Published : 06 Jan 2026, 04:10 PM
অপ্রীতিকর ঘটনা ও বড় ধরনের অনিয়ম-গোলযোগ ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী (জকসু) সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ভবনের ৩৯টি কেন্দ্রে ১৭৮টি বুথে ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা একটানা বেলা ৩টা পর্যন্ত চলে।
তীব্র শীতের মধ্যেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ভোট দেন শিক্ষার্থীরা। শুরুতে কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভালো উপস্থিতি দেখা গেলেও বেলা ১১টার পর ভিড় অনেকটা কমে যায়। তবে সাড়ে ১২টার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আর উচ্ছ্বাসে সরগরম হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে সাড়ে ১৬ হাজার ৬৪৫ জন শিক্ষার্থীর ভোটে প্রথমবারের মত এক বছরের জন্য কেন্দ্রীয় সংসদ গঠিত হবে। জকসুর ২১টি পদে জয় পেতে চারটি প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ১৫৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতৃত্বাধীন দুই প্যানেলের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভোটদানের সময় শেষেও কেন্দ্রের বাইরে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ভোট না দিতে পেরে তাদের মধ্যে আক্ষেপ করেছেন অনেকে।
ভোট দিতে আসা নাঈম ভূইয়া নামের এক শিক্ষার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের ছেলেদের কোনো হল নেই। আমাদের তো পড়াশোনা থাকে। আমি জানতে পারি, ৪টা পর্যন্ত ভোট দেওয়া যায়। তবে এসে দেখি আর গেইটে বন্ধ করে দিল।”

নাঈম ভূইয়া একা নন, আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও ভোট দিতে না পেরে আফসোস করেছেন।
মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে ভাষা শহীদ রফিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় দেখা যায়, অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী লাইনে অপেক্ষা করছেন। কলাভবনের সামনেও এমন দৃশ্য দেখা যায়।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী অংকিতা সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ৩০ ডিসেম্বর এই নির্বাচন হওয়ার কথা খাকলেও সেদিন সকালে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে ভোট পিছিয়ে গিয়েছিল।
“সেদিন সকালেই অনেকে কেন্দ্রে এসেছিল। সেদিন ভোট স্থগিত হওয়ার কারণে আজ সকাল সকাল ভোট দিতে আসিনি। দুপুর পর্যন্ত দেখলাম যে সবাই ভোট দিচ্ছে এবং নির্বাচনে কোনো বাঁধা নেই। তাই আমি দুপুরে এসেছি।”
প্রথমবার ভোট দিয়ে অনেকে আনন্দ প্রকাশ করছেন।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী অংকিতা সাহাম। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম ভোট। কাজেই আনন্দ উচ্ছ্বাস থাকবেই। শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে যারাই দায়িত্বে আসবে, তাদের স্বাগত জানাব।”
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসে প্রথম ভোট দেওয়া তাদের কাছে স্বপ্নের মত। আবার, কেউ কেউ আশা প্রকাশ করেছেন, প্রার্থীরা তাদের এ ভোটের যথাযথ মর্যাদা দেবে।

শিক্ষার্থী সুস্মিতা ঘোষ হ্যাপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ক্যাম্পাসে প্রথম ভোট দিতে পেরে আমি অনেক খুশি।”
তবে ভোটদানের সময়সীমা নিয়ে প্রশাসন তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানিয়ে দেয় দুপুর ৩টার আগেই।
এদিন দুপুর ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনার জুলফিকার মাহমুদ বলেন, “ওই সময়ের (দুপুর ৩টা) মধ্যে যারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন, তাদের ভোট নেওয়া হচ্ছে।”
দুপুর সাড়ে ৩টার দিকেও শিক্ষার্থীদের লাইন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে কেন্দ্রের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়েছেন।
সব কেন্দ্রের ভোট শেষে কড়া নিরাপত্তায় ব্যালট বাক্স কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে নেওয়া হয়। সেখানেই গণনা হবে বলে জানিয়েছেন জুলফিকার মাহমুদ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা হাসান বলেন, ভোটগ্রহণ শেষে ছয়টি ওএমআর মেশিনে ভোট গণণা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

