বিমানের ব্যামো এয়ারবাসে সারবে?

সবাই বলছেন, বাজার ধরতে গেলে বহর বাড়াতেই হবে। কিন্তু কেমন উড়োজাহাজ কেনা উচিত, দুর্বলতা কাটাতে বিমানের কী করা উচিত, সে প্রশ্নগুলোও আসছে।

গোলাম মর্তুজা অন্তুবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Nov 2023, 08:09 PM
Updated : 2 Nov 2023, 08:09 PM

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স যেখানে তার বহরের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, সেখানে ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনার।

এয়ারবাসের হিসাবে, পৌনে এক কোটি প্রবাসীর দেশ বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজারের ফায়দা নিচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। বিশাল এ বাজার ধরতে দেশি এয়ারলাইন্সগুলোর বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করা ছাড়া বিকল্প নেই।

এয়ারবাসের পাশাপাশি বিশ্বের আরেক প্রধান উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংও তাদের নিজস্ব জরিপের তথ্য দিয়ে বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে আঞ্চলিক ট্রাফিক বিবেচনায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশে উড়োজাহাজে ভ্রমণ দ্বিগুণ হবে। সেক্ষেত্রে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ না করে বাজার ধরতে পারবে না দেশি এয়ারলাইন্সগুলো।

তবে এ যাত্রায় বোয়িং কোনো ব্যবসা পাচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত শুধু এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ সংগ্রহের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘুরে যাওয়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ জানিয়েছেন, এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।

বিমান কর্তৃপক্ষের যুক্তি, বাংলাদেশে এভিয়েশনের যে বিরাট বাজার, তার দখল পেতে গেলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে নতুন উড়োজাহাজ কিনতেই হবে। সেটা এয়ারবাস থেকে কিনলে ভবিষ্যতে তা বোয়িংয়ের সঙ্গে দর কষাকষির সুযোগ বাড়াবে।

তবে একজন এভিয়েন বিশেষজ্ঞ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, বিমান পিছিয়ে থাকে দুর্বল অবকাঠামোর কারণে। লাভজনক হতে হলে বিমানকে অবশ্যই ‘সিস্টেম লস’ কমাতে হবে, জোর দিতে হবে বাজার ব্যবস্থাপনায়। আর আপাতত বিমানের যে বাজার, তাতে‘ওয়াইড বডি’র চেয়ে ‘মিড রেঞ্জে’র উড়োজাহাজ বেশি লাভজনক হতে পারে।

বিমানের সক্ষমতা কতটা কাজে লাগে

বিমানের বহরে এখন কোনো এয়ারবাস নেই। বহরের ২১টি উড়োজাহাজের মধ্যে ১০টি প্রশস্ত বডির (ওয়াইড বডি) এবং ১১টি সরু বডির (সিঙ্গেল আইল বা ন্যারো বডি) উড়োজাহাজ।

এই বহর নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মাম, মদিনা, রিয়াদ, জেদ্দা, আরব আমিরাতের দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, ওমানের মাস্কাট, কুয়েত, কাতারের দোহা, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার, কানাডার টরন্টো, জাপানের নারিতা, চীনের গুয়াংজুর পাশাপাশি থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর রুটে ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান। পাশের দেশ ভারতের দিল্লি ও কলকাতা এবং নেপালের কাঠমান্ডু রুটে নিয়মিত চলছে বিমানের ফ্লাইট। পাশাপাশি ঢাকা থেকে অভ্যন্তরীণ কয়েকটি রুটে ফ্লাইট চালাচ্ছে বিমান।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের সভায় চলতি বছরের ৩ মে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটটি যাত্রীবাহী ও দুটি কার্গো উড়োজাহাজ।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাক্রার সফরের পর গত মাসে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল আজিম সাংবাদিকদের বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই ১০টি উড়োজাহাজ কেনা হবে এয়ারবাসের কাছ থেকে।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিমানের এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) রিনিউয়ালের অংশ হিসেবে বিমান যে অডিট করেছিল, তাতে এ সংস্থার সক্ষমতার অচয়ের একটি চিত্র পাওয়া যায়।

সেখানে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের ২৭ লাখ ১১ হাজার ৩৬৭টি আসনের মধ্যে বিক্রি হয়েছিল ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭১টি আসন। ৬ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৬টি সিট খালি ছিল, যা মোট আসনের ২৪ শতাংশের মত।

আর অভ্যন্তরীণ রুটে ১১ লাখ ৪১ হাজার আসনের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৮ লাখ ৬৫ হাজার আসন। খালি ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার আসন, যা মোট আসনের ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি খালি গেছে বিমানের কার্গোস্পেস। আন্তর্জাতিক রুটে বিমান যতোগুলো ফ্লাইট চালিয়েছে তাতে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪৩৫ টন কার্গো বহনের সক্ষমতা ছিল, কিন্তু বিমান মোটে ২৮ হাজার ৮৭ টন কার্গো বহন করেছে। অর্থাৎ বিমানের কার্গো সক্ষমতার মোট ৯৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ খালিই ছিল।

অভ্যন্তরীণ রুটের কার্গোও সক্ষমতারও বিপুল অপচয় হয়েছে। বিমান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীদের ব্যাগেজ ছাড়া তেমন কার্গো থাকে না। তবে আন্তর্জাতিক রুটে কার্গো বহনের বিপুল সুযোগ ছিল।

বিমানের এমডি বলছেন, ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ আসনের ব্যবহারকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরা হয়৷ আর নতুন উড়োজাহাজ কিনে বিমান কোন রুটে চালাবে, তা কেনার প্রক্রিয়া শুরুর সময়ই নির্ধারণ করা হয়েছে৷

তার ভাষায়, অনুমান করে নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে সবকিছু নির্ধারণ করা হয়েছে।

‘যাত্রী বেশি, উড়োজাহাজ কম’

অক্টোবরের শুরুতে ফ্রান্সের তুলুজে এয়ারবাসের সদর দপ্তরে বাংলদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। এয়ারবাস কিনলে বাংলাদেশের লাভ কোথায়, সেই যুক্তি তারা তাদের মত করে তুলে ধরেন।

নিজেদের গবেষণার বরাত দিয়ে এয়ারবাসের ওয়াইড বডি মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর রদ্রিগো লেজামা বলেন, এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে বাংলাদেশি যাত্রীদের বেশিরভাগকে বহন করছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো।

এয়ারবাসের হিসেবে ২০১৯ থেকে ২০৪২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রীর সংখ্যা প্রতিবছর ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি সবগুলো এয়ারলাইন্স মিলে ৫০টি উড়োজাহাজ দিয়ে এই যাত্রী বহন করা হচ্ছে।

এর মধ্যে ২৫টি ওয়াইডবডির ও ২৫টি ন্যারো বডির উড়োজাহাজ। এই হারে যাত্রী বাড়তে থাকলে ২০৪২ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে যাত্রীদের পরিবহনের জন্য ১০৫টি সিঙ্গেল আইল এবং ৫৫টি ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশের জিডিপির আকার, জনসংখ্যা ও প্রবাসীর সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করে এয়ারবাস বলছে, দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর হাতে উড়োজাহাজের সংখ্যা এখন ‘খুবই কম’।

বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৪১৬ বিলিয়ন, ভিয়েতনামের ৩৬৬ বিলিয়ন, ফিলিপিন্সের ৩৯৪ বিলিয়ন ও ইথিওপিয়ার ১১১ বিলিয়ন।

এই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ প্রবাসী।

কিন্তু এই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে সবচেয়ে কম উড়োজাহাজ রয়েছে। বাংলাদেশের যেখানে মোটে ৩৬টি উড়োজাহাজ রয়েছে, ভিয়েতনামের আছে ১৮৭টি, ফিলিপাইন্সের ১৭২টি এবং ইথিওপিয়ার ১৪৯টি।

এয়ারবাসের কর্মকর্তা বলছেন, বাংলাদেশের পৌনে এক কোটির বেশি মানুষ প্রবাসে থাকেন। তাদের পরিবহনের মূল কাজটা করে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো। নিজেদের বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো প্রবাসীদের বাজারটা ধরতে পারে।

রদ্রিগো লেজামার মতে, এয়ারবাস এ ৩৫০ এর মত সুপ্রশস্ত উড়োজাহাজগুলো বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে টক্কর দেওয়ার ‘যথাযথ হাতিয়ার’ হতে পারে।

তাছাড়া বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান যেখানে এশিয়ার মাঝখানে, তাহলে বাংলাদেশকে কেন একটি ‘এভিয়েশন হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, সেই প্রশ্নও তিনি রাখেন।

এয়ারবাসের প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উড়োজাহাজের চাহিদা বিষয়ক বার্ষিক প্রকাশনা কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুকের (সিএমও) তথ্য অনুযায়ী, ২০৩২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি বছরে ৫ শতাংশের বেশি হারে বাড়বে, যা বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। পাশাপাশি উড়োজাহাজে ভ্রমণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হবে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ।

বোয়িংয়ের সিএমও এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরে উড়োজাহাজের বৈশ্বিক বহর দ্বিগুণ হবে। ২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে ৭০০টির মত উড়োজাহাজ ছিল। ২০৪১ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রয়োজন হবে ২৩০০ উড়োজাহাজ। পুরনোগুলো প্রতিস্থাপন ও নতুন মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো কিনবে প্রায় ১৯০০ উড়োজাহাজ।

আর এয়ারবাসের গ্লোবাল মার্কেট ফোরকাস্ট (জিএমএফ) অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০৪২ সালের মধ্যে বিশ্বে ৪০ হাজার নতুন যাত্রীবাহী ও কার্গো উড়োজাহাজের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে কেবল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (চীন বাদে) প্রয়োজন হবে সাড়ে ৯ হাজার উড়োজাহাজ, এর দুই হাজার ওয়াইডবডির।

বাড়তি যাত্রীর চাহিদা মেটাতে ভারতের এয়ারলাইন্সগুলো এরইমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে। চলতি বছরই ভারতের দুটি এয়ারলাইন্স এয়ার ইন্ডিয়া ও ইন্ডিগো সাড়ে ৯ শ উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দিয়েছে।

চলতি বছরের জুনে এয়ার ইন্ডিয়া ৪৭০টি এবং বাজেট এয়ারলাইন্স ইন্ডিগো ৫০০ উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দিয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া এয়ারবাস থেকে ২৫০টি এবং বোয়িং থেকে ২২০টি উড়োজাহাজ কিনবে। সেজন্য খরচ হবে অন্তত ৭০ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে জুন মাসেই প্যারিস এয়ার শোর প্রথম দিনে এয়ারবাসের কাছ থেকে একসঙ্গে ৫০০টি ন্যারো বডি উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার কনফার্ম করে হইচই ফেলে দেয় ইন্ডিগো। একটি এয়ারলাইন্সের একসঙ্গে এতগুলো উড়োজাহাজের অর্ডার করার নজির এটাই প্রথম। এয়ারবাসের এ৩২০ নিও ফ্যামিলির উড়োজাহাজগুলো ২০৩০ থেকে ২০৩৫ মধ্যে হাতে পাবে ইন্ডিগো।

জানতে চাইলে বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, “আমাদের ফ্লিট বাড়াতেই হবে। আমাদের যে ট্রাফিক গ্রোথ (যাত্রী সংখ্যা) সেটা ধরে রাখতে গেলে বিমানকে নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত করতেই হবে। আগামী ১০ বছর পরে ফ্লিটের চাহিদা মেটাতে এই ১০টা এয়ারক্রাফটের পরে আরও এয়ারক্রাফট লাগার কথা। সেই ক্ষেত্রে এয়ারবাসের সঙ্গে যদি একটা ডিল হয়, তাহলে আগামীতে কিন্তু বোয়িংয়ের সঙ্গে একটা ‘বার্গেনিং পয়েন্ট’ থাকবে।

“আমাদের সবগুলো দেশীয় এয়ারলাইন্স মিলে এখন মার্কেট শেয়ার তো মাত্র ২০-২২ শতাংশ। বাকি যাত্রী তো বিদেশি এয়ারলাইন্স বহন করছে। এটা খুব ভালো সিচুয়েশন না। স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে মিনিমাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিতে হবে। লোকাল এয়ারলাইন্সগুলোর মার্কেট শেয়ার বাড়াতে হলে এখন আমাদের নতুন এয়ারক্রাফট যোগ করা ছাড়া গতি নেই।”

