২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

একীভূত ৫ ব্যাংক: এবার খড়গ মুনাফায়, সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন বিশ্লেষকদের

এমন পদক্ষেপকে গ্রাহকরা দেখছেন ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ হিসেবে। আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, আমানতকারীদের উচিত হবে এটা নিয়ে কথা বলা।

একীভূত ৫ ব্যাংক: এবার খড়গ মুনাফায়, সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন বিশ্লেষকদের
ফাইল ছবি

শেখ আবু তালেব

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Jan 2026, 02:18 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:34 PM

ব্যাংকে সঞ্চয় রেখে এমনিতেই বিপদে ছিলেন তারা; প্রয়োজনের সময় নিজের টাকাই তুলতে পারছিলেন না। বছর দেড়েকের বেশি সময় ধরে ভোগান্তির শেষ ছিল না। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে। এখন আবার সেই গ্রাহকদের ওপরই পড়েছে নতুন কোপ, দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

লুটেরাদের লোভের বলি হিসেবে শুধু মুনাফা বঞ্চিতই হচ্ছেন না তারা, উল্টো বাংকগুলোর লোকসানের কারণে জমা রাখা আমানত থেকে টাকা কেটে নেওয়ার মুখে পড়েছেন। যারা লাভ দেখানোর কারণে আগে মুনাফা পেয়েও গেছেন তাদের থেকে এখন কেটে নেওয়া হবে মুনাফা।

একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপর এবার এভাবেই নতুন খড়গ চাপিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সবশেষ দুই বছরের সঞ্চিত অর্থের ওপর তাদের মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন পদক্ষেপকে গ্রাহকরা দেখছেন ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ হিসেবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরাও। তারা এটিকে গ্রাহকদের সঙ্গে অবিচার বলে মনে করছেন।

ব্যাংকগুলোর লোকসানে পড়াকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার ২০২৪ ও ২০২৫ পঞ্জিকা বছরের জন্য গ্রাহকদের মুনাফা না দিতে নির্দেশ দিয়েছে। যদিও আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে পাঁচটির মধ্যে চারটি ব্যাংকই মুনাফায় ছিল।

২০২৫ হিসাব বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকেও কোনো কোনো ব্যাংক মুনাফায় থাকার তথ্য দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

এ পদক্ষেপকে ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে অভিহিত করে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে মুনাফা দেওয়া হবে না আমানতকারীদের।

'অনিয়ম ও জালিয়াতির’ মাধ্যমে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ ফেরত না আসায় বছর দুয়েক ধরে দুর্দশায় পড়ে একীভূত হওয়া ব্যাংক পাঁচটি।

এগুলোর মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও শেখ হাসিনার সরকারের সময় প্রভাবশালী ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম মজুমদার।

অন্য চারটির পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামের আলোচিত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম ও তার পরিবারের হাতে।

কী যুক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের

বিলুপ্ত হওয়া শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, রেজ্যুলেশন স্কিমের সুষম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একীভূত হয়ে এসব ব্যাংক এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মুনাফা না দেওয়ার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রাহকদের আমানত হিসাবের স্থিতি ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সব আমানতের ওপর কোনো মুনাফা বা লাভ বিবেচনা করা যাবে না।

এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমানতের ওপর ‘হেয়ারকাট (আমানতের একটি অংশ কেটে রাখা)’ প্রযোজ্য হবে এবং সেই অনুযায়ী আমানতের চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারিত হবে। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর শরীয়াহ বিধি অনুযায়ী লাভ-লোকসান ভাগ করে নেওয়ার নীতিতে নতুন সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

অথচ প্রতি বছর শেষে আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাবে নিয়ম মেনে মুনাফার অংশ জমা করেছে ব্যাংকগুলো।

আর্থিক সংকটে জেরবার হওয়া শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করা হয়।

‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে এ ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত হিসেবে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। এটির মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। গত ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক সার্কুলার দিয়ে বলেছে, ব্যাংক রেজ্যুলেশন স্কিম, ২০২৫ কার্যকর হয়েছে।

নতুন ব্যাংকটি চালুর পর সীমিত পরিমাণে আমানত তোলার সুযোগ পান স্বল্প অঙ্কের আমানতকারীরা। আর পুরনো আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ এবং নতুন আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ঋণ নিতে পারবেন তারা। পরের দিন থেকে গ্রাহকদের টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া শুরু হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম দিকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তোলার সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকরা। পরের তিন মাসে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করে তুলতে পারবেন আমানতকারীরা।

যে প্রক্রিয়ায় ফেরত নেওয়া হবে মুনাফা

২০২৩ সালের জন্য মুনাফায় থাকা ব্যাংকগুলো থেকে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ বুঝে পেয়েছেন।

ওই হিসাব বছরে নিয়ম মেনে মাঝামাঝিতে একবার এবং বছর শেষে আরেকবার আমানতকারীর গচ্ছিত অর্থের ওপর তা ব্যাংক হিসাবেও মুনাফা যোগ হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদী আমানতের ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। আবার একীভূত হওয়ার আগে ব্যাংকগুলো আর্থিক সংকটের কারণে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পেরে এফডিআরের মত বিভিন্ন মেয়াদী আমানত নবায়ন করে দিয়েছে।

পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয় হিসাবে রয়েছে। এর বিপরীতে দেওয়া ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের বেশিরভাগই খেলাপি হয়ে গেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য।

২০২৩ সালে ব্যাংক খাতে ঋণ সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৯ শতাংশ। এজন্য কেনো ব্যাংকেরই মুনাফার হার ৭ শতাংশের বেশি ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ৫-৭ শতাংশ ছিল মুনাফা ও সুদের হার।

২০২৪ সাল থেকে ঋণের বেঁধে দেওয়া সীমা ৯ শতাংশ তুলে নেওয়া শুরু হলে ঋণের সুদ বাড়তে বাড়তে ১৪ শতাংশের বেশিতে গিয়ে ঠেকে। তখন ব্যাংকগুলো গড়ে ৭-৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফা আমানতকারীদের দেয়।

এসব সুদ ও মুনাফা দেওয়ার আগে আমানতকারীদের কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারের কর কেটে নিয়েছে ব্যাংকগুলো। সেগুলো সরকারি কোষাগারে জমাও দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তে আমানতকারীদের দেওয়া মুনাফা ফেরতও নেবে ব্যাংকগুলো। কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে এমন প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, ‘‘একিউআর পদ্ধতিতে কতটা লোকসান হয়েছে তা বের হয়েছে। যাদের ব্যাংকে এখনও অর্থ আছে-তাদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়া হবে।’’

‘সুবিচার হয়নি’

চব্বিশের আন্দোলনে সরকার পতনের পর সংকট তীব্র হলে চাহিদার বিপরীতে বেশির ভাগ আমানতকারীই একীভূত হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ তুলতে পারেননি। দিনের পর দিন ঘুরেও নিজের সঞ্চয় রাখতে না পেরে হৈ হট্টগোল করেছেন।

সরকারি পদক্ষেপে আর সরকারি অর্থের যোগান পেয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে যখন গ্রাহকরা অর্থ ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তার স্বস্তি পেতে শুরু করেছিলেন তখন মুনাফা না দেওয়া এবং কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করছে। নির্বিচারে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা ‘লোপাটের’ কারণে তারা সময়মত টাকা তুলতে না পেরে ভুগলেন। এখন অন্যদের সেই দায়ও চাপছে তাদের ওপর; ব্যাংকে রাখা আমানতে যাবে কমে।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষক আল আমিন এমন পদক্ষেপকে গ্রাহকদের প্রতি ‘সুবিচার’ হচেছ না বল মনে করছেন। বলেন, একবার মুনাফা দেখিয়ে বিতরণ ও নতুন করে লোকসান দেখানো ঠিক হচ্ছে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘যে মুনাফা তুলে নেওয়া হয়েছে, তাতো আর ফেরত আনা সম্ভব না। বিনিয়োগকারীদের শেয়ারতো শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে, এখন তো তারা নেই ।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, একপক্ষ মুনাফার ভাগ পেল। এখন লোকসান দেখিয়ে ‘শরিয়াহ তত্ত্বের’ দোহাইয়ে আরেকজন ভুগবেন।

