রোহিঙ্গা স্বপ্নের ছবি ভাসানচরের দেয়ালে

রোহিঙ্গাদের জীবনের গল্প নিয়ে নোয়াখালীর ভাসানচরে আঁকা হয়েছে ১৭০ ফুট লম্বা দেয়ালচিত্র।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Nov 2022, 07:49 AM
Updated : 24 Nov 2022, 07:49 AM

সাগরের উচ্ছ্বল ঢেউয়ের মাঝে চলেছে নৌকা, কখনও ভেসে উঠছে ডলফিন, ঢেউ ভেদ করে চলা সেই নৌকার যাত্রীদের হাতে আবার জীবনের বই; মাতৃভূমিথেকে বিতাড়িত শিশু-কিশোরীরা এভাবেই নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর বাড়ি ফেরার স্বপ্ন আঁকলো রঙ-তুলিতে।

নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গা শিবিরে ১৭০ ফুট লম্বা দেয়ালচিত্রে এমনই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। যেসব রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা কখনও রঙ-তুলি হাতে নেয়নি, একজন শিল্পীর সঙ্গে তারাই যোগ দিয়েছে সেই শিল্পকর্মের কাজে।

কমিউনিটি পর্যায়ে চিত্রকর্মের মাধ্যমে নানা গল্প তুলে ধরা প্রতিষ্ঠান আর্টোল্যুশনের কার্টুনিস্ট সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময় এ দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের উৎকণ্ঠার জীবন আর দেশে ফেরার ব্যাকুলতা তুলে ধরেছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশ দপ্তরে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সম্প্রতি ভাসান চরে আশ্রিত শরণার্থীদের সঙ্গে তিনি দেখা করেন। তাদের জীবনের গল্প শোনেন। আর মিয়ানমারের রাখাইনে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখতে পান।

তন্ময় বলেন, “ভাসানচরের রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের হাতে রঙ তুলি তুলে দিয়েছিলাম আমরা। তখন দেখা গেল তারা বেশিরভাগই নৌকা বা অন্যান্য পরিবহনের ছবি আঁকছে। নৌকা আঁকার কারণ জিজ্ঞেস করায় তারা জানালো, নৌকায় চড়ে কেউ মিয়ানমারে নিজ বাসভূমি ফিরতে চায়, আবার কেউ কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে ফেলে আসা তাদের স্বজনদের কাছে যেতে চায়। তাই তাদের মানসপটে নৌকাটাই সবার আগে ভেসে আসে।”

সংবাদ সম্মলেনে জানানো হয়, আর্টোল্যুশন কক্সবাজারেও ১৭টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ করছে। শরণার্থীরা এই ছবিগুলোর মাধ্যমে তাদের আত্মপরিচয়, তাদের দুঃসহ অতীত, বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছে।

ভাসানচরে কাজ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তন্ময় বলেন, “চিন্তা করুন কিছু শিশুর কথা, যারা জীবনে কখনও রঙ বা তুলি ধরেনি। আবার ওরাই সবাই মিলে আমাকে সাহায্য করেছে ১৭০ ফুট দীর্ঘ পেইন্টিং শেষ করতে। এই ম্যুরালটিতে খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে শরণার্থীদের অর্থবহ জীবন, আত্মপরিচয় এবং মানসিক শান্তির সন্ধান।”

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করার সময় নিজের শিল্পকর্মের চেয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষদের সেখানে বেশি যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়ার কথা জানান কার্টুনিস্ট তন্ময়।

“এসব চিত্রেকর্মে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যুক্ত করায় তাদের চাহিদা, কষ্ট, আশা ও স্বপ্নের কথা সেখানে উঠে এসেছে। আমরা যে ১৭০ ফুট দীর্ঘ চিত্রটি এঁকেছি সেখানে উদ্বাস্তু মানুষেরা তাদের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, আশা-আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তুলেছে। আমরা শুধু তাদের মধ্যে সেই আশার স্বপ্নটা জ্বালতে সাহায্য করেছি।”

রোহিঙ্গাদের নিয়ে সেই চিত্রকর্মটি তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে। তার মধ্যে একটি অংশ রোহিঙ্গাদের শিক্ষা আর বাল্যবিবাহ নিয়ে।

কার্টুনিস্ট তন্ময় বলেন, “আমি রোহিঙ্গা নারীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের কখন বিয়ে হয়েছে। কেউ সত্যিটা বলছিল না। একটা সময় যখন বলতে শুরু করে তখন দেখা যায়, কারও বিয়ে হয়েছে ১৩ বছরে, কারও ১২ বছরে। তখন আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি পড়াশোনা একজন নারীকে মুক্তি দিতে পারে।

“পরে চিত্রকর্মটি আঁকার সময় দেখা যায় এক রোহিঙ্গা কিশোরী বইকে তার ডানা হিসেবে তুলে ধরেছে। পুরো চিত্রকর্মটি এমনভাবে আঁকা হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে মেয়েটি পড়ছে এবং কিছু হাত বিয়ের শাড়ি নিয়ে এসেও তাকে ধরতে পারছে না।”

ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টিটিভ ইয়োহানেস ভন ডার ক্লাও বলেন, “আর্টোল্যুশন ও আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিল্পের মাধ্যমে শরণার্থীদের মানসিক ক্ষতির প্রশমন। এই শরণার্থীরা অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছে। এরকম ছবিগুলো আঁকার মাধ্যমে তারা কিছুটা হলেও প্রশান্তি খুঁজে পায়।

“রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে তন্ময়কে একসঙ্গে এত সুন্দর কাজ করতে দেখে আমি আপ্লুত। হাসি আর কান্নার মাধ্যমে যখন শরণার্থীদের জীবনের গল্পগুলো উঠে আসছিল, আমরা আবারও বুঝতে পারছিলাম যে আমাদের সবারই একই ধরনের মানবিক আবেগ ও অনুভূতি রয়েছে। আর মানসিক স্বাস্থ্য ফেরাতে শিল্প একটি অসামান্য হাতিয়ার।”

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে ভন ডার ক্লাও বলেন, “রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে পাঠাতে হলে রাজনৈতিক সমাধান আসতে হবে। এজন্য আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়কে এক হয়ে এই সংকট সমাধানে কাজ করার আহ্বান জানাব। তবে যতদিন এই সমাধান না আসবে ততদিন এই শরণার্থীদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করে যেতে হবে।”

সংস্থাটির তরফ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী ভাসানচরে আছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু। ইতোমধ্যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, সুরক্ষা, পুষ্টি, পানি ও পয়ঃনিস্কাশনের মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মলেনে ইউএনএইচসিআররের আরেক প্রতিনিধি রেজিনা ডি লা পোর্টিলাও উপস্থিত ছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক