টানা ৮ মাস পর পতন থামল রপ্তানির, এপ্রিলে ৩৩% উল্লম্ফন
এপ্রিলের আয়ে ভর করে গত অগাস্টের পর প্রবৃদ্ধি হলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মাসের আয়ের নেতিবাচক ধারা কাটেনি।
টানা আট মাস কমার পর বেড়েছে রপ্তানি আয়। একক মাসে গত এপ্রিলে এ খাতের আয়ে উল্লম্ফনও হয়েছে; আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।
বিদেশে পণ্য রপ্তানি থেকে সদ্য শেষ হওয়া এপ্রিলে আয় এসেছে প্রায় ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই মাসে ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার আয় আসে।
রোববার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রকাশিত রপ্তানি আয়ের তথ্যে দেখা যায়, এপ্রিলের আয়ের ওপর ভর করে গত অগাস্টের পর রপ্তানি আয়ে পতন থেমেছে। তবে এরপরও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মাসের আয়ের নেতিবাচক ধারা কাটেনি।
সবশেষ তথ্য বলছে, জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট ৩৯৩৯ কোটি ৬৪ লাখ (৩৯.৩৯ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৪০২০ কোটি ৮১ লাখ (৪০.২১ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবে ১০ মাসে আয় কমেছে ২ শতাংশের বেশি।
বরাবরের মত রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক খাতের উপর ভর করে এপ্রিলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মোট ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার আয়ের মধ্যে পোশাক থেকে এসেছে ৩১৪ কোটি ডলার; যা গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরের এপ্রিলের মোট ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের মধ্যে পোশাক থেকে এসেছিল ২৩৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলার।
ধারার বিপরীতে এপ্রিলে রপ্তানি আয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিষয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ড্রাস্টির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত দুটি কারণে এপ্রিলে রপ্তানি আয় বেড়েছে। প্রথমত, এপ্রিল মাস আমাদের পোশাকের ভরা মৌসুম ছিল। ক্রেতাদের চাহিদা বেশি ছিল; রপ্তানিও বেশি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের এপ্রিলের ১০ দিনের মতো ছিল রোজার ঈদের ছুটি; ওই কয়দিন কারখানা বন্ধ ছিল; উৎপাদন হয়নি। তাই রপ্তানি কম হয়েছিল।
“এই এপ্রিলে যে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেটা কিন্তু গত বছরের এপ্রিলের কম রপ্তানির উপর প্রবৃদ্ধি হয়েছে।”
তবে মে মাসে আবারও রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান পারভেজ বলেন, “কোরবানির ঈদের কারণে চলতি মে মাসে ১০ দিনের মতো কারখানা বন্ধ থাকবে। যুদ্ধের ধাক্কা তো রয়েছেই; সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে রপ্তানি আয় বাড়বে¬–এমনটা আশা করা যাচ্ছে না।”
চলতি অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় উল্লম্ফন নিয়েই শুরু হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৭৭ কোটি ডলার আয় হয়, যা ছিল আগের অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি।
তবে দ্বিতীয় মাস অগাস্টে এসেই হোঁচট খায় রপ্তানি। ওই মাসে আয় আসে ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ (৩.৯১ বিলিয়ন) ডলার। আগের বছরের অগাস্টের চেয়ে তা ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ কম ছিল। এরপর থেকে গত মার্চ পর্যন্ত টানা কমে রপ্তানি আয়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় নবম মাস মার্চেই।
ওই মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ (৩.৪৮ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ কম।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ হাজার ৫০০ কোটি (৫৫ বিলিয়ন) ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করে অন্তবর্তী সরকার।
চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ে টানা নেতিবাচক ধারার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ট্রাম্পের সম্পূরক শুল্ক আরোপ নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। ওই বছর ৩১ জুলাই বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক এড়াতে জুলাই মাসে অনেক পণ্য জাহাজীকরণ করেন রপ্তানিকারকরা। স্থগিত থাকা অনেক পণ্যও রপ্তানি করেন। সে কারণে ওই মাসে রপ্তানি অনেক বেড়েছিল।
এরপর ৭ অগাস্ট থেকে ট্রাম্পের শুল্ক কার্যকর হয় বাংলাদেশে। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক ঘোষণা করেন। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ।
প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় দুশ্চিন্তামুক্ত হন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। একই সঙ্গে চীন ও ভারতের পণ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন এর সুফল বাংলাদেশ পাবে। তার লক্ষণও দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে, সেগুলোর অনেকেই বাড়তি ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছিল। তবে রপ্তানির আয়ে দেখা যায় উল্টো চিত্র। রপ্তানি না বেড়ে উল্টো কমতে থাকে।
পোশাক থেকেই ৭৮.৩২%
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। এপ্রিলে এ খাত থেকে ৩১৪ কোটি ৯ লাখ ডলার আয় হয়েছে। এ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ৪০০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। এ হিসাবে, এপ্রিলে মোট রপ্তানি আয়ের ৭৮ দশমিক ৩২ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।
এরমধ্যে নিট পোশাক থেকে আয় হয়েছে ১৭০ কোটি ডলার; গত বছরের এপ্রিলে চেয়ে যা ৩০ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ বেশি। আর ওভেন পোশাক থেকে আয় বেড়েছে ৩২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আয় এসেছে ১৪২ কোটি ডলার।
অর্থবছরের ১০ মাসের (জুলাই-এপ্রিল) হিসাবে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৫১ শতাংশ এসেছে পোশাক খাত থেকে।
অন্যান্য খাত
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে তথ্যে দেখা যায়, শুধু তৈরি পোশাক নয়, অন্য সব খাতেও বেড়েছে। মার্চে কৃষি পণ্য রপ্তানি থেকে ৮ কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার আয় হয়েছে। বেড়েছে ৬৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এ মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এপ্রিলে এ পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৯২ লাখ ডলার। আগের বছরের এপ্রিলে এ অঙ্ক ছিল ৮ কোটি ৫ লাখ ডলার।
এপ্রিলে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ১০০ দশমিক ৬৭ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এছাড়া হোম টেক্সটাইল রপ্তানি থেকে আয় বেড়েছে ৪৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
