Published : 04 Jul 2026, 07:37 AM
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শনিবার সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে খামেনির জন্য দোয়া করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন।
পরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির উচ্চপদস্থ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষে ইরানি জাতির প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন।
সেখানে রাখা শোক বইতেও স্বাক্ষর করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার শুরুতে নিজ বাসভবনে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ব্যাপক হামলার মধ্যে ইরানও পশ্চিম এশিয়ার আরবদেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায়। মার্কিন ঘাঁটি থাকার কারণে ওই দেশগুলোকে হামলার ‘বৈধ টার্গেট’ হিসাবে বর্ণনা করে তেহরান।
সে সময় বাংলাদেশের অবস্থান ঘিরে সমালোচনা হয়। হামলার শুরুর পরদিন এক বিবৃতিতে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানালেও তাতে ইরানের ওপর হামলার প্রসঙ্গ রাখেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার বিষয়েও কিছু বলা হয়নি ওই বিবৃতিতে।
এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পরদিন ২ মার্চ আরেক বিবৃতিতে খামেনি মৃ্ত্যুতে ‘মর্মাহত’ হওয়ার কথা বলে ঢাকা। তবে সেখানে তাকে হত্যার নিন্দা জানানো হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই বিবৃতিতে বলেছিল, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির লঙ্ঘন করে এক ‘টার্গেটেড হামলায়’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের কথা জেনে সরকার মর্মাহত। ইরানের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি আন্তরিক শোক জানাচ্ছে সরকার।
“বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, সংঘাতের মাধ্যমে কোনো সমাধান আসে না। কেবল সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হতে পারে।”
সরকারের এমন অবস্থানের মধ্যে ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমি জাহানাবাদী বলেছিলেন, ঢাকার কাছে তেহরান কোনো ‘যুদ্ধের রসদ’ চায় না, কেবল ‘আক্রান্ত হিসেবে সমর্থন’ চায়।
এরপর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছিল। ইরানের পাল্টা হামলার মধ্যে ‘সংহতি’ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা চিঠি নিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে গেছেন তার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
তেহরানে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের সঙ্গে সাক্ষাতে শুক্রবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন।
দুই স্পিকারের সাক্ষাতের খবর দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায় জানাতে ছয় দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ইরান সরকার। শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় রাখা হয়েছে খামেনির মরদেহ; শনিবার তার জানাজা হবে।
ছয়দিনের এই আনুষ্ঠানিকতা শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে শুরু হবে তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায়। রোববার বিকাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।
খামেনির কফিনবন্দি মরদেহ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় একটি উঁচু স্থানে রাখা হবে তিনদিন। তার পাশাপাশি রাখা হবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের কফিনও।
আগামী ৯ জুলাই জন্মস্থান মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে। খামেনির দাফন প্রথমে মার্চ মাসে হওয়ার কথা থাকলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা স্থগিত করা হয়েছিল।
কলিবফকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার আগে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন হাফিজ উদ্দিন।
বৈঠকে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ‘নির্মম হত্যাকাণ্ডের’ নিন্দা জানান। একই সঙ্গে ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যকার শতাব্দী প্রাচীন বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত শান্তি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে কলিবফের ভূমিকার প্রশংসাও করেন বাংলাদেশের স্পিকার।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই চুক্তি ইরানসহ পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি আনবে। বাংলাদেশ এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য ইরানের স্পিকার কলিবফকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে হাফিজ উদ্দিন।
খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে বৃহস্পতিবার তেহরানে যান স্পিকার। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ইরানের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি বাবাই।
ক্রিকেটে বাংলাদেশের সহায়তা চায় ইরান
সংসদ সচিবালয় বলছে, তেহরান সফরে ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দুনিয়ামালীর সঙ্গেও বৈঠক করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন।
বৈঠকে ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী তার দেশে ক্রিকেটের উন্নয়নে বাংলাদেশের সহায়তা চান। দুই দেশের মধ্যে খেলাধুলায় সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
স্পিকার বলেছেন, তিনি বিষয়টি বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন।
পরে ইরান রেডিওর বাংলা বিভাগে সাক্ষাৎকার দেন স্পিকার। সেখানে বাংলাদেশ-ইরান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
ইরানে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের সেবা বাড়াতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানোর কথাও তিনি বলেন বলে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
ইরানে খামেনির মরদেহ গ্র্যান্ড মোসাল্লায়, শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি