Published : 22 Jul 2026, 09:35 PM
তেলের পর এবার গ্যাস সংকটে নাকাল হচ্ছে পরিবহন খাত; রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দিন-রাত দীর্ঘ লাইনে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকছেন যানবাহনের চালকরা।
তারা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’। যেগুলোতে আছে, চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাাস ঢুকছে না।
গ্যাসের সংকটে রাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল কমে গেছে, বেড়ে গেছে ভাড়া।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বা ভীতি থেকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে সারা দেশে হঠাৎ তেল সংকট শুরু হয়। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে রাতভর-দিনভর দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয় মানুষকে।
সরকার সরবরাহ বাড়িয়ে ফুয়েল পাস, অ্যাপ ইত্যাদি চালু করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। ভবিষ্যতে বেশি দামে বিক্রি করার আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করারও অভিযোগ ওঠে।
সরকার তেলের দাম বাড়ানোর পর সেই সমস্যা কাটলেও এখন রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনতে গাড়ির লম্বা লাইন পড়ছে।

রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালান গাবতলী এলাকার আশরাফ আলী। তিন দিন ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল আশরাফ বুধবার বিকেলে বলেন, গাবতলীতে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ।
“সাভার এলাকার পাম্পগুলা সব বন্ধ। আজকে একটা ট্রিপ নিয়ে গেছিলাম ডেমরা। স্টাফ কোয়ার্টারে (পাম্পে) লাইনে দিয়া দাঁড়াইতে গেলাম। দেখি বিশাল সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পর পাম্প এমনিই বন্ধ হবে। বাধ্য হয়ে খালি ট্যাংক নিয়াই এখন বাসার দিকে রওনা দিছি।”
আশরাফ আলী বলছেন, তার গাড়ির গ্যাসের সিলিন্ডারটি বড়। সেখানে সাধারণ সময়ে ১১ শ টাকার গ্যাস ঢোকে। কিন্তু এখন পাম্পগুলোতে চাপ কম থাকায় ৫ শ টাকারও গ্যাস ঢুকছে না। কোথাও কোথাও তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না।
কল্যাণপুরের হাফিজা সিএনজি পাম্পের কর্মী ফিরোজ বলছেন, “সারাদিন কমপ্রেশর মেশিন চালাইয়াও প্রেশার উঠতাছে না। লাইনে গ্যাসই নাই।”
সিএনজি হচ্ছে উচ্চ চাপে সংকুচিত করে রাখা প্রাকৃতিক গ্যাস। গাড়ির সিলিন্ডারগুলোতে সিএনজি ডেলিভারি দিতে গেলে ২৯০০ থেকে ৩৬০০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হয়।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা কমে গেছে।

জহির মোল্লা নামের এক চালক বলেন, “আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতেছে পাম্পেই। তাও যে গ্যাস ঢুকে, তাতে আধা বেলা গাড়ি চালান যাচ্ছে না। এজন্য ড্রাইভাররা গাড়িই বাইর করতেছে না।”
গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হচ্ছে। তাতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে।
তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১৫৫ কোটি ঘনফুটের মত। সে কারণে পাম্পে প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ থাকছে না।
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, “লাইনে আমাদের দেওয়ার কথা ১৫ পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপের গ্যাস। সেখানে আমাদের ৩ থেকে ৫ পিএসআই পর্যন্ত দেওয়া হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় আমরা কখনো ১০ থেকে ১১ পিএসআই চাপের গ্যাস পাই। এখন গ্যাস একেবারেই জিরো বলা যায়।”
তিনি বলেন, “লাইনে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস থাকলে আমাদের মেশিনগুলো ঘণ্টায় ৫০০ কিউবিক মিটার গ্যাস কমপ্রেস করতে পারে। আর আমরা গাড়িতে গ্যাস ডেলিভারি দিই ৩০০০ পিএসআই প্রেশারে। ইনপুটে পিএসআই যত কমবে, আউটপুটও তত কম আসবে।”

ফারহান বলেন, “আপনারা জেনে থাকবেন মহেশখালিতে একটা সমস্যা হয়েছে। সেটার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত লাইনে গ্যাসের চাপ বাড়বে না। আর গ্যাস না পেলে এই সংকটও কাটবে না।”
এদিকে বিভিন্ন দাবি নিয়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতি আগামী ৩০ জুলাই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। সরকারের সঙ্গে তাদের এ বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে ফারহান নূর বলছেন, “অনেকে ভাবছেন আমাদের কর্মসূচির কারণে গ্যাস নেই। সেটা কিন্তু ঠিক না।
“আমাদের ধর্মঘট কর্মসূচির তারিখ ৩০ জুলাই। এর মধ্যে সরকার দাবি না মানলে আমরা সেই কর্মসূচি পালন করব। এখন কিন্তু লাইনে গ্যাস না থাকায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সেটা কেটে গেলেই সব স্বাভাবিক হবে।”