Published : 09 Jun 2026, 11:12 PM
মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে আসছে নতুন অর্থবছর। এত চাপ সামলাতে কী পরিকল্পনা থাকছে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে?
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পুঞ্জীভূত সমস্যা নিয়ে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে বর্তমান সরকার। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সরকার যে পরিকল্পনা সাজিয়েছে, তার কেন্দ্রে থাকছে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ইনসাইড আউটে এসে তিনি এমন এক অর্থনৈতিক দর্শনের কথা বলেছেন, যেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হারকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে না দেখে মানুষের জীবনে কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা দিয়েও বিচার করা হবে।
আগামী ১১ জুন নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর এটাই হবে প্রথম বাজেট।
ইনসাইড আউটে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিয়ে কথা বললেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “সবার প্রশ্ন, সেটা হচ্ছে কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে? কারণ আমাদের সবার তো মানবিক মর্যাদা নিয়ে, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের কর্মসংস্থান দরকার।”

‘দুর্ভাগ্যজনক সময়ে’ দায়িত্ব
তিতুমীর বলেন, সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে যখন দীর্ঘদিনের বহু সমস্যা একসঙ্গে সামনে এসেছে।
“আমরা একটা দুর্ভাগ্যজনক সময়ে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এবং উত্তরাধিকারসূত্রে এই পুঞ্জীভূত সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের বাধ্য হয়ে ঘাড় পেতে নিতে হয়েছে।”
তার দাবি, জনগণ এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার ‘সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেই’ বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে।
তিতুমীর বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে সরকার কোনো সংকট অস্বীকার করেনি। বরং চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো মোকাবেলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
“অতীতের অস্বীকৃতির সংস্কৃতির বাইরে চ্যালেঞ্জগুলো আমরা জানি এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেগুলো ইশতেহারে বলা হয়েছে।”
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক থেকেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক চাপে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সেজন্য কৃষক, মৎস্যজীবী ও খামারিদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা পতিত সরকারের থেকে সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্রে একেবারে ঋণাত্মক; ঋণাত্মক না, রোগাক্রান্ত একটা আইসিইউতে যাওয়া একটা অর্থনীতি পেয়েছি।”
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিতুমীর ‘থ্রি আর’ কৌশলের কথা বলেন। তার ভাষায়, ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন’-এই তিন ধাপে অর্থনীতির পুনর্গঠন করতে হবে। প্রথম ধাপে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা হবে, দ্বিতীয় ধাপে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হবে এবং তৃতীয় ধাপে পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি তৈরি করা হবে।
সে কারণে সরকার প্রচলিত পাঁচসালা পরিকল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ গ্রহণ করছে বলে জানান তিনি।
ভাতা নয়, ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’
মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে ‘বড় উদ্যোগ’ হিসেবে তুলে ধরছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তবে তিনি এটিকে প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা সোশাল সেইফটি নেটের আদলে দেখতে রাজি নন।
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা জালের ধারণায় ধরে নেওয়া হয় কিছু মানুষ পিছিয়ে পড়বে এবং পরে তাদেরকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে মানুষ পিছিয়ে না পড়ে।
তার মতে, অতীতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নানা সংকটের কারণে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে।
ফলে শুধু ভাতা নয়, বরং ‘সর্বজনীন পূর্ণ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয়’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগের এই অধ্যাপক।
এই কাঠামোর মধ্যে প্রসূতি মা, শিশু, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক মানুষ ও বিধবা নারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি।
তিতুমীরের মতে, দারিদ্র্য শুধু আয়ের প্রশ্ন নয়। দারিদ্র্যের রূপ ‘বহুমাত্রিক’। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুযোগের সঙ্গেও দারিদ্র্যের সম্পর্ক রয়েছে।
রাজনৈতিক তালিকার বদলে তথ্যভিত্তিক নির্বাচন
অতীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ‘রাজনৈতিক অনিয়মের’ সমালোচনাও করেন তিতুমীর।
তার ভাষ্য, “যাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তারা কখনো তালিকাভুক্ত হন নাই। আর যাদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ছিল না, তারা রাজনৈতিক কারণে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।”
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ‘নতুন পদ্ধতি’ নেওয়ার কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে পোভার্টি মিন্স টেস্টে স্কোরিংয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়েছে।”