দুপুরের পর কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তা আরও জোরদার করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দুইটি গেইট দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়া যাচ্ছে, সেখানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম অবস্থান নেয়।
তবে সকালে নির্বাচনে মূল ফটকের বাইরে ছাত্রশিবির সমর্থিত ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলামের স্ত্রী ভোটের প্রচার চালানোর সময় ‘হেনস্তার মুখে’ পড়েন। এরপর তাকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
রিয়াজুলের স্ত্রী মহিমা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ছাত্রদলের কর্মীরা তার ‘হিজাব ও মুখের মাস্ক খুলতে’ বলে হেনস্তা করেছেন। রিয়াজুলও বলেন, তার স্ত্রীকে ‘হেনস্তাকারীরা ছাত্রদলের নেতাকর্মী’।
মাহিমা আক্তার বলেন, “আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছিলাম তখন ছাত্রদলের ভাইয়েরা এসে আমাকে হেনস্তা করে। সাথে আমার এক আত্নীয় ছিল, আমরা গেটের বাইরেই অবস্থান করছিলাম। এ সময় আমি হিজাব পরিহিত থাকায় আমাকে হিজাব ও মাস্ক খুলতে বলে।”
তবে ‘হেনস্তার কোন ঘটনা ঘটেনি’ বলে কোতোয়ালি থানার ওসি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, “হেনস্তার কোন ঘটনা ঘটেনি। উনি সাবেক শিক্ষার্থী হয়েও প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। পরে কয়েকজন শিক্ষক আমাদেরকে জানালে, আমরা তাকে সেখান থেকে থানায় নিয়ে আসি। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পরে আমরা থাকে ছেড়ে দিব।”

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিনও।
এদিন এক শিক্ষার্থীকে ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শহীদুজ্জামান সরকার নামের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ওই শিক্ষার্থী ভোট দিতে যাওয়ার সময় তাকে ঘেরাও করেন ছাত্রশিবিরের সমর্থিত প্যানেলের কয়েকজন এবং পর্যবেক্ষক জুনায়েদ মাসুদ। তার ভোটার কার্ড দেখতে চান তারা।
কিন্তু প্রক্টর অফিসে ফের ভোটার কার্ড পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি কম্পিউটার সায়েন্স ও টেকনোলজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শহীদুজামান সরকার।
এছাড়া সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেইটে নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীকে নির্বাচনে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর অভিযোগ তুলে মারধর করার ঘটনা ঘটে।
একাধিক শিক্ষার্থী বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেইটে এসে ওই ব্যক্তি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করায়’ তাকে পিটুনি দেওয়া হয়ে।
কিন্তু ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, কীভাবে তিনি সেটা করেছেন-এসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা শিক্ষার্থীদের কথায় পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ভোটের শেষ সময়ে এসে নির্বাচনে ‘একটি গোষ্ঠীকে’ প্রাধান্য দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত 'অদম্য জবিয়ান ঐক্য' প্যানেল। ভাষা শহীদ রফিক ভবনের নিচ তলায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী ও ছাত্রশিবির জবি শাখার সেক্রেটারি আব্দুল আলিম আরিফ সেই ‘গোষ্ঠীর’ বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন।
সেই গোষ্ঠীর নাম না নিলেও তিনি যে ছাত্রদল-ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ানের’ দিকে ইংগিত করছেন, তা তার অভিযোগগুলো থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জকসু: গেটের বাইরে ভোটের প্রচারে শিবিরের ভিপি প্রার্থীর স্ত্রী, ‘হেনস্তার মুখে’ উদ্ধার করল পুলিশ
জকসু: 'বহিরাগত' বলে শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ
জকসু: প্রশাসন 'একটি গোষ্ঠীকে' প্রাধান্য দিচ্ছে, অভিযোগ শিবির প্যানেলের
জকসু ভোট: শেষ সময়ে দীর্ঘ লাইন, অনড় নির্বাচন কমিশন
প্রথমবার শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জকসু নির্বাচন: ভোট দিয়ে উৎফুল্ল শিক্ষার্থীরা, কেন্দ্রে ভিড় কম