Published : 27 Aug 2025, 05:45 PM
রুমমেটকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি প্রার্থী জালাল আহমদ ওরফে জ্বালাময়ী জালালকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বুধবার ঢাকার মহানগর হাকিম মিনহাজুর রহমান এ আদেশ দেন।
কারাগারে আটক রাখার আবেদনের বিপরীতে জালালের জামিন আবেদন করেন তার আইনজীবী জায়েদুর রহমান। উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক জামিন আবেদন নাকচ করে দেন বলে শাহবাগ থানার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই জিন্নাত আলী জানিয়েছেন।
টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম বিভাগের ২০১৮-২০১৯ সেশনের শিক্ষার্থী জালাল হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের ৪৬২ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার মধ্যরাতে তিনি রুমমেট মো. রবিউল হককে মারধর ও ভাঙা টিউব লাইট দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
পর জালালকে পুলিশে সোপর্দ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মুহসীন হল প্রাধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম বুধবার শাহবাগ থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
এ মামলায় জালালকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর বুধবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে নেওয়ার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মো. আসাদুল ইসলাম।
শুনানিতে জালালের পক্ষে আইনজীবী জায়েদুর রহমান বলেন, “তার রুমমেট অবৈধভাবে হলে থাকেন। এ বিষয় নিয়ে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। তার রুমমেট তাকে মারধর করে উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। রিমান্ড আবেদন নাই। আর ভিকটিমের মেডিকেল সার্টিফিকেট নাই। জামিনের প্রার্থনা করছি।”
রাষ্ট্রপক্ষে কাইয়ুম হোসেন নয়ন জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক জালালের বক্তব্য শুনতে চান। সেসময় জালাল উল্টো রুমমেটের হাত মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, “আমার রুমমেটের হল ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি যাননি। তাকে হলত্যাগ করতে হাই কোর্টে রিটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিষয়টা সে জেনে যায়। আমাকে হত্যার উদ্দেশে আঘাত করে।
বিচারককে হাত দেখিয়ে জালাল বলেন, “আমাকে মারতে গেলে ধরে ফেলি। হাতে আঘাত পাই। বলা হচ্ছে, আমি তাকে ছুরিকাঘাত করেছি। টেস্ট দিন, দেখেন কী হয়। আমার রুমমেট বহিরাগত। সে হলের কেউ না।”
বিচারক জালালের কাছে জানতে চান, ডাকসু নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্রপ্রার্থী কিনা? জবাবে জালাল বলেন, হ্যাঁ।
বুধবার যেকোনো শর্তে জামিন চান জালাল। বিচারক বলেন, “এখন সবার চোখ ডাকসুর দিকে। ওটা সেকেন্ড পার্লামেন্ট।”

জালাল আদালতে বলেন, “কোটা আন্দোলনে অংশ নেই। আওয়ামী লীগের আমলে তিন বার জেলে গিয়েছি। এখন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেই, তারপরও আমাকে এখানে দাঁড়াতে হল।”
পরবর্তীতে জালালের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
জালালের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
জালালের বিরুদ্ধে মামলায় বলা হয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী রবিউল রাত ১২টার দিকে নিজের কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে জালাল ঘরে ঢুকে লাইট জ্বালান এবং চেয়ার টানা হেচড়া করে ‘বিকট’ শব্দ করতে শুরু করেন।
তাতে রবিউলের ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জালালকে বলেন, “ভাই সকালে আমি লাইব্রেরিতে যাব, আপনি একটু আস্তে শব্দ করেন।”
জালাল তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে রবিউলের সঙ্গে তর্ক শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে রবিউলকে ‘হত্যা করার উদ্দেশ্যে’ কাঠের চেয়ার দিয়ে মাথা লক্ষ্য করে বাড়ি মারেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, রবিউল তার হাত দিয়ে কাঠের চেয়ারের আঘাত প্রতিহত করলেও তার কপালে জখম হয়।
পরে জালাল ওই রুমের ভেতর থাকা পুরনো টিউব লাইট দিয়ে রবিউলকে ‘হত্যার উদ্দেশ্যে’ তার মাথা লক্ষ্য করে আঘাত করেন। রবিউল মাথা সরিয়ে নিলেও তার বুকের বাঁ পাশে আঘাত লাগে এবং টিউব লাইট ভেঙে কাটা জখম হয়। জালাল তখন ভাঙা ও ধারালো টিউব লাইট দিয়ে রবিউলকে আঘাত করলে তিনি বাঁ হাত দিয়ে ঠেকান। তাতে হাতে কাটা জখম হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।
পরে অন্য রুমের শিক্ষার্থীরা এসে আহত রবিউলকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
মামলার অভিযোগের বিবরণ দিয়ে জালালকে কারাগারে আটক রাখার আবেদনে বলা হয়, “জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন আসামি। আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই বাছাই প্রক্রিয়াধীন। মামলার ঘটনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর।
“এ অবস্থায় তদন্তকালীন সময়ে তাকে জামিনে মুক্তি দিলে চিরতর পালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাতে তদন্তের ব্যাঘাত ঘটবে। মামলার সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং আসামির নাম-ঠিকানা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত জেল হাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।”
মঙ্গলবার রাতের ঘটনার পর ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী জালাল ফেইসবুকে নিজের আহত হওয়া এবং ক্ষতচিহ্নের ছবি পোস্ট করে পাল্টা অভিযোগ করেন।
রবিউলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করে তিনি লেখেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল থেকে অবৈধ ও বহিরাগত শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার দাবিতে উকিল নোটিস পাঠানোর প্রাক্কালে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ৪৬২ নম্বর কক্ষে আজ রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমাকে মেরেছে আমার রুমমেট রবিউল ইসলাম। সে গত কয়েক মাস ধরে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছে।”
ঘটনার পর কিছুক্ষণ কক্ষের দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান করেন জালাল। প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের পাশাপাশি হলের শিক্ষার্থীরাও তার কক্ষের বাইরে জড়ো হন। পরে ভোর রাত ৪টার দিকে তাকে কক্ষ থেকে বের করে পুলিশে দেওয়া হয়।
সেসময় শিক্ষার্থীরা জালালের ছাত্রত্ব বাতিল তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। তখনই হলের অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম ঘোষণা দেন, “জালালকে হল থেকে বহিষ্কার করা হল। তার ছাত্রত্ব বাতিলের জন্যেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে হল কর্তৃপক্ষ।”