বর্তমানে কর্মসূচিটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে আগামী বাজেটে এর পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেন তিতুমীর।
নারীর ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিবারকে কেন্দ্র করেই সামাজিক সুরক্ষার এই কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
কৃষক কার্ডে উৎপাদনের দর্শন
কৃষক কার্ড কর্মসূচিকেও সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তার ভাষ্য, কৃষকদের শুধু ভর্তুকি বা সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে না দেখে উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে বর্তমান সরকার।
“আমরাই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষকদের মর্যাদা দিয়েছি। ব্যাংক কৃষকের কাছে গিয়ে হিসাব খুলে দিয়েছে এবং কৃষক কার্ড দিয়েছে।”
উপদেষ্টা বলেন, কৃষকদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা এবং উৎপাদনকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখা এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
মূল্যস্ফীতির পেছনে ‘দুই চাপ’
মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিতুমীর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ‘দুটি বড় কারণ’ রয়েছে।
প্রথমত, অতীত সরকারের সময় থেকে চলে আসা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপ।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ার সংকট ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা।
বর্তমান সরকার প্রলম্বিত মূল্যস্ফীতি ‘উত্তরাধিকার সূত্রে’ পেয়েছে বলে দাবি করেন উপদেষ্টা।
আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলেও দেশের বাজারে অনেক সময় ‘প্রভাবশালী গোষ্ঠী’ যে দাম নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে কথাও তিনি বলেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দিকে ইংগিত করে তিতুমীর বলেন, “কিছু মানুষকে গোষ্ঠীতন্ত্র দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা টিকে থাকার জন্যই এ অলিগার্কিটা ছিল।”
তিতুমীর বলেন, যখন কৃষিপণ্যের উৎপাদন ভালো ছিল, তখনও মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে। এটা বাজারের ‘কাঠামোগত সমস্যারই’ ইঙ্গিত।

‘প্রাইস টেকার’ নয়, ‘প্রাইস মেকার’
বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, ব্যবসায়ী মুনাফা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না এবং ভোক্তা ন্যায্য দামে পণ্য পাচ্ছেন কি না।
তার ভাষ্য, দেশের বাজার কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে ‘বিকৃতি’ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আমদানি পর্যায়ে কিছু গোষ্ঠী অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করেছে।
“বাজার যদি বাজারের মত কাজ করত, তাহলে ব্যবসায়ীরা বা আমদানিকারকরা মার্কেট প্রাইস ‘মেকার’ হতেন না, তারা প্রাইস ‘টেকার’ হতেন। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা ঘটেছে।”
উপদেষ্টা বলেন, “জ্বালানি খাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাজারে এই ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়েছে এবং সরকার সেগুলো কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।”
উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যচাপ কমানোর পরিকল্পনা
মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তিতুমীর। তিনি রাইস ব্র্যান অয়েল ও সূর্যমুখী চাষের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে মূল্যচাপও কমবে।
“স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকবে, একই সঙ্গে আমাদের যে দাম বাড়ার প্রবণতা বা আমদানি নির্ভরতার বদলে স্বনির্ভরতার একটা সুযোগ রয়ে যাবে।”
তার মতে, ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে শুধু দাম নয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যের গুণগত মানের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
“ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা যায়। আবার একই সঙ্গে দেশীয় যারা উদ্যোক্তা এবং দেশীয় যারা উৎপাদক তারাও যেন ন্যায্য মূল্য পান।”
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে পাঁচ স্তরের পরিকল্পনা
তিতুমীরের মূল্যায়ন হল, দেশে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় বড় ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলার মত কোনো কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।
“বাংলাদেশকে এমন এক আমদানিনির্ভর ও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছিল, যেখানে গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুদ, রিফাইনারি সক্ষমতা কিংবা জ্বালানি বৈচিত্র্য কোনোটিই পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি।”
ইরান যুদ্ধ ঘিরে পশ্চিম এশিয়ার চলমান অস্থিরতা সেই দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যদি আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাটা থাকত, ব্যবস্থা থাকত, তাহলে তো মূল্যস্ফীতি ঘটত না।”
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকার জ্বালানি খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “আমাদেরকে জ্বালানির ক্ষেত্রে মিক্সে যেতে হবে। অর্থাৎ আমার যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি থাকবে, তেমনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি থাকবে, তেমনি আণবিক শক্তির থেকেও জ্বালানি থাকবে।”
জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে বর্তমান পদ্ধতির পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়ে তিতুমীর বলেন, শুধু আমদানি ব্যয় বা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নয়, মানুষের আয় ও ব্যবহারক্ষমতার সঙ্গেও মূল্য কাঠামোর সম্পর্ক থাকতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কথাও বলেন তিতুমীর। সেজন্য বাপেক্সকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আনার ওপর তিনি জোর দিচ্ছেন।
খাদ্য নিরাপত্তার মত জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মজুদ সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিতুমীর। তিনি বলেন, “আমাদের মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে একটা এনার্জি স্ট্র্যাটেজিক হাব বানাতে হবে, যাতে করে আমাদের কৌশলগত মজুদ নিশ্চিত থাকে।”
সৌর বিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিনির্ভর না হয়ে দেশেই উৎপাদিত হলে নতুন শিল্প খাত ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন উপদেষ্টা।
পরিবহন ব্যয়কে মূল্যস্ফীতির একটি উৎস হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ কমবে।
এডিপির ‘দুই রোগ’
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিতুমীর। তার মতে, এডিপি দীর্ঘদিন ধরে দুই ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত।
একটি হচ্ছে বারবার প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়ানোর সংস্কৃতি। অন্যটি হল সারা বছর কাজ না করে অর্থবছরের শেষে এসে তড়িঘড়ি করা, যা তার ভাষায় ‘জুন সিনড্রোম’।
প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়ে এসেছে বলেও মনে করেন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “বারবার প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছিল। এমন সব দাম ছিল, বালিশ কাণ্ড শুধু না, সর্বত্রই বালিশ কাণ্ড ছিল।”
এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শুধু সামষ্টিক অর্থনীতি বা খাতভিত্তিক কৌশল নয়, উন্নয়ন কর্মসূচি কীভাবে নেওয়া হবে, বাস্তবায়ন হবে, পরিবীক্ষণ হবে এবং মূল্যায়ন হবে, তারও সংস্কার প্রয়োজন।
সেজন্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথা তিনি বলেন, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়।
উপদেষ্টা বলেন, আগামী বছরও সরকারের ব্যয়ের একটি বড় অংশ অতীত সরকারের সময় নেওয়া প্রকল্পে যাবে, কারণ সেসব প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত এবং চলমান। তবে যেসব প্রকল্পে বাস্তবায়ন কম হয়েছে বা নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই, সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা
তিতুমীর বলেন, আগামী বছরগুলোতে সরকারের ব্যয়ের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হবে।
“পরিচালন ব্যয় আস্তে আস্তে কমানো হবে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আস্তে আস্তে বাড়ানো হবে।”
তিনি মনে করেন, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার যদি বাড়ে, তাহলেই দেশজ উৎপাদন বাড়বে।
বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “৪ বা ৪ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে জুনের শেষে, এটা তো অনেক নিচে।”
শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা
কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎপাদনমুখী শিল্পায়নে জোর দিয়ে তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে, কেননা তার ভাষায়, কর্মসংস্থান তৈরির সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন।
তিনি বলেন, অতীতে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ কমেছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং তার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।
“আমাদের বেকারত্ব বেড়েছে, যুব বেকারত্ব বেড়েছে, নারী বেকারত্ব বেড়েছে।”
নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কমে যাওয়াকে ‘ডি-ফেমিনাইজেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেন উন্নয়ন অধ্যায়নের এই শিক্ষক।
তার ভাষ্য, “এটি অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কারণ নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল।”
কর্মসংস্থানের প্রশ্নে জনসংখ্যাগত বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন তিতুমীর। তার মতে, বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগাতে সরকারগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
একই সঙ্গে ‘লনজিভিটি ডিভিডেন্ড’ ধারণার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের গড় আয়ু বাড়ার ফলে যে অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটিকেও অর্থনীতির সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
“ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড, লনজিভিটি ডিভিডেন্ড, ইকোনমিক ডেমোক্রেটাইজেশন এবং ডেমোক্রেটিক ডিভিডেন্ডকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে।”
কোন খাতগুলো অগ্রাধিকার পাবে
শিল্পায়নের অংশ হিসেবে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকস, শিশু খেলনা ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন তিতুমীর।
তিনি বলেন, “এইখানে বাজেটে একটা বড় রকমের পরিবর্তন দেখা যাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে।”
রপ্তানি সুবিধার ক্ষেত্রেও সমতা আনার কথা বলেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “যারাই রপ্তানি করবে, তারাই একই রকম সুবিধা পাবে।”
বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণার কথাও বলেন তিতুমীর।
রাজস্ব নীতি, মুদ্রানীতি ও শিল্পনীতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ‘সমন্বয়ের অভাব ছিল’ মন্তব্য করে সেখানে সমন্বয় আনার চেষ্টার কথা বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, উৎপাদন, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও কর্মসংস্থানকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে বর্তমান সরকার।
জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা
জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে সরকারের বড় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন তিতুমীর। তিনি যুক্তরাজ্যের আদলে জেনারেল প্র্যাকটিশনারভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধারণার কথা বলেন।
তার ভাষ্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী না করলে স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যেই তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিতুমীরের মতে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট শুধু অর্থের নয়, ব্যবস্থাপনারও। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামো থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
“অ্যাম্বুলেন্স থাকে, অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার নেই, এক্স-রে মেশিন থাকলে এক্স-রে মেশিন চালানোর টেকনিশিয়ান নেই।”
শিশুস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, ফিজিওথেরাপি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
শুধু শয্যা বাড়ানো নয়, জেলা পর্যায়ে করোনারি কেয়ার ইউনিট, ডায়ালাইসিস সেন্টার, জটিল মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ও ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলার কথাও বলেন উপদেষ্টা।

‘স্কিলড বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যের পর শিক্ষা খাতকে দ্বিতীয় বড় রূপান্তরের ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন তিতুমীর। তার মতে, দেশে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে।
“ইলেকট্রিশিয়ান পাওয়া যায়? রাজমিস্ত্রি পাওয়া যায়? কাঠমিস্ত্রি পাওয়া যায়? পাওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বড় ধরনের অমিল তৈরি হয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশি জনবল নিয়ে কাজ করছে, অথচ দেশের তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।
বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিতুমীর। তিনি বলেন, “একজন শ্রমিক যদি একটা দক্ষতা নিয়ে যায় তার দাম হবে, তার যে চাকরির মজুরি হবে সেটা তো অনেক বেশি হবে।”
উপদেষ্টার মতে, ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে–দক্ষতা, উদ্ভাবন ও নাগরিকত্ব। তার ভাষায়, “জনগণ করের আয় শিক্ষায় দেয় নাগরিক তৈরি করার জন্যে।”
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণায় জোর দিয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয় নাই যেটি আসলে টিচিং ইউনিভার্সিটি থেকে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়।”
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে তিতুমীর বলেন, “ধারাবাহিকভাবে আমরা ৫ শতাংশের দিকে যাব, মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ ব্যয় করা হবে।”
তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দ ব্যবহারের সক্ষমতাও যে বাড়াতে হবে, সে কথাও উপদেষ্টা বলেন।
আইএমএফের কিস্তি ও সংস্কার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিতুমীর বলেন, সরকার সংস্কারের বিরোধী নয়। তবে সেই সংস্কার হবে জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে। তার অভিযোগ, আগের সরকার অর্থনীতিকে ‘ঋণনির্ভর’ করে তুলেছিল।
“মাদকাসক্তি যেমন আছে, তেমন পতিত সরকারের ছিল ঋণাসক্তি। তাদের সময়কালে ৩২২ শতাংশ ঋণ বেড়েছে এবং সেগুলো আমাদের ঘাড়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে।”
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের নিজস্ব নীতি কাঠামো রয়েছে এবং সেই কাঠামোর ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা হবে।
সেইসঙ্গে এআইআইবি, এডিবি এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের ‘আস্থার’ কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “এডিবির প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার সম্ভাবনার বলেছেন।”
‘সিগনেচার প্রজেক্ট’ ও নতুন রাষ্ট্রদর্শন
তিতুমীর বলছেন, সরকারের কয়েকটি ‘সিগনেচার প্রজেক্ট’ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ণ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, উৎপাদনমুখী শিল্পায়ন, জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্কিলড বাংলাদেশ এবং পানি সম্পদ পরিকল্পনা।
তার ভাষ্য, এসব উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একই অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা ধাক্কা সামলাবে, শিল্পায়ন কর্মসংস্থান তৈরি করবে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেন তিতুমীর। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনেক গল্প হয়েছে, আমরা ভিক্টিমহুড দেখিয়েছি, আবার জীবাশ্ম জ্বালানি বাড়িয়েছি।”
জলবায়ু অভিযোজন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ, হাওর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার কথা বলেন।
খাল পুনর্খনন, নদী পুনরুদ্ধার, কার্বন ক্রেডিট, পিঙ্ক বাস, ইলেকট্রিক বাস এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা।