গণতন্ত্রই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল স্তম্ভ: আকবর আলি

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছে ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক এ আমলা।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 July 2022, 03:07 PM
Updated : 23 July 2022, 03:07 PM

‘ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ’ গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান।

শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক স্মারক বক্তৃতায় তিনি বলেন, “ডেমোক্রেসি ইজ হোয়েন দি পিপল গভর্নমেন্ট, পিপল চেক দ্য গভর্নমেন্ট। যে দেশে জনগণ সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, সেটিই হলো গণতন্ত্র।

“যে দেশে জনগণের নিয়ন্ত্রণ নাই, সেটি ভোট হোক আর যাই হোক- সেটিকে প্রকৃত নির্বাচন বলা চলে না। এবং এই দিক থেকে দেখতে গেলে আমাদের এখানে গণতন্ত্র গড়ার প্রয়োজন রয়েছে।”

এই গণতন্ত্র গড়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদের কাছে ফিরে যেতে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “যিনি লিখেছেন, যিনি এই সম্বন্ধে বলেছেন এবং যিনি এই বিষয়ে প্র্যাকটিস করেছেন, তার কাছে আমাদের বারবার ফিরে যেতে হবে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রয়াত শিক্ষক এমাজউদ্দীনের জীবনকর্ম তুলে ধরে আকবর আলি খান বলেন, “হেনরি অ্যাডামসের শিক্ষকদের সম্বন্ধে একটা বক্তব্য মনে পড়ছে, তিনি লিখিছেন- এ টিচার এফেক্টস ইটারনিটি; হি নেভার টেল হয়্যার হিজ ইনফ্লুয়েন্স স্টপস।

“এমাজউদ্দীন আহমদ আমাদেকে ইটারনিটির সাথে সংযোগ ঘটিয়েছেন এবং সেই সংযোগ এখনও চালু আছে, তার প্রভাব এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং হয়ত আগামী ২০/৩০/৪০ বছর দেখতে পাব- তার অনেক স্বপ্নই সফল হয়েছে।”

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন মন্তব্য করে সাবেক আমলা আকবর বলেন, “তিনি প্রশাসনের কাছে কখনও নতি স্বীকার করেননি। প্রয়োজন পড়লে তিনি কলেজ পরিবর্তন করেছেন, কিন্তু নতি স্বীকার করেননি। এই বিষয়গুলো আজকের যারা শিক্ষক আছেন, তাদের মনে রাখা প্রয়োজন।”

গণতন্ত্রই বাংলাদেশের রাজনীতির মূল স্তম্ভ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তার কারণ হলো বাংলাদেশের যে আত্মপ্রকাশ রাষ্ট্র হিসেবে- সেটা হয়েছে গণতন্ত্রের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছে ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

“গণতন্ত্র ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষতা সম্ভব নয়, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্ভব নয় এবং সবশেষে যদি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়- বাংলাদেশে আমরা মারামারির সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিনি, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে গণতন্ত্রের মাধ্যমে।”

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলতে গিয়ে আকবর আলি খান বলেন, “যেহেতু আমরা উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় ছিলাম, সেহেতু আমাদের গণতন্ত্রের জন্য একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল এবং শিক্ষাব্যবস্থার সাথে গণতন্ত্রের প্রতি যে ভালোবাসা সেটাও জাগানোর চেষ্টা করা হয়। তার পরিচয় হলো কলেজ ইউনিয়নগুলোতে।

“প্রত্যেকটা ভালো কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত হলে ছিল ছাত্র ইউনিয়ন এবং সেই ছাত্র ইউনিয়নের যিনি সহসভাপতি হতেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন এবং অন্যান্যরা বিভিন্ন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তারা কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাজ করেন সেটা শিখতে পারতেন।”

সাবেক এ অর্থ সচিব বলেন, “শুধু তাই না, বাজেট কিভাবে পাস করতে হয় সে সম্পর্কেও তারা আলাপ করতেন। ওই সময়ে প্রত্যেক বিষয়ের যে পরীক্ষা সেটা ঠিক সময় হতো, তেমনি হল ইউনিয়নের নির্বাচন, কলেজ ইউনিয়ন নির্বাচন সবই ঠিক সময়ে হতো। কখনও বকেয়া হতো না, কখনও জ্যাম হতো না।

“আর আজকে বছরের পর বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচন হয় না, কলেজগুলোতে নির্বাচন হয় না। গণতন্ত্রের প্রতি যে ভালোবাসা- সেটা সৃষ্টি দূরের কথা, গণতন্ত্র সম্বন্ধে আজকে আমাদের ছাত্রদের মধ্যে প্রশ্ন তুলে ধরা হচ্ছে।”

২০২০ সালের ১৭ জুলাই অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মারা যান।

তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক বক্তৃতায় আকবর আলি বলেন, “এমাজউদ্দীন আহমদের সময়ে যদিও পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষকের অভাব ছিলো, কিন্তু শিক্ষার মান অত্যন্ত উঁচু ছিল। আর আজকে আমাদের এখানে অবকাঠামোর অভাব নাই, দালানকোঠা বিশ্ববিদ্যালয় ভরে গেছে। আমাদের বইয়ের অভাব নাই, লাইব্রেরির অভাব নাই, শিক্ষকের অভাব নাই।

“শোনা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি কোনো কোনো বিভাগে এতো শিক্ষক আছে যে পড়ানোর মতো কোর্স নাই এবং ভাগাভাগি করে একজন শিক্ষক সারা বছর একটা কোর্স পড়াতে পারলে সৌভাগ্যবান বলে মনে করেন। অথচ এমাজউদ্দীন সাহেব যখন পড়াশোনা করেছেন, তখন শিক্ষকদের দিনে ৩/৪টা পর্যন্ত ক্লাস নিতে হয়েছে...। কিন্তু তবু পড়াশোনার মান কিন্তু কমে নাই।”

অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুমের সভাপতিত্বে ও কবি আবদুল হাই শিকদারের পরিচালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, অধ্যাপক লুতফর রহমান, অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাসরিন, অধ্যাপক তারেক ফজল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক