Published : 23 Jul 2026, 01:17 PM
আট বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, “আমাদের সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমাদের বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে—নবায়নযোগ্য শক্তি, ওষুধ শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটাল সেবা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং লজিস্টিকস।
“আমরা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি বৃহৎ উৎপাদন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করছি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এফডিআই সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর। আমি এই কক্ষে উপস্থিত প্রতিটি ব্যবসায়িক নেতাকে সেই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অংশ হতে আহ্বান জানাচ্ছি।
“আমরা একসাথে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি, যা হবে সুদৃঢ়, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। আমি আপনাদের সবাইকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
“আসুন, আমরা একসাথে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাই; নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি এবং আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলি। আসুন, একটি সমৃদ্ধ ও বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই অগ্রযাত্রায় আমরা অংশীদার হই।”

ফরেন ইনভেস্টমেন্ট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) উদ্যোগে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও এক্সপো অনুষ্ঠান চলছে। প্রধানমন্ত্রী সম্মেলন অনুষ্ঠানে যোগদানের আগে বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
‘নতুন উদ্যোগ নিন, ব্যবসা প্রসারিত করুন’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে আমি নিজেও একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলাম। আমার সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি—যেকোনো ব্যবসা কেবল উদ্যোক্তার দক্ষতা বা রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে সফল হতে পারে না; ব্যবসার সাফল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সরকারের প্রবৃদ্ধি-সহায়ক নীতিমালার ওপর।
তিনি বলেন, “আজ আমি আপনাদের একটি সহজ ও স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই: নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায়—আপনারা বাংলাদেশে আসুন, নতুন উদ্যোগ নিন এবং ব্যবসা প্রসারিত করুন।
“আপনি দেশীয় উদ্যোক্তা হোন কিংবা বিদেশি বিনিয়োগকারী—আপনি যখন বাংলাদেশে মূলধন বিনিয়োগ করবেন, তখন আমাদের সরকারও তার সময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে আপনার পাশে থাকবে। এটি কেবল একটি আশ্বাস নয়, ইনশাল্লাহ এটি আমাদের সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার। “
‘বিশ্বস্ত অংশীদার হোন’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে সত্যি। তবে এর পাশাপাশি আমাদের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তি। আমাদের রয়েছে একটি দ্রুত বিকাশমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, একঝাঁক তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরঙ্কুশ জনসমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচিত সরকার। এই শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে বাংলাদেশকে এক টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
“আমাদের মূল লক্ষ্য হলো একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত এবং বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রদান করে। আমরা আপনাদের কেবল বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি না, বরং এই রূপকল্প বাস্তবায়নে আমাদের সাথে বিশ্বস্ত অংশীদার হওয়ারও উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।”
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের অর্থনৈতিক ও নীতিগত প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছিল নির্বাচনের অনেক আগেই। আমরা বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়িক চেম্বার, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নীতি-নির্ধারকদের কথা গুরুত্বের সাথে শুনেছি।
“তাদের মূল বার্তাটি ছিল একেবারেই স্পষ্ট—বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগের সুদৃঢ় আইনি সুরক্ষা, আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সহজীকৃত কর ব্যবস্থা, অর্জিত মুনাফা প্রত্যাহারের নির্বিঘ্ন প্রক্রিয়া, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমরা আপনাদের কথা গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করেছি, আর তাই এখন আমরা সে অনুযায়ীই কাজ শুরু করেছি। আমরা আমাদের আইনি ও রেগুলেটরি কাঠামোর আধুনিকায়ন করছি, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদার করছি, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা উন্নত করছি, কর ও ভ্যাট প্রশাসনকে সহজ এবং মুনাফা অর্জনের পর তা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ঝামেলামুক্ত করছি।
“একই সাথে আমরা একটি গতিশীল পুঁজিবাজার গঠন করছি, স্টার্টআপগুলোকে উৎসাহিত করছি, অপ্রয়োজনীয় বিধিমালা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করছি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াসমূহ সহজ করছি এবং সরকারি সেবাসমূহ ডিজিটালাইজড করছি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য শক্তিতে অধিকতর বিনিয়োগের পাশাপাশি আমাদের বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো এবং সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি।”
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে তার উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সঞ্চালনায় ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে সরকারের নীতি ও অবস্থান তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের(বিডা) চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।
এ সময়ে অতিথি সারিতে বসে প্রধানমন্ত্রী এ আলোচনা শোনেন।
আয়োজকরা জানান, এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী ধাপে প্রবেশের প্রস্তুতি এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের উদ্যোগ জোরদারে এ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) এফডিআই রিপোর্ট উন্মোচন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর হাতে এ প্রতিবেদন তুলে দেন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট রুপালী হক চৌধুরী, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট দীপল আবেবিবিক্রমা, এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর টিআইএম নুরুল কবির, প্রাইজ ওয়াটার হাউজ কুপারস বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ।