Published : 10 Nov 2025, 12:22 AM
বকেয়া নিয়ে বিবাদের জেরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটছে।
বিবাদ মেটাতে কোম্পানিগুলো আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকিও দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের দেরিতে বিল পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানিয়েছেন আদানি পাওয়ার লিমিটেডসহ একাধিক কোম্পানি।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, এ সমস্যার মূলে রয়েছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের সংকট। এ সংকটের কারণে সরকার সময়মত বিল পরিশোধ করতে পারছে না এবং বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে দর–কষাকষিতে যেতে পারছে না।
আবার ক্রয়চুক্তিতে থাকা দাম নিয়ে কারসাজি কিংবা তথ্য গোপনের মাধ্যমে কিছু কোম্পানির বিরুদ্ধে অযৌক্তিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ““সরকারের উচিত হবে, আদালতের বাইরে সমঝোতার যত উপায় আছে, সেগুলো কাজে লাগানো।
“এসব বিরোধ আদালতে গড়ালে দেশের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন।”
বিপিডিবিকে পাঠানো কোম্পানিগুলোর চিঠিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকার যখন থেকে ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ’ বাবদ টাকা কাটতে (ক্ষতিপূরণ) শুরু করে, তখন থেকে নতুন করে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে।
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থ হলে কোম্পানির কাছ থেকে যে অর্থ কেটে নেওয়া হয়, সেটাকে ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ’ বলা হয়।
পিপিএ চুক্তি অনুযায়ী, একটি কোম্পানিকে তার বিদ্যুৎকেন্দ্র ন্যূনতম সক্ষমতায় চালু রাখতে হয়। এতে ব্যর্থ হলে কোম্পানিটি পুরো অর্থ দাবি করতে পারে না।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ন্যূনতম ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় চালাতে হয়, যাকে ট্যারিফ নির্ধারণের ভিত্তি ধরা হয়।
এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বলছে, বিপিডিবির কাছ থেকে তারা সময়মতো জ্বালানি বিল পায়নি। এ কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে তারা চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদনে থাকতে পারেনি।
“পাওনা পরিশোধে ভারসাম্য বজায় রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে যখন বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে থাকে,” বলেন মোয়াজ্জেম।
গত বছরের অগাস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়ে জ্বালানি খাতের বিপুল পরিমাণ বকেয়া পরিশোধ এবং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নতুন করে সমঝোতায় পৌঁছানো নিয়ে। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই নির্বিচারে এসব চুক্তি সই করা হয়েছিল।
বিদ্যুৎ কেনা বাবদ ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডকে গত কয়েক বছরে যে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ আপত্তি তুলতে পারে।
সেক্ষেত্রে বিপিডিবির ভাষ্য, ভারতে করছাড় পাওয়ার তথ্যটি গোপন করে আদানি পাওয়ার অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ১০ শতাংশ বা ১০ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা কমাতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বিলম্বে পরিশোধের সারচার্জ (অতিরিক্ত চার্জ) এড়ানোর মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
এছাড়া বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়ে সরকার বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমঝোতা কর্মসূচি শুরু করেছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার বকেয়া পরিশোধ করতে পারেনি। তারা সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে যেতেও ব্যর্থ হয়েছে; বিশেষ করে ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ’ বাবদ অর্থ কেটে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিডব্লিউজিইডি) সদস্য সচিব ও পরিবেশ অধিকারকর্মী হাসান মেহেদী বলেন, “সরকার একতরফাভাবে সমস্যা সমাধান করতে গেছে। ফলে পরিস্থিতি সহজ হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল হয়ে পড়েছে।”
হাসান মেহেদীর মতে, এ ধরনের চুক্তিতে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিলে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

‘বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সংকট সমাধান করা আর সম্ভব নয়’
গত ২৫ অগাস্ট বিপিডিবিকে একটি চিঠি পাঠায় আশুগঞ্জের ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠান ‘মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার কোম্পানি’।