বিমানের আসন খালি থাকা নিয়ে প্রশ্ন করলে কাজী ওয়াহেদুল বলেন, “এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে যাত্রী চাহিদা রয়েছে। চাহিদা না থাকলে দেশে এতগুলো এয়ারলাইন্স কীভাবে অপারেট করছে? তারা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ লোড ফ্যাক্টর (যাত্রী ভরে) নিয়ে অপারেট করছে। সেখানে আমাদের এয়ারলাইন্সগুলো সেটা করতে পারছে না, কেন তারা এটা করতে পারছে না? কারণ আমাদের এয়ারলাইনগুলোর মার্কেটিং সক্ষমতা, স্ট্রাটেজিক প্ল্যানিংয়ের সক্ষমতা একদমই নাই। যার কারণে তারা কোন রকম প্ল্যানিং না করেই কাজ করে।”

মিশ্র ফ্লিটের ফাঁদ?

একটি এয়ারলাইন্সর বহরে বিভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ থাকলে সেটিকে এভিয়েশনের পরিভাষায় বলে ‘মিশ্র ফ্লিট’। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বহর যদি ছোট হয়, মিশ্র ফ্লিটে খরচ যায় বেড়ে। বোয়িং নির্ভরতা কমিয়ে এয়ারবাস কিনতে গেলে বিমানও সেই সমস্যায় পড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।

বোয়িংয়ের এশিয়া প্যাসিফিক ও ভারতের মার্কেটিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেভ শাল্টে গত ১১ মে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোনো এয়ারলাইন্স ছোট বহর নিয়ে একাধিক নির্মাতা কোম্পানির উড়োজাহাজ ব্যবহার করলে দুই নির্মাতার উড়োজাহাজের জন্য আলাদা পাইলট ও প্রকৌশলীর প্রয়োজন হবে। তাদের পৃথক প্রশিক্ষণ লাগবে, যা ব্যয় বাড়াবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দিকে ইঙ্গিত করে ডেভ বলেন, দুই কোম্পানির উড়োজাহাজ থাকলে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে পৃথকভাবে খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু বহরে একই নির্মাতার উড়োজাহাজ থাকলে একই রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীরা পুরো বহরের দেখভাল করতে পারবেন। একই পাইলট দিয়ে সবগুলো উড়োজাহাজ পরিচালনা করা যাবে।

তার হিসাবে, কোনো বহরে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭ এবং পাঁচটি এয়ারবাস এ৩৫০ থাকলে বছরে খরচ বাড়বে বাংলাদেশি টাকায় ৬৪০ কোটি টাকা।

এয়ারবাসের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, মিশ্র ফ্লিটে বিমানের জন্য বড় কোনো সমস্যা ডেকে আনবে না।

এয়ারবাসের এক্সটারনাল কমিউনিকেশনের কর্মকর্তা জাস্টিন ডুবোন গত সপ্তাহে তুলুজে বাংলদেশের সাংবাদিকদের বলেন, ৩২০ এর মত ছোট উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে এ ৩৫০ এর মত বড় উড়োজাহাজও তাদের রয়েছে।

“আগের জেনারেশনের উড়োজাহাজগুলোর তুলনায় এগুলোতে ২৫ শতাংশ কম জ্বালানি লাগে। বেশি কার্যকর, বেশি সাশ্রয়ী ও বেশি টেকসই প্রযুক্তি রয়েছে এই উড়োজাহাজগুলোতে। পাশাপাশি একই পাইলট দিয়ে সুপরিসর এ৩৫০ এবং ন্যারোবডির এ৩২০ এর মত উড়োজাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব। একজন আগেরদিন এ ৩২০ চালিয়ে পরদিন এ৩৫০ চালাতে পারেন। এতে এয়ারলাইন্সগুলোর খরচ কমবে।”

মিশ্র ফ্লিটের এই বিপদ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিমানের এমডি বলেন, “এটা অ্যাডজাস্ট করার সক্ষমতা আমাদের আছে, আমাদেরও একসময় একসাথে বোয়িং ও এয়ারবাস ছিল৷ খুব মাইনর অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হবে৷”

তিনি বলছেন, বোয়িং আর এয়ারবাস এই দুই কোম্পানির উড়োজাহাজে পার্থক্য ‘খুব সামান্যই’৷ যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ এয়ারলাইন্সের বহরে একসঙ্গে বোয়িং ও এয়ারবাস রয়েছে।

যাত্রীরাও অনেক সময় পছন্দ করার সুযোগ চান মন্তব্য করে শফিউল আজিম বলেন, “যাত্রীরাও অনেক সময় খোঁজেন, এয়ারবাসের আছে কিনা। তারা সেই অভিজ্ঞতা নিতে চান। এত বিমানের সক্ষমতাও বাড়বে৷ এখানে ডায়ভার্সিফাই করার একটি সুযোগ আছে৷ দুইটি বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে যদি কাজ করতে পারি, তাতে অপশন আরও বেড়ে যায়। দুইটি কোম্পানি থাকলে প্রতিযোগিতামূলকভাবে আমরা সবচেয়ে ভালো দরে জিনিসটি নিতে পারবে৷”

মিশ্র ফ্লিটের কারণে যে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ওয়াহেদুল আলমও তা বললেন, তবে বিমান সেটা সামাল দিতে পারবে বলেই তার বিশ্বাস।

“আমাদের বিমানের মত ছোট ফ্লিট, যাদের ১০টা, ২০টা বা ৫০টা এয়ারক্রাফট আছে, তাদের জন্য মিক্সড ফ্লিট করাটা খুব ডিফিকাল্ট হয়। তবে বিমানে এক সময় মিক্সড ফ্লিট ছিল। এখানে একই সঙ্গে এয়ারবাস এ৩১০ ও ডিসি ১০ এর মতো উড়োজাহাজ একই সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে। সুতরাং বিমানের কিছু অভিজ্ঞতা আছে মিক্সড ফ্লিটের, এটা বলাই যায়।

“আর এয়ারবাসের যে বক্তব্য আমরা বুঝতে পেরেছি, যে নতুন যে উড়োজাহাজগুলো কেনার উদ্যোগ চলছে সেগুলো ডেলিভারি হতে ৫ থেকে ১০ বছর লাগবে। ততোদিনে তো এই (এখন চলমান) বোয়িং এয়ারক্রাফটগুলো ফেইজ আউট করার সময় হয়ে যাবে। বিমানের যে বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজগুলোর বয়স অলরেডি ১২ বছর চলছে। আর পাঁচ-সাত বছর পর হয়ত এগুলোর আর লাইফ থাকবে না, ফেইজ আউট করতে হবে। কাজেই তখন এয়ারবাসগুলো বহরে যুক্ত হলে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না।”

চওড়া উড়োজাহাজ কতটা জরুরি

বহর ছোট হলেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার ওয়াইড বডি উড়োজাহাজগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। এরপরও কেন ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ কেনার কথাই বলছে এয়ারবাস?

কোম্পানির বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোরাদ বোঁফালা বলছেন, কয়েকদিন আগেই ঢাকার বিমানবন্দরের একটি নতুন টার্মিনাল উদ্বোধন হয়েছে। তাতে বছরে যাত্রী সেবা দেওয়ার ক্ষমতা এক লাফে আট মিলিয়ন থেকে ২০ মিলিয়ন হয়ে গেছে। আর যাত্রী চাহিদা বেড়েছে বলেই বাংলাদেশ নতুন টার্মিনাল খুলেছে।

এয়ারবাসের ওয়াইডবডি মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর রদ্রিগো লেজামা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রীর যে প্রবাহ, তা স্পষ্টভাবেই ওয়াইড বডি উড়োজাহাজের চাহিদার কথা বলে।

“তাই আমরা মনে করছি, প্রশস্ত বডির উড়োজাহাজ ব্যবহারই বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য সর্বাধিক লাভজনক হতে পারে। বাংলাদেশের ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স তাদের বহরে প্রথমবারের মত ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ সংযোজন করছে এবং তারা এয়ারবাসকেই বেছে নিয়েছে।

“এয়ারলাইন্স এবং অপারেটরগুলো বুঝে গেছে যে প্রবৃদ্ধির জন্য ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় অনেক বাংলাদেশি থাকছে। এই মার্কেটগুলোকে ধরতে নতুন নতুন উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে।”

তবে বাংলাদেশের এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল বলছেন, এয়ারবাসের যে এয়ারক্রাফটগুলো (এ৩৫০) কেনার কথা চলছে, সেগুলো অনেক বড় এয়ারক্রাফট। এগুলোর যাত্রী ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৪০০।

