লোকালয়ে বাঘের আনাগোনার পেছনে খাবার সঙ্কট?

সুন্দরবনের পাশে জনবসতি গড়ে উঠেছে। নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বাঘসহ অন্য বন্যপ্রাণী খাবারের খোঁজে চলে আসছে লোকালয়ে।

মঈনুল হক চৌধুরীও শুভ্র শচীনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 July 2022, 07:17 PM
Updated : 28 July 2022, 07:17 PM

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা শরণখোলা উপজেলার খেজুরবাড়িয়া গ্রামে একটি বাঘের আনাগোনা টের পাচ্ছিলেন গ্রামবাসী। প্রায় এক সপ্তাহ বাঘটি লোকালয়ে ঘোরাফেরা করায় আতঙ্কে ছিলেন ওই গ্রামসহ চার গ্রামের মানুষ। শেষ পর্যন্ত অঘটনের কোনো খবর যদিও আসেনি।

ওই বাঘটি গ্রামে আসে ৫ মে। এরপর থেকেই গ্রামের বাসিন্দাদের থাকতে হয়েছে সতর্ক। বন ও লোকালয়ের মধ্যবর্তী ভোলা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বাঘ অনায়াসে লোকালয়ে চলে আসছে।

এর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ২৪ এপ্রিল সুন্দরবনের কাছে ঘাস খাওয়ার সময় শরণখোলার ধানসাগর গ্রামের আফজাল হাওলাদারের একটি গরু বাঘের আক্রমণে গুরুতর জখম হয়।

আর ৩১ মার্চ খালেরচরে ঘাস খাওয়ার সময় এ উপজেলার দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের সোবহান হাওলাদারের একটি মহিষকে আক্রমণ করে বাঘ।

সুন্দরবনের শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান এসব তথ্য জানিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবন থেকে শুধু বাঘ নয়; হরিণ, অজগর, কুমির ও বন্য শূকর লোকালয়ে চলে আসছে। পরে সেগুলো আবার বনে অবমুক্ত করছি আমরা।”

সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী এই কয়টি কাছাকাছি এলাকায় বাঘের আনাগোনার তথ্য এগুলো। এর বাইরেও সাম্প্রতিক সময়ে বাঘসহ অন্যান্য প্রাণী প্রায়ই বন পেরিয়ে গ্রামের কাছে কিংবা লোকালয়ে চলে আসছে।

২০২১ সালে মার্চে সুন্দরবনের ভোলা নদের ধুনচেবাড়িয়ার চর থেকে একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মৃতদেহ উদ্ধার করে বন বিভাগ। এরকম বিভিন্ন সময়েই লোকালয়ে বাঘের উপস্থিতির কথা জানান স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাবারের সন্ধান, বন-সংলগ্ন এলাকায় লোকালয় গড়ে ওঠা এবং বন ও লোকালয়ের মধ্যবর্তী নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে লোকালয়ে আসছে এসব বন্যপ্রাণী।

২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবসের আগে বাঘের লোকালয়ে আসার প্রবণতার বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট অ্যান্ড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক বলেন, “বনের ভেতরে মা বাঘ তার বাচ্চাদের একটা সময় তাড়িয়ে দেয়। তখন ওই বাচ্চার নতুন জায়গা দখলের বিষয় আসে। এক্ষেত্রে বাঘ বন থেকে লোকালয়ে আসতে পারে।

“আবার চোরাশিকারিরা বাঘের খাবার হরিণ তো মারছেই। এক্ষেত্রে বনে হরিণের সংখ্যা কমলে বাঘ লোকালয়ে আসবে- এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।“

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরীর মতে, বাঘের আবাসন এলাকায় মানুষের বিচরণ বেড়েছে। সুন্দরবন নির্ভরশীল পেশাজীবীরা বনজসম্পদ আহরণে অবাধে বনে প্রবেশ করছেন। ফলে বাঘও তার স্থান ত্যাগ করছে।

“বাঘ লোকালয়ে আসার জন্য খাদ্য সংকটও বড় কারণ। এজন্য একশ্রেণির চোরাশিকারিদের দায় তো আছেই,” বলেন তিনি।

অভিজ্ঞতা তুলে ধরে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবীর জানান, বাঘের প্রধান খাবার হরিণ, বন্য শুকর। বন ছেড়ে এসব প্রাণী লোকালয়ের কাছে আনাগোনা বাড়লে শিকারীরও বনের বাইরে যেতে হয়।

বাঘের বয়স ১২-১৩ বছর হলে তার শিকারি দাঁত পড়ে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, তখন হরিণ বা বন্য শূকর ধরলেও তা শেষ পর্যন্ত শিকার করতে পারে না, ছুটে যায়। তখন খাবারের সন্ধানে মাঝে মধ্যে বন-সংলগ্ন লোকালয়ে চলে যায়।

“আর বাঘের তাড়া খেয়ে অনেক সময় হরিণ ও বন্য শূকর লোকালয়ে চলে আসে। শূকর কচুর লতি বা এ জাতীয় খাবার পছন্দ করে। ওই খাবারের জন্যও মাঝে মধ্যে লোকালয়ে যায়।”

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় লোকালয় গড়ে উঠেছে। বন ও লোকালয়ের মধ্যবর্তী নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী সহজে লোকালয়ে চলে আসছে।

