Published : 18 Jul 2026, 01:08 PM
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারলেও আরেক বড় বাজার জাপানে মোটেই ভালো করতে পারছে না।
জাপানে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় এগারো বছর ধরে এক থেকে দেড় বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই আটকে আছে।
এমনকি জাপানের সঙ্গে বহুল প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) পরও রপ্তানি বাড়ছে না; উল্টো কমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সবশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। আর রপ্তানির ওই পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম।
গেল অর্থবছর জাপানে পণ্য রপ্তানি করে পাওয়া ১৩৬ কোটি ডলারের মধ্যে ১১৬ কোটি ডলারই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে আয়ের অংক ছিল ১৪১ কোটি ১৬ লাখ (১.৪১ বিলিয়ন) ডলার। আর ২০২৫-২৬ আর্থবছরে জাপানে পণ্য রপ্তানি করে ১৬৭ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরেছিল অন্তবর্তী সরকার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জাপানে পণ্য রপ্তানি থেকে সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা এসেছিল ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ওই আর্থবছরে জাপানে ১৪৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১২৫ কোটি ডলারই এসেছিল তৈরি পোশাক থেকে।
বিভিন্ন সময়ে সরকার ও রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে জাপানে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্খিত সুফল মেলেনি। অথচ এ বাজারে তৈরি পোশাকেরই চাহিদা রয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মত। এর মাত্র ৫ শতাংশের মত রপ্তানি করতে পারেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা।
বিশ্বের অন্যান্য বাজারের মত জাপানে পোশাক রপ্তানি বাড়াতে পারলে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ অবস্থান আরও মজবুত হত।
বিগত অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর মে মাসে জাপান সফর করেন। ওই সফরে রপ্তানি বড়ানোর বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে, গত ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করে বাংলাদেশ। কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের চুক্তি এটাই প্রথম।

বাংলাদেশের তখনকার বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও টোকিওতে ওই চুক্তি সই করেছিলেন।
ইপিএর ফলে জাপানের বাজারে ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্যের শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তার পরও সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে না। অথচ দেশ হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঋণ-সহায়তা আসে জাপান থেকেই।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সত্যি কথা বলতে কি, আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে যতটা নজর দিয়েছি, বড় মার্কেট হওয়ার পরও জাপানের দিকে তেমন মনোযোগ দিইনি।
“এতে সরকারের দিক থেকে যেমন ব্যর্থতা আছে, আমাদের রপ্তানিকারকদের দিক থেকেও আছে। সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে জাপানে আমাদের রপ্তানি অবশ্যই বাড়ত; সেটা ৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছত হয়ত; কিন্তু আমরা দেড় বিলিয়ন ডলারও ছাড়াতে পারিনি।”
এই অবস্থা পাল্টাতে জাপানের সঙ্গে করা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি খুব বেশি সুফল দেবে বলে মনে করেন না প্লামি ফ্যাশনস ও জেসিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক।
তিনি বলেন, “জাপানে আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য হল তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকে আমরা আগে থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছি। তবে এই চুক্তির ফলে পোশাক খাতে সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন একটা বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে।”
ঘরে বসে থাকলে রপ্তানি বাড়বে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বড় মার্কেট হওয়ার পরও কেন এতদিন রপ্তানি বাড়েনি; কোথায় ভুল ছিল, সেটা উদঘাটন করে নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে আমাদের এই বাজার ধরতে হবে।”
সামগ্রিকভাবে রপ্তানির অবস্থা যে ভালো নয়, সেই বাস্তবতা তুলে ধরে এই ব্যবসায়ী বলেন, “ট্রাম্পের শুল্কসহ নানা কারণে গত অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ২ শতাংশের মত কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারের আগের অবস্থা আর নেই। এখন জাপানের বাজারটা যদি ভালো থাকত, তাহলে কিন্তু সামাল দেওয়া যেত।”
একই সুরে কথা বললেন ফতুল্লা অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান, যিনি বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাপানে আমাদের রপ্তানি পণ্যের ধরনে পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন নতুন প্রোডাক্ট সংযোজন করতে হবে। যেমন—জাপানে প্রচৃর স্পোর্টস আইটেমের চাহিদা রয়েছে; আমাদের সেগুলো রপ্তানি করতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকায় আমরা যেসব পোশাক রপ্তানি করি, সেগুলো দিয়ে জাপানের মার্কেটে সুবিধা করা যাবে না।
“অনেকে বলেন, জাপানিরা বেশি দামের পোশাক ব্যবহার করে; এ ধারণা ঠিক নয়। তারা এখন কম দামি পোশাকও কেনে। মোদ্দা কথা হল, তাদের চাহিদা ও পছন্দের পোশাক রপ্তানি করতে হবে। তাহলে রপ্তানি বাড়বে।”
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, “জাপানের ফ্যাশন অগ্রগামী এবং মান সচেতন বাজার যদি আমরা ধরতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য নতুন পথ খুলতে পারে।”
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আগে থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত, সেটা ঠিক। কিন্তু সেবা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে ইপিএর আলাদা গুরুত্ব থাকছেই।
“আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা এতদিন জাপানের বাজার ভালোভাবে ধরতে পারিনি। এখন এই বাজারের দিকে নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ইপিএর যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য এই চুক্তিতে একটি সুখবরও রয়েছে। চুক্তির আগে জাপানের বাজারে পোশাক পণ্য রপ্তানিতে ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন অনুসরণ করতে হত। অর্থাৎ, জাপানে কোনো পণ্য রপ্তানি করতে হলে ওই পণ্যের কমপক্ষে দুটি ধাপ বাংলাদেশে সম্পন্ন হতে হত।
“এখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্য সিঙ্গেল-স্টেজ ট্রান্সফরমেশন রুলস অব অরিজিন অনুসরণ করেই রপ্তানি করা যাবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে যে কোনো একটি উৎপাদনের ধাপ সম্পন্ন হলেই ওই তৈরি পোশাক জাপানের বাজারে রপ্তানি করা যাবে। আমাদের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য এটা একটা বড় সুবিধা।”
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাপান ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বর্তমানে খুব অল্প পণ্যই সেখানে রপ্তানি হচ্ছে।
“বাংলাদেশকে এর পুরো সুবিধা পেতে হলে নিজস্ব সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী করা জরুরি।"
প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষের দেশ জাপানে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ নিতে হবে সরকার ও রপ্তানিকারকদের সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
“আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জাপানে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে। আর সেজন্য যা যা করা দরকার তা সরকার ও বেসরকারি খাত মিলে করতে হবে।”
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে ওঠা জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরেও রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতির এই বিশ্লেষক।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ইপিএ না হলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে সমস্যা পড়ত বাংলাদেশ। কারণ যেসব পণ্য এখন শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, চুক্তি না হলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হত।
তিনি বলেন, জাপান একটি উন্নত দেশ এবং বৈশ্বিকভাবে প্রভাবশালী দেশ। তাই জাপানের সঙ্গে ইপিএ অন্য দেশগুলোকেও বাংলাদেশের সঙ্গে একই ধরনের আলোচনায় আগ্রহী করে তুলতে পারে।