ওই চিঠির একটা অংশে বলা হয়, “আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে, চুক্তির ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিরোধগুলো আর বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি সালিশি পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন।”
চিঠিতে কোম্পানিটি আগের চিঠিপত্রের কথা তুলে ধরে, যেগুলোতে জ্বালানি কিনতে না পারা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত না রাখার কথা বলা হয়েছিল।
চিঠিতে বলা হয়, বিপিডিবি ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে বিল পরিশোধে অনিয়মিত হয়ে পড়ে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থও দাবি করে কোম্পানিটি।
২০১৭ সালে ওই কোম্পানির সঙ্গে যখন চুক্তি হয়, তখন ডলারের বিনিময় হার ছিল ৭৮ টাকা ৬৬ পয়সা।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সব উদ্বেগ উপেক্ষা করে বিপিডিবি ২০২৪ সালের মে মাস থেকে ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ’ (ক্ষতিপূরণ) আরোপ শুরু করে। এরপর ওই বছরের মে থেকে তিন মাসে তারা ৩১ কোটি টাকা কেটে নেয়।
মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার বলেছে, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, বিপিডিবি অর্থ পরিশোধ করছে না। কোম্পানিটি ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিলম্বে অর্থ পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষতি ও সুদবাবদ ৬৮৭ কোটি টাকা দাবি করেছে।
মিডল্যান্ডের মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২৩টি জেনারেটর রয়েছে, যেগুলোর একেকটি প্রায় ৭ মেগাওয়াটের। ‘লিকুইডেটেড ড্যামেজ’ এড়াতে হলে এগুলোকে ন্যূনতম ৯৩ শতাংশ সক্ষমতায় চালু রাখতে হবে।
দেরিতে অর্থ দেওয়ায় ক্ষতি
চুক্তি অনুযায়ী, দেরিতে অর্থ পরিশোধের কারণে বিপিডিবিকে সারচার্জ (অতিরিক্ত অর্থ) দিতে হয়।
শুধু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্মিত আদানি মালিকানাধীন গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে মাসিক সারচার্জের পরিমাণ ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। ভারতের বিদ্যুৎ রপ্তানি করা অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার দেড় শতাংশ।
যেহেতু এসব কোম্পানিকে ডলারে অর্থ পরিশোধ করতে হয়, সে কারণে দেরিতে পরিশোধ হলে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
বিলম্বে পরিশোধের কারণে বাংলাদেশকে কতটা ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে, সেই হিসাব অবশ্য পাওয়া যায়নি।
তবে বিপিডিবির ২০২৪ সালের অগাস্টের আনুমানিক একটা হিসাব অনুযায়ী, আদানি ও অন্যান্য ভারতীয় কোম্পানিকে অতিরিক্ত ৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলার বিলম্বে পরিশোধের কারণে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকার মতো সারচার্জ দিতে হতে পারে।

বকেয়া পেতে সময় বেঁধে দিয়েছে আদানি
বকেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একটি ইমেইলে আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, বাংলাদেশের কাছে তাদের ৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে সারচার্জসহ ১৩৫ মিলিয়ন ডলারের বকেয়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি নেই।
আদানির মেইলে বলা হয়, এটা দীর্ঘ দিনের বকেয়া।
“বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং চুক্তি মানতে আমরা বিপিডিবিকে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বরের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করার অনুরোধ জানিয়েছি।“
আদানির বেঁধে দেওয়া সময় সোমবার শেষ হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থ পরিশোধ না করলে তারা কী পদক্ষেপ নেবে, সেই প্রশ্নের কোনো জবাব কোম্পানিটি আদানি।
গেল ৩ নভেম্বর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে বকেয়া নিয়ে এই বিরোধ নিষ্পত্তি করতে আদানি গ্রুপ আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়ায় যাবে।
আদানি ইমেইলে বলেছে, বকেয়া নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে মূলত এর হিসাব পদ্ধতি নিয়ে।
বিপিডিবি বলছে, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে যে চুক্তি হয়, তাতে কয়লার দাম নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে আদানি নিম্ন মানের কয়লা ব্যবহার করেও সর্বোচ্চ মানের কয়লার দাম দাবি করতে পারে।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য বিপিডিবি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম এবং কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের সদস্য আ. ন. ম. ওবায়দুল্লাহকে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।