খুলনার সুন্দরবন অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির জানান, কিছুদিন পরপর সুন্দরবন থেকে বাঘ, হরিণ, অজগর, কুমির ও বন্য শূকর লোকালয়ে চলে আসছে। বনে খাবার সংকট ও লোকালয়ে সহজে শিকার ধরতে পারায় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসছে। বাঘের আক্রমণের শিকার হচ্ছে গরু-মহিষ।

বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসার এই প্রবণতা রোধে বন বিভাগকেই উদ্যোগ নিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “বনে প্রতিকূল পরিবেশ, পানি এবং মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণেও বন্যপ্রাণী আবাসস্থল ছেড়ে লোকালয়ে আসছে।”

উদ্যোগ কী

বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো জানান, সাম্প্রতিক সময়ে লোকালয়ের মধ্যে চলে এসে মানুষকে আক্রমণ করেছে এরকম ঘটনা খুব কম। বাঘের বিষয়টি হচ্ছে তারা মুভমেন্ট করে; কাছাকাছি আসতে পারে।

বাঘের খাবারের সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি সে রকম দেখিনি। কারণ, বনে প্রচুর হরিণ দেখা যায়, বন্যাপ্রাণী রয়েছে। পর্যটকরা যান তারাও দেখছেন। চোরাশিকারি আগেও ছিল; পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে এটা বলব না। এখন সবাই মিলে বাঘ সংরক্ষণে কাজ করতে হবে। এবারের বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্যও হচ্ছে- বাঘ আমাদের অহংকার, রক্ষার দায়িত্ব সবার।”

এবার বিশ্ব বাঘ দিবস পালিত হবে শুক্রবার। প্রতিবছর ২৯ জুলাই এ দিবস উদযাপন করা হয় দেশে-বিদেশে।

সবশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪।

তিন বছর মেয়াদি ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বন সংরক্ষক মিহির কুমার জানান, বাঘের সংখ্যা নিরুপণ, বাঘের খাদ্য, নিরাপদ আবাসস্থলসহ নানা কার্যক্রম থাকবে এ প্রকল্পে। বাঘের বিচরণক্ষেত্র সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে (বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা) এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

বাঘের লোকালয়ে আসা ঠেকাতে সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানান, বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসা ঠেকাতে সুন্দরবনের যেসব নদী খাল মরে গেছে সেসব এলাকার ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ‘নেট’ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগে ভারতের বন বিভাগ তাদের সুন্দরবনে অংশেও জাল দিয়ে সুফল পেয়েছে।

‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের’ আওতায় আগামী শুষ্ক মৌসুমে বাঘ শুমারির কাজও শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি।

এ প্রকল্পের অধীনে বাঘ গণনা, বাঘের জীবনাচরণসহ সব ধরনের গবেষণাধর্মী কাজ করা হবে জানিয়ে বন বিভাগের এই কর্মকর্তা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির উচ্চতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে; যার কারণে সুন্দরবনের উঁচু স্থানেও জলোচ্ছ্বাসের পানি উঠে থাকে। এতে বাঘের আবাসস্থল ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে বনের গহীনে ১২টি মাটির ঢিবি নির্মাণ করা হবে।”

প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার অংশ বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় পড়েছে; বাকিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায়।

এ বিচিত্র প্রাণ সম্ভারের বড় স্বাতন্ত্র্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। একক জায়গা হিসেবে সুন্দরবনেই এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বাঘ ছিল। তবে বন উজাড় ও অবৈধ শিকারের ফলে ‘বিপদাপন্ন’ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে প্রাণীটি।

বিশ্বে বুনো পরিবেশে টিকে থাকা বাঘের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৮৯০। এর মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশে সুন্দরবনের দুই অংশ মিলিয়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে দুইশর কিছু বেশি।

২০০৪ সালে বন বিভাগের জরিপে পায়ের ‘ছাপ’ গণনা করে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। পরে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে ২০১৫ সালে করা শুমারিতে এ সংখ্যা নেমে আসে ১০৬। ২০১৮ সালের তা বেড়ে ১১৪ হয়।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খুলনা প্রতিনিধি শচীন শুভ্র]

আরও পড়ুন

Also Read: বিকল্প পেশা চান সুন্দরবনের বনজীবীরা

Also Read: সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে অগ্রগতি কতদূর?

Also Read: বাঘ: চোরাশিকার ও পাচার কতটুকু কমেছে?

Also Read: বাঘ-মানুষের ‘দ্বন্দ্ব’ কমলেও থামেনি চোরা শিকার

Also Read: সুন্দরবনে বাঘ বেড়ে এখন ১১৪টি: বন বিভাগ

Also Read: বাঘের জন্য ‘শাপে বর’ হয়ে এসেছে মহামারী

Also Read: দূষণ বাড়ছে সুন্দরবনের

Also Read: সুন্দরবনে ফের দেখা গেল ‘বাংলার বাঘ’

Also Read: শত কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ভারতের বাঘ বাংলাদেশে

Also Read: বিশ্ব বাঘ দিবস: সুন্দরবনের বাঘ বাড়ানোর টেকসই ব্যবস্থা পুনর্প্রবর্তন

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক