Published : 15 Aug 2025, 09:13 PM
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে লোকজনকে ভিড়তে দেয়নি পুলিশ; বাধা এসেছে আওয়ামী লীগ বিরোধী লোকজনের তরফেও।
বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে মারধরের শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে বড় পর্দায় গান-বাজনার সঙ্গে নাচানাচি করেছেন কিছু মানুষ; বেজেছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি মেজর ডালিমের ভাষণও।
দুপুরে ঘটনাস্থলে এসে ধানমন্ডি থানার ওসি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের নির্দেশনায় তারা কাজ করছেন।
ওসির এ বক্তব্যের পর প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেন, তিনি পুলিশকে কোনো নির্দেশনা দেননি।
প্রেস সচিবের বক্তব্য সামনে আসার পর বিকালেই অবশ্য ওসি তার বক্তব্যটি ‘এক্সপাঞ্জ’ করার কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকেই সরগরম হয়ে ওঠে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর। সড়কের দুই প্রবেশমুখ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে অবস্থান নেয় পুলিশ। জলকামানসহ সাঁজোয়া যানও ছিল।
দুই কাঁটাতারের ব্যারিকেডের মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই স্থানীয় কিছু মানুষ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসি চেয়ে দফায় দফায় মিছিল করেছেন। এসব লোকজনের