Published : 10 Aug 2025, 09:13 PM
বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে আনতে দেশটির প্রশাসনের সঙ্গে যে দর কষাকষি হয়েছে তাতে থাকতে চেয়ে ব্যবসায়ীরা ‘অনেকের বিরাগভাজন’ হয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
রোববার ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সংলাপে তিনি বলেন, “শুল্ক নিয়ে দর কষাকষিতে আমরা থাকতে চেয়েছি। কারণ আমরা সবচেয়ে বড় অংশীজন। এই জন্যইতো আমরা ‘অনেকের বিরাগভাজন’ হয়েছি।
“কিছুতে আমরা সম্পৃক্ত হইতে চাইলে, মনে হয় যেন আমরা যারা উদ্যোক্তা…আমরা, এটা কী বলব, অচ্ছুত বলব।”
দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর এই শীর্ষ নেতা বলেন, “বলতে পারেন যে আমাদের সাথে কথা বললে আমলাতন্ত্রের ধর্ম চলে যাবে। এনডিএ (নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট) বা গোপনীয়তার চুক্তির উসিলায় কোনো কিছুতেই আমাদের রাখা হয়নি।
“যখন আমরা সংবাদমাধ্যমে চেঁচামেচি শুরু করলাম তখন শেষ মুহূর্তে আমাদের কিছু বিষয়ে জানানো হইল এবং আমরা কিছু যোগ করতে সক্ষম হয়েছিলাম।”
তারা কিছু যোগ করায় বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছে, এমন দাবি করছেন না তুলে ধরে বিজেএমইএ সভাপতি বলেন, “সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ করলে আরও ভালো হত। কিন্তু সরকার যেখানে শেষ করেছে ২০ শতাংশ, আমরা সেখান থেকে শুরু করব যে ১৫ শতাংশ কীভাবে করা যায়। ১৪ শতাংশ বা ১৬ শতাংশতে নিয়ে যাওয়া যায় যেন, সেজন্য আমরা কাজ করছি।”
এ সময় সরকার বারবার নীতি পরিবর্তন করায় বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
টানা তিন মাস দর কষাকষি ও তৃতীয় দফার বৈঠকের পর ১ অগাস্ট বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে আরোপ করা সম্পূরক শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করে যুক্তরাষ্ট্র।
এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, এখন নতুন করে আরও ২০ শতাংশ শুল্ক বাড়ায় এটি দাঁড়াবে ৩৫ শতাংশে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা দিয়েছিল। পরে ২ শতাংশ কমিয়ে ১ অগাস্ট থেকে তা কার্যকরের কথা বলা হয়। এরপর পর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকই ৭৩৪ কোটি ডলারের।
অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন নিয়ে রাজধানীর একটি হোটেলে সিপিডি আয়োজিত সংলাপে মাহমুদ হাসান বলেন, “বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বা রপ্তানি শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আর্থিক মূল্যের দিক থেকে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু প্রতিনিয়ত নীরবে কারখানা বন্ধ হচ্ছে।”
বিভিন্ন সেই কারখানাগুলো অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ করায় এমন অবস্থা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অথবা দেশের অন্যান্য নীতি, বিভিন্ন কারণে এগুলো বন্ধ হয়।
“আমরা খালি দেখি প্রবৃদ্ধিটা, কিন্তু কারখানা যে বন্ধ হচ্ছে তার বড় প্রমাণ শুধু বিজিএমইএ এর সদস্য সংখ্যা ৭ হাজার ২০০ থেকে এখন মাত্র ৩ হাজারে এ নেমে এসেছে। এই ৪ হাজার কারখানা যে বন্ধ হয়েছে এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে। তার মধ্যে এই যে নীতি, এ নীতি অন্যতম প্রধান কারণ।”
নীতি পরিবর্তনের ফলে কারখানা বন্ধের তথ্য দেন বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। একই সাথে অন্তর্বর্তী সরকার গার্মেন্ট ও প্রবাসীদের জন্য বৈদেশিক খাতের সফলতার যে কথা বলে, তার বিপরীতে তাদের জন্য ইতিবাচক কিছু না করার কথাও বলেন তিনি।
শওকত আজিজ বস্ত্র খাতে করহার বাড়ানোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, “৩৬৫ দিনে সরকার কী করছে, আমি আপনাদের বলি। এই খাতে আপনার, কর্পোরেট করহার ছিল ১৫ শতাংশ। আর আরএমজিতে (তৈরি পোশাক) ছিল ১২ (শতাংশ)। তো আমাদের এটাকে নিয়ে গেছে ৩৭ শতাংশে। তৈরি পণ্য আসবে, শুল্কমুক্ত কাঁচা মাল, তুলা আসবে, এখানে ২ শতাংশ ধরায়া দিছে। আমাদের প্রতিনিয়ত তার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে আপাতত।
“চাঁদার জ্বালায় আমরা বাঁচতে পারতেছি না। গ্যাস নাই, বিদ্যুৎ নাই। তো আপনি (গভর্নরকে ইঙ্গিত করে) যদি স্বীকারই করেন, এই দুইটা (তৈরি পোশাক ও বস্ত্র) খাত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাইলে আপনি এখানে কিছু একটা করেন।”
কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তুলে ধরে শওকত আজিজ বলেন, “আপনারা বাজেটে এই দুইটা খাতে কী রাখছেন? কিছু তো রাখেন নাই। উল্টা এক গরুরে কয়বার জবাই করা যায় যায় সে ফর্মুলা নিয়ে আসেন। বারবার ট্যাক্স বাড়াবেন। এটা বাড়াবেন, সেটা বাড়াবেন।”

‘পাচার বন্ধ হওয়ায় রেমিট্যান্স বেড়েছে’
দেশের অর্থ যারা বিদেশে পাচার করত তারাই এখন ‘পালিয়ে’ যাওয়ায় রেমিটেন্সের প্রবাহ বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার জন্য কিছু কিছু জায়গায় উন্নতি দেখার কথা বলেছেন তিনি।
আমীর খসরু বলেন, “কিছু কিছু জায়গাতে ভালো হয়েছে। এটার আবার কারণও আছে। কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ ওরা (পাচারকারী) তো সবাই পালিয়ে গেছে। পাচার যারা করে, তারা দেশে তো আর নাই। আর যারা আছে, তাদের কাছে টাকা পয়সা নাই।”
তার মতে, অর্থ পাচার বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে রেমিটেন্স বাড়তে থাকবে।
“অর্থ পাচার কীভাবে হয়? আমাদের বিদেশে যারা টাকা উপার্জন করেন ওদের টাকাগুলো ওরা ওখানে খাটাতেন। ওদের দেশে টাকা পাঠাতে হয় নাই। ১২০ টাকার ডলারকে ওরা ১৩০ টাকা দিয়ে কিনেছে। চুরির টাকা অসুবিধা কী আছে?
“সুতরাং তার জন্য, যে রেমিটেন্স দেশে পাঠাতো, সে রেমিটেন্স না পাঠিয়ে এই পাচারকারীদের দিয়ে ১০ টাকা বেশি পাচ্ছে। যে মুহূর্তে তারা পালিয়ে গেছে আর অর্থ পাচার বন্ধ হয়ে গেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেমিটেন্স বেড়ে গেছে। এটা আমাদের রিজার্ভকে সহায়তা করতেছে।”
এছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে পোশাকসহ অন্য কিছু খাতের সামর্থ্যের কথা তুলে ধরে তা অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে মন্তব্য করেছেন তিনি।
সাবেক এই বাণিজ্য মন্ত্রীর মতে, এর ফলে সরকার পুরনো দায় শোধ করতে পেরেছে।
তবে বিগত সরকারের বাজেট অন্তর্বর্তী সরকার এসেও ‘চালু রাখা ভুল’ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপি ক্ষমতায় এলে সরকার ও আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপ কমাতে কাজ করবেন বলেও তুলে ধরেন দলটির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।