Published : 15 Dec 2025, 04:44 PM
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল যে অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড পেয়েছেন, সেই অভিযোগেও তাদের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছে প্রসিকিউশন।
সোমবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আপিল হয়। আপিলে সাজা বাড়াতে আটটি আইনি যুক্তি তুলে ধরেছে প্রসিকিউশন।
আপিলের পর প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, “আমৃত্যু দণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডে পরিণত করতে আমরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আজ আপিল করেছি। এতে আটটি ‘গ্রাউন্ড’ আনা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। আমরা এর আগেই আপিল করেছি। আপিলের ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। আশা করছি, এর মধ্যেই আপিলটি নিষ্পত্তি হবে।”
গাজী তামিম বলেন, “এই অপরাধের নৃশংসতার গভীরতার তুলনায় এই আমৃত্যু কারাদণ্ড অপরিপক্ক বা কম হয়েছে। অতএব এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত।
“এ আইনে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারণ, তাদের নির্দেশ বা উসকানিতে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ শহীদ ও ২৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।”
গত ১৭ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়। এর মধ্যে দ্বিতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড হয় শেখ হাসিনার।
আর এক নম্বর অভিযোগ ‘প্ররোচনা, হত্যার নির্দেশ ও বলপ্রয়োগ থামাতে ব্যর্থতার’ দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর।
আরেক আসামি আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের মৃত্যুদণ্ড হয় চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ার দুটি ঘটনায়। আরেকটি অভিযোগেরে দায়ে হয় আমৃত্যু কারাদণ্ড।
এ মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া তৃতীয় আসামি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
সাজা বাড়াতে যেসব আইনি যুক্তি দেখাচ্ছে প্রসিকিউশন
১. আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন-১৯৭৩ এ যে শাস্তির কথা বলা আছে, তার প্রথমেই মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বর্ণনা রয়েছে। এরপর গ্রাভিটি অব দ্য অফেন্সের (অপরাধের ভয়াবহতা) কথা বলা আছে। যেহেতু আইনে একটি শাস্তি প্রেসক্রাইভ (বিধান) উল্লেখ রয়েছে, এজন্য সব চার্জেই ডেথ পেনাল্টি পাওয়ার যোগ্য।
২. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। সেখানে ‘নিষ্ঠুরতম’ অপরাধ হয়েছে, যার শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত।
৩. নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষের ওপর স্কেল অব অ্যাটাক হয়েছে, তার ব্যাপকতা ছিল মারাত্মক। এর কারণে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি দেওয়া আইনত সঠিক হয়নি।
৪. আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত।
৫. শুধু আসামির অধিকার দেখলেই হবে না। এখানে রাইটস অব দি ভিকটিমস এবং সোসাইটির রেজনেবল এক্সপেক্টেশনটাও দেখতে হবে। একটা সমাজ এ ধরনের অপরাধের কী ধরনের শাস্তি প্রত্যাশা করে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা বন্ধ করার জন্য আদালতে কী ধরনের শাস্তি হলে সমাজ এ ধরনের অপরাধ থেকে মুক্ত হবে, সেটাও আদালতের দেখা উচিত ছিল। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত ছিল।
৬. আসামিরা জেনেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে; সাজা হচ্ছে। আপিলের মেয়াদও ৩০ দিন। এসব জেনেই তারা নিজেদের পলাতক রেখেছেন। পলাতক থেকে বিভিন্ন ট্রায়ালে বাধা দেওয়ার জন্য বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে তাদের শাস্তি কমানোর কোনো সুযোগ নেই।
৭. আসামিদের সরাসরি আদেশ বা নির্দেশে যে ধরনের হত্যাযজ্ঞ হয়েছে, তা পৈশাচিক। তাদের নির্দেশে সারাদেশে ১৪০০ এর অধিক মানুষ শহীদ ও ২৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।
৮. এক নম্বর অভিযোগে আবু সাঈদ, যিনি জুলাই অভ্যুত্থানের পাইওনিয়র (অগ্রদূত) ছিলেন। আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডেও তারা জড়িত। এজন্য মৃত্যুদণ্ডই ছিল ন্যায়বিচার।