০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

উচ্চশিক্ষায় ফাঁকা থাকবে প্রায় ৮ লাখ আসন

“আসন ফাঁকা থাকা কোনো সমস্যা না, কেননা উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়,” বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

আরফাতুল ইসলাম নাইম আরফাতুল ইসলাম নাইম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Nov 2026, 11:36 PM

Updated : 02 Nov 2026, 11:36 PM

উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় এবার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এক্ষেত্রে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী পেলেও ভুগতে হবে নতুন বা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

বর্তমানে দেশে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১১৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় আসন রয়েছে ১৪ লাখ ৯২ হাজারের মতো।

এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১০ লাখ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চার লাখের মতো আসন রয়েছে।

এবার এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন, অর্থাৎ ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।

সেই হিসাবে, পাস করা শিক্ষার্থীদের সবাই উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও প্রায় সাড়ে আট লাখ আসন ফাঁকা থাকবে।

অবশ্য পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবার বাড়বে। কারণ এক বা দুই বিষয়ে যারা পাস করতে পারেননি, তারা নতুন করে পরীক্ষায় বসে পাস করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ মনে করেন, “বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ ও খাতা পুনর্মূল্যায়নের ফলে আরও অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবে বলে আমি আশা রাখি। এসব প্রক্রিয়া শেষে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।”

নতুন করে পাস করা শিক্ষার্থীরা সব ক্যাম্পাসে ভর্তির সুযোগ পাবে?

এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কবে নাগাদ হবে এবং সেটার ফল প্রকাশে কতদিন লাগতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এ নিয়ে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমাদেরকে মাননীয় মন্ত্রী ডিসেম্বরের ২ তারিখ থেকে ৩১ তারিখের মধ্যে পরীক্ষা নিয়ে ফল ঘোষণা করতে বলেছেন। আশা করি, এসময়ের মধ্যে হয়ে যাবে।"

তবে ডিসেম্বরের মধ্যে ফল প্রকাশ হলেও নতুন করে পাস করা শিক্ষার্থীরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে পরীক্ষার সম্ভাব্য সূচি প্রকাশ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১১ ডিসেম্বর থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। বুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়ার কথা জানুয়ারিতে।

এছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা ৪ ডিসেম্বর আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।

এ কারণে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করলেও শিক্ষার্থীরা বেশ কিছু ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভর্তি উপ-কমিটি আমরা ২ তারিখে বসব। আমরা বসে প্রাথমিকভাবে একটা আলোচনা করব, কত ক্রাইটেরিয়া সেটআপ করা যায় এবং যারা দুই সাবজেক্টে ফেল করছে, তাদের যে সুযোগটা দেওয়া হবে…দুয়েক বিষয়ে ফেল করার সংখ্যা কী পরিমাণ, একটা ডেটা আমাদেরকে সংগ্রহ করতে হবে। ওদের তো পিছিয়ে রাখা যাবে না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা আরও দেখব। ভর্তি কমিটি এ বিষয়ে মিটিং করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই।”

এ বিষয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান বলেন, “নতুন করে পাস করা শিক্ষার্থীদের কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, শিক্ষামন্ত্রী ও সচিব তা নিয়ে ভাবছেন। কোনো সিদ্ধান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিব।"

ভর্তির যোগ্যতায় শিথিলতা আসবে?

এবার এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় যে হারে জিপিএ ৫, জিপিএ ৪ ও জিপিএ ৩ এর বেশি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।

পাস করা ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। জিপিএ ৪ এর বেশি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ৮২ হাজার ৭২০।

জিপিএ ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ পাওয়া শিক্ষার্থী আছেন এক লাখ ৩৮ হাজার ৮২৬ জন। এছাড়া জিপিএ ৩ থেকে সাড়ে ৩ দশমিক ৫০ এর মধ্যে আছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৭১জন। আর জিপিএ ৩ এর নিচে পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী।

৩ এর নিচে জিপিএ পাওয়া এসব শিক্ষার্থী দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তির আবেদনের সুযোগ পাবে কিনা। এর প্রভাবেও এবার ভর্তির প্রতিযোগিতা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতায় শিথিলতা আসতে পারে কি না, শনিবার ফল প্রকাশের দিন সেই প্রশ্ন করা হয়েছিল শিক্ষামন্ত্রী আহছানুল হক মিলনকে।

জবাবে তিনি বলেন, “কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কতটুকু ‘কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ’ করে শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে, এটা তো তাদের নিজস্ব বিষয়, তারা সেভাবে চিন্তাভাবনা করবে। তবে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সবাই পাবেন।”

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আসন ফাঁকা থাকলেও ভর্তির যোগ্যতায় শিথিলতা আনা ঠিক হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনই যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষার্থী বের করতে পারছে না। সেখানে যদি আমরা আরও ঘাটতি থাকা শিক্ষার্থীদের শর্ত শিথিল করে ভর্তি করি, আমাদের শিক্ষার মান খারাপ হবে। আমরা শুধু সার্টিফিকেটধারী বেকার তৈরি করব।

“আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যারা খারাপ করেছে, তাদের পেছনে ইনভেস্ট করাটা বেকার তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের আরেক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, “আমি ফল দেখে শঙ্কিত। কারণ একটি শিক্ষার্থী ১২ বছর পড়াশোনা করে, আবার টেস্ট পরীক্ষা দেয়। এরপর যখন ১২ লাখের অর্ধেক শিক্ষার্থী ফেইল করে, সেটা দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাটা কী। এখন এ সমস্যা সমাধানে সরকার কী করে, তা দেখার বিষয়।

“আর উচ্চশিক্ষায় আসন ফাঁকা থাকলে সেটা কোনো সমস্যা না। কেননা উচ্চশিক্ষা সবার জন্য না। অলি-গলিতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে বা এমপিরা তার নির্বাচনি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষাকে খুব কমন কিছু করে ফেলেছে। এতে আমরা বেকার বাড়াচ্ছি। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ধারণ ক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করায় শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে। সেটা থেকে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছুটা উন্নতি হবে। আর তাদেরকে বিশেষ সুযোগ দিয়ে ভর্তি করালে আরও বড় বিপর্যয় হবে।”

আরও পড়ুন

পুরনো খবর:

এইচএসসির ফলে ধস, প্রশ্নের মুখে শিখন ও মূল্যায়ন
এইচএসসিতে এক বা দুই বিষয়ে ফেল: পুনঃপরীক্ষার আবেদন কবে সিদ্ধান্ত বুধবারের মধ্যে