Published : 03 Aug 2025, 05:06 PM
দর কষাকষির পর বাংলাদেশি পণ্যর উপর সম্পূরক শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তা নিয়ে চলতি মাসের মধ্যেই চুক্তি হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির খসড়া দেওয়ার পর তাতে আপত্তি থাকলে যোজন-বিয়োজন শেষে দুই দেশের সম্মতিতে সই করবে বাংলাদেশ।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (প্রেস উইং) গোলাম মোর্তোজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগতে পারে চুক্তি হতে।”
চুক্তি হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি সাপেক্ষে তা প্রকাশ্যে আসতে পারে বলেও বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন।
টানা তিন মাস দর কষাকষি ও তৃতীয় দফার বৈঠকের পর শুক্রবার বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে আরোপ করা সম্পূরক শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করে যুক্তরাষ্ট্র।
এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, এখন নতুন করে আরও ২০ শতাংশ শুল্ক বাড়ায় এটি দাঁড়াবে ৩৫ শতাংশে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে।
এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সম্পূরক শুল্ক পুনর্বিবেচনা করতে ডনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি পাঠান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত তিন মাস স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হয় সেখানে।
বাংলাদেশের মত অনেক দেশই শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেন দরবার শুরু করে। কোনো কোনো দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক হার শুন্যের ঘরে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং সংলাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয় বাজেটে। এর মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়।
কিন্তু তাতে ট্রাম্পের মন গলেনি। যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারের মত।
সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়ে ৭ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, বাংলাদেশের ওপর সম্পূরক শুল্কের হার হবে ৩৫ শতাংশ, যা কার্যকর হবে ১ অগাস্ট। অবশ্য শুল্ক কমাতে এর মধ্যে আলোচনার সুযোগও রাখা হয়।
শুল্কের চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ। মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা আসে।
পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এরপর বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও ইউএসটিআরের সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের বৈঠক শেষে সম্পূরক শুল্কের হার কমিয়ে ২০ শতাংশের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন।
এই ঘোষণা আসার পর এখন দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হবে। চুক্তির খসড়া পাওয়ার পর বাংলাদেশ তাতে মতামত দিবে। সেখান থেকে দুই পক্ষ চূড়ান্তভাবে ঐক্যমতে পৌঁছানোর পরই তাতে স্বাক্ষর করবে বাংলাদেশ। চুক্তি সইয়ের পর দুই দেশের সরকারের যৌথ ঘোষণা আসতে পারে।
চুক্তিপত্র দেরিতে সই হলেও শুল্কহার ঘোষণা হওয়ায় আগামী ৭ অগাস্ট থেকে তা বাংলাদেশি পণ্যর বেলায় কার্যকর হবে।
শুল্কে ছাড় দেওয়ার ঘটনাকে বড় ধরনের সাফল্য বলে দাবি করছেন প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরা।
তবে বাণিজ্য নিয়ে দর কষাকষির পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন কোন শর্তে শুল্কে ছাড় পেল বাংলাদেশ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুল্ক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যকার ‘নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টকে’ (এনডিএ) নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনার মধ্যে শনিবার বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন, ওয়াশিংটনের ‘সম্মতি সাপেক্ষে’ চুক্তি প্রকাশ করা হবে।
সে দিন শেখ বশিরউদ্দীনের একটি সাক্ষাৎকার নিজের ফেইসবুক পেইজে প্রকাশ করেন ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (প্রেস উইং) গোলাম মোর্তোজা।
সে সাক্ষাতকারে বাণিজ্য উপদেষ্টা দাবি করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যে চুক্তি, তাতে দেশের ‘স্বার্থবিরোধী’ কিছু নেই। যেগুলো স্বার্থবিরোধী মনে হয়েছে, সেগুলো থেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল সরে এসেছে।
তিনি বলেন, “চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি সাপেক্ষে তা প্রকাশ করা হবে। চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর শিগগিরই হয়ত যৌথ বিবৃতি আসবে। তথ্য অধিকারের আলোকে এটা করা হবে।”
এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যকার নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টকে (এনডিএ) ‘খুবই স্বাভাবিক বিষয়’ মন্তব্য করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মূলত যেটার বিনিময়ে চুক্তিটি করেছে, তা হলো তারা তাদের ন্যাশনাল সিকিউরিটিকে ব্যবহার করেছে। চুক্তির মূল নিয়ামক হিসেবে নিজস্ব নিরাপত্তার কথা বলেছে, সেখানে আলোচনায় গোপনীয়তার শর্ত থাকা অবশ্যম্ভাবী।
“এর মাধ্যমে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো উপাদান থাকলে আমরা সে চুক্তিতে উপনীত হব না, সেটাই তো স্বাভাবিক।”
দেশের ‘স্বার্থ’ বিরোধী কিছু নেই সেই চুক্তিতে দাবি করে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, “সেখানে দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু নেই। যেগুলো দেশের স্বার্থবিরোধী ইনডাইরেক্টলি হতে পারে, সেসব জিনিস থেকে ক্লিয়ারলি বের হয়ে এসেছি।’’