‘‘এখানে সুবিচারটা হল না। ব্যাংকটা আসলে তখনও লোকসানে ছিল। লোকসানে থাকার পরও মুনাফা দেখানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তখনকার কর্মকর্তারা তা অনুমোদন করেছিলেন। তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।’’

ব্যাংক মার্জারের সময়ে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্ব দেয়নি বলে মনে করেন তিনি।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘‘এটা তো ফেয়ার জাজমেন্ট হল না, ফেয়ারনেস থাকল না।”

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) এই চেয়ারম্যান বলেন, আমানতকারীদের উচিত হবে এটা নিয়ে কথা বলা।

একিউআর প্রতিবেদন দেখে সিদ্ধান্ত

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বেও বড় বদল আসে। দুর্দশায় থাকা পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তখন তালিকাভুক্ত এ পাঁচ ব্যাংকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির কাজটি আটকে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন করে নিরপেক্ষ নিরীক্ষক নিযুক্ত করে নিরিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়।

একইসঙ্গে মার্জারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিপোট বা একিউআর) করতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ডিসেম্বরে শেষ হয় ৫ ব্যাংকের একীভূত করার উদ্যোগ। সেই একিউআর প্রতিবেদনে উঠে আসে পাঁচ ব্যাংকের লোকসানের চিত্র।

একিউআর প্রতিবেদন দেখেই মুনাফা না দেওয়ার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলোর উপর চালানো একিউআর প্রতিবেদনে দেখা গেছে তারা আসলে লোকসানে আছে। সব ব্যাংকই শরিয়াহভিত্তিক তাই লাভ-লোকসানের সমান ভাগ তাদের নিতে হবে। ব্যাংক যেহেতু লোকসানে গিয়েছে তাই মুনাফা দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো।’’

একীভূত হওয়ার পরিকল্পনার কারণে চার ব্যাংকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন দেরিতে প্রকাশ হয়। ব্যাংকগুলো কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এখনও শেষ হয়নি ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন। ফলে ব্যাংকটিও লভ্যাংশ দেবে কি না সেই সিদ্ধান্ত জানায়নি।

২০২৩ সালেও মুনাফায় ছিল ৪ ব্যাংক

সবশেষ দুই বছরে লোকসানে পড়লেও ঠিক এর বিপরীত চিত্র ছিল বছর দুই আগেও। ২০২৩ সালে মুনাফায় ছিল ইউনিয়ন ছাড়া বাকি চার ব্যাংক। এরমধ্যে স্যোশাল ইসলামী, এক্সিম ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিরিউটি ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ বিতরণ করে ২০২৪ সালের অগাস্টের মধ্যে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মুনাফায় ছিল ইউনিয়ন ব্যাংক। সে সময়ে ইপিএস বা শেয়ার প্রতি আয় ছিল ছয় টাকা ৪০ পয়সা। পরের প্রান্তিকে লোকসানে দেখানো শুরু করে সরকার ও পরিচালক পর্ষদ বদলে গেলে।

আগের বছর মুনাফা করলেও ২০২৪ সালে অর্থ সংকটে পড়ে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব বাতিল করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক। আর ইউনিয়ন ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন উচ্চ আদালতের নির্দেশে পুনরায় নিরীক্ষা কার্যক্রম চলায় ২০২৩ সালের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

পট পরিবর্তনের পর এই পাঁচ ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করলে লোকসানে পড়ে যায়।