“এই মুহূর্তে হজ মৌসুম ছাড়া বিমানের এমন কোন রুট নেই যেটাতে ৪০০ যাত্রী নিয়মিত নিতে পারে। কিন্তু শুধু হজযাত্রী বহন করলেই তো হবে না, সারা বছর এই এয়ারক্রাফটগুলোকে চালু রাখতে হবে। আমরা যদি রুট নেটওয়ার্ক বাড়াতে না পারি, নতুন নতুন গন্তব্যে রিচ করতে না পারি, এয়ারলাইনগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপ না করতে পারি, তাহলে হবে না।

“নেটওয়ার্ক তৈরি না করে বাংলাদেশের জন্য বড় এয়ারক্রাফট আনলে আমরা কাজে লাগাতে পারব না। আমরা তখন এগুলোকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-দুবাই, ঢাকা-সিলেট-লন্ডন এভাবে চালিয়ে এদের লাইফস্প্যানে অর্ধেকে নামিয়ে আনব। বিমানের যাওয়া উচিৎ মিড রেঞ্জের এয়ারক্রাফটের দিকে। এয়ারবাসেরই ‘এ ৩২০ নিও’ একটা আছে। ওটা দিয়ে দূর পাল্লার ফ্লাইটও চালানো যায়।”

কাজী ওয়াহেদুল বলেন, ২০০ থেকে ২৩০ ধারণ ক্ষমতার এয়ারক্রাফট এখন বিমানের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হতে পারে। এর বেশি হলে বিমানের পক্ষে যাত্রী আনা সম্ভব না, তাদের সেই মার্কেটিং দক্ষতা বা নেটওয়ার্ক নেই। ওয়াইড বডি এয়ারক্রাফট নিয়ে কাজে লাগাতে না পারলে সেটা ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

“এখন বিমানকে তার নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। অর্থাৎ একজন যাত্রী বিমানে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেন ইউরোপ, আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশে যেতে পারে, বিমানকে সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। সার্ভাইভ করতে হলে ওয়াইড নেটওয়ার্ক ছাড়া গতি নেই। বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের সঙ্গে পার্টনারশিপে যেতে হবে। কিন্তু এসব আন্তর্জাতিক ‘অ্যারো পলিটিক্যাল ইস্যু’ ডিল করার জন্য আমাদের যে ধরনের লোকবল থাকার দরকার বিমানের সে ধরনের লোকও নেই।”

এয়ারবাসের আরও পরিকল্পনা

এয়ারবাসের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু উড়োজাহাজ সরবরাহ নয়, পাইলট ও মেকানিকসহ দক্ষ জনবল তৈরি এবং নতুন রুট পেতেও তারা বাংলাদেশকে সাহায্য করতে চায়।

এয়ারবাসের কর্মকর্তা মোরাদ বোঁফালা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে পাইলট ও মেকানিকসহ এই খাতের দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়তা করা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজির অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আমরা পার্টনারশিপ করছি। গ্রাহক এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যবসা বিস্তারের জন্য আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করি।

“বিমানের সঙ্গে আমাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইউএস বাংলা এবং বিসমিল্লাহ এয়ারলাইন্স, যারা আমাদের থেকে একটি এ৩২১ কার্গো উড়োজাহাজ কিনছে, তাদেরও আমরা সহায়তা করার চেষ্টা করছি।”

এয়ারবাসের তিন কোম্পানি এয়ারবাস, এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এবং এয়ারবাস হেলিকপ্টারের কাছে বর্তমানে ৪৪৯ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার রয়েছে, যা বাংলাদেশের জিডিপির সমান। ২০২২ সালে এয়ারবাস ৫৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

এ পর্যন্ত ২২ হাজার ৮০২টি উড়োজাহাজ তারা বিক্রি করেছে বিশ্বব্যাপী চার শতাধিক ক্রেতার কাছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৪ হাজার ৮৪৩টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে পেরেছে এয়ারবাস। বাকিগুলো তৈরির কাজ চলছে।

Also Read: এক দশকে বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রী বেড়ে দ্বিগুণ হবে, বোয়িংয়ের পূর্বাভাস

Also Read: বাংলাদেশের কাছে উড়োজাহাজ বেচতে চায় এয়ারবাস