Published : 29 Apr 2026, 12:42 AM
বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তার দাবি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দাবির তালিকা নয়, বরং ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতি একটি যৌথ অঙ্গীকার’।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকার আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচেম) আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ সভা ও নীতি সংলাপে এই চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এবং এআরটি (বাণিজ্য চুক্তি) উভয় দেশের জন্য এক অসাধারণ ভবিষ্যতের রূপরেখা তুলে ধরে।”
কোন প্রেক্ষাপট থেকে দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তি করেছে, চুক্তিতে থাকা বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হতে পারে, তা বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি।
চুক্তির অধীনে পণ্য কেনার ‘বাধ্যবাধ্যকতা আরোপের’ ক্ষেত্রে মার্কিন পণ্যের দাম নিয়ে সমালোচনা হয়, তার বিপরীতে পণ্যের মানের কথাও বলেন তিনি।
ক্রিস্টেনসেন বলেন, “সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা প্রায়ই দামের দিকে মনোযোগ দেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মান ও প্রোটিনের মাত্রার মত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন। আপনি যে মানের জন্য অর্থ দেন, সেই মানই পান।
“বাংলাদেশের খাদ্য মন্ত্রণালয় অন্যান্য দেশ থেকে যে গম কিনেছিল, তা নষ্ট হওয়ার হার ছিল ২০ শতাংশ পর্যন্ত। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গমের ক্ষেত্রে নষ্ট হওয়ার হার মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রোটিনের পরিমাণ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমি এটাকেই উচ্চমূল্য বলি এবং গর্বিত যে, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানের কৃষিপণ্য উপভোগ করতে পারবেন।”
তার ভাষ্য, চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশ যে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানির বর্তমান হার অব্যাহত রাখলেই পূরণ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, “বিশ্বে জ্বালানির অন্যতম বৃহৎ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিবেচনায়, এটি এমন একটি অঙ্গীকার বলে মনে হয়, যা বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতার কারণেই সম্ভবত ছাড়িয়ে যাবে। একই সঙ্গে, এটি বাংলাদেশজুড়ে জ্বালানির প্রাপ্যতা উন্নত করবে।
আলোচিত এ বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের দাবি, “এগুলো কোনো সহায়তা প্যাকেজ নয়; এগুলো বাণিজ্যিক চুক্তি, যা উভয় দেশে কর্মসংস্থান ও সুযোগ সৃষ্টি করে। আর সরাসরি বাণিজ্যিক সুফলের বাইরে, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে এখানকার রপ্তানিপণ্যের জন্য কম শুল্ক এবং বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন রপ্তানিপণ্যের আরও ভালো প্রবেশাধিকার, এসব সরাসরি ক্রয়চুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার এআরটিতে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করারও অঙ্গীকার করেছে। এই অঙ্গীকারকে বাংলাদেশের প্রত্যেক ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও ভোক্তার স্বাগত জানানো উচিত।”
বাংলাদেশে ব্যবসা করা দীর্ঘদিন ধরেই ‘বেশ কঠিন’ এবং এটি কোনো গোপন বিষয় নয় আখ্যা দিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে ক্রিস্টেনসেন বলেন, “আপনারা প্রতিদিনই এই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। আমি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বা বিদেশি কোম্পানির কথা বলছি না। স্থানীয় কোম্পানিগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এআরটিতে উল্লিখিত সংস্কারগুলোর দাবি জানিয়ে আসছে।”
এআরটিকে একটি চমৎকার চুক্তি, যা প্রতিযোগিতামূলক ১৯ শতাংশ শুল্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বজায় রাখে বলেও তিনি মনে করেন।
রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য, চুক্তি না থাকলে যা ৩৫ শতাংশ হতো। একই সঙ্গে, বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য বাধায় পরিবর্তন আনে।

তার মতে, এটি খুবই যুক্তিসঙ্গত একটি পদক্ষেপ।
যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের উপর শুল্ক ও অশুল্ক বাধার কারণে এই চুক্তির দিকে যাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে, তারা যদি পরে অন্য দেশ থেকে আমদানি করে, তাহলে বিশাল ও দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়। যে বাজারের ওপর তারা নির্ভর করে, সেই বাজারকেই যদি দুর্বল করে তোলে, তাহলে স্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
“আপনি যদি আমাদের কাছে বিক্রি করতে চান, তাহলে আমাদের কাছ থেকে কেনারও চেষ্টা করতে হবে। অন্ততপক্ষে, আমাদের রপ্তানির ওপর ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত মোট করভার আরোপের পাশাপাশি আমাদের গমের ওপর তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষা এবং আমরা যে কীটনাশক ব্যবহার করি না, তারও পরীক্ষা- এ ধরনের অপ্রচলিত, এমনকি অযৌক্তিক অশুল্ক বাণিজ্য বাধা ও বিপুল শুল্ক আরোপ করা উচিত নয়।”
এ দিন কর্ণফুলী টানেলের দিকে ইঙ্গিত করে বক্তৃতায় চীনকে ‘খোঁচা’ দেন ক্রিস্টেনসেন। এর আগে তার একটি বক্তব্য নিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল ঢাকার চীন দূতাবাস।
কেন আমেরিকার সঙ্গে অংশীদারত্ব করতে হয়, সেই যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, “প্রথমত, আমরা স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতায় বিশ্বাস করি। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো আইনের শাসনের অধীনে সুস্পষ্ট চুক্তি এবং পূর্বানুমেয় ব্যবসায়িক চর্চা মেনে পরিচালিত হয়।
“আমরা পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রকৃত অংশীদারত্বের প্রস্তাব দিই। গোপন সমঝোতা, বাস্তব ব্যবসায়িক ভিত্তিহীন প্রকল্প, অকার্যকর ব্যয়বহুল প্রকল্প বা ঋণফাঁদের কূটনীতি নয়। আমাদের প্রকল্পগুলো যথাযথ যাচাই-বাছাই করি এবং বাংলাদেশকে এমন কোনো বিলিয়ন ডলারের ‘সুড়ঙ্গ প্রকল্পের’ দায়ে ফেলে রাখি না, যার বাস্তব কোনো গন্তব্য বা সুফল নেই।”
চুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আইন প্রণয়নে বাংলাদেশের সামনে পাঁচ করণীয় থাকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রদূতের ভাষায় করণীয়গুলো হল- বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন পাস, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয় বাধা সৃষ্টি করে এমন বিধিবিধান সংস্কার, নতুন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কাস্টমস কর্মকর্তা ও নিয়ন্ত্রকদের প্রশিক্ষণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সেবাকেন্দ্র তৈরি এবং অনুমোদন ও পারমিট দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ।
বক্তৃতার শেষে রাষ্ট্রদূত যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আগে কখনো এতটা শক্তিশালী ছিল না। সামনের সুযোগগুলোও আগে কখনো এত বড় ছিল না। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, অঙ্গীকার এবং অংশীদারত্ব।