কী বললেন গভর্নর

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের সবশেষ অবস্থা জানাতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে আসেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

এসব ব্যাংকের মুনাফা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলোকে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছিলাম, এটা ছিল শরিয়াহভিত্তিতে। শরিয়াহ কাউন্সিল আমাদের বলেছে, যখন লোকসান হবে তখন কোনো রকম মুনাফা দেওয়া যাবে না।’’

আগে থেকেই ব্যাংকগুলোর লোকসানে থাকার তথ্য দিয়ে গভর্নর বলেন, ‘‘আগে থেকেই ক্ষতিতে ছিল। আমরা সেটা আমলে নিচ্ছি না। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের রিভাইজড হিসাবে বড় লোকসান হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত।

‘‘একটা অসম্ভব রকমের বড় জালিয়াতি হয়ে গেছে এসব ব্যাংকে।’’

এসব ব্যাংকের নিরীক্ষকদের ‘চিহ্নিত’ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে গভর্নর বলেন, ‘‘যারা পাঁচ ব্যাংকের ভুয়া নিরীক্ষা করেছেন তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শাস্তি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’’

পাঁচ ব্যাংকে চলমান ফরেনিসক অডিট শেষ করতে আরো তিন মাস সময় লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ফরেনসিক অডিট শেষ হলে, যারা লুটপাট করেছে সেগুলো আরো পরিষ্কার হবে- আইনের আওতায় আনা হবে।’’

আগের দিন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও পাঁচ ব্যাংকের নিরীক্ষকদের শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছেন।

সবশেষ আর্থিক সূচক (সব তথ্য অনিরিক্ষীত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী)

এক্সিম ব্যাংকের অনিরিক্ষীত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে শেয়ার প্রতি আয় হয় ১ টাকা ১৪ পয়সা।

সরকার পরিবর্তনের পরে ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অগাস্টে।

পরের প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টম্বরেই লোকসান হয় ৩ টাকা ৯১ পয়সা।

আগের ষান্মাসিকের মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করলে ২০২৪ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের ৯ মাসে লোকসান দাঁড়ায় শেয়ার প্রতি ২ টাকা ৭৭ পয়সা।

স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইপিএস ছিল ৫৩ পয়সা। পরের প্রান্তিক অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টম্বরে লোকসান হয় ৩৭ পয়সা (ইপিএস দাঁড়ায় ঋণাত্বক)।

আগের ষান্মাসিকের মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করলে ২০২৪ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের ৯ মাসে মুনাফা কমে শেয়ার প্রতি ১৫ পয়সা।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইপিএস হয় ৭৪ পয়সা। পরের প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টম্বরে ইপিএস দাঁড়ায় ঋণাত্বক ২৬ পয়সা।

আগের ষান্মাসিকের মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করলে ২০২৪ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের ৯ মাসে কমে দাঁড়ায়  শেয়ার প্রতি ৪৮ পয়সা।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইপিএস হয় ৯৭ পয়সা। পরের প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টম্বরে ইপিএস দাঁড়ায় ঋণাত্বক ৫৫ পয়সা।

আগের ষান্মাসিকের মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করলে ২০২৪ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের ৯ মাসে ইপিএস কমে দাঁড়ায় শেয়ার প্রতি ৪৩ পয়সা।

অন্যদিকে ইউনিয়ন ব্যাংকের ২০২৪ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইপিএস হয় ৯২ পয়সা। পরের প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টম্বরে ইপিএস দাঁড়ায় ঋণাত্বক ৭৭ পয়সা।

আগের ষান্মাসিকের মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করলে ২০২৪ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের ৯ মাসে ইপিএস কমে দাঁড়ায় শেয়ার প্রতি ১৪ পয়সা।

আরও পড়ুন

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: উত্তোলন ১০৭ কোটি, জমা ৪৪ কোটি টাকা

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক: টাকা তুলতে পারছেন পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকরা

মার্জার: লাইসেন্স পেল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক