেন না, তাদের মধ্যে রয়েছেন—শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামান, অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, স্বাস্থ্য ও ইনস্টিটিউটের মুহাম্মদ ইহসান উল কবির, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য, পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আবু তোরাব এম এ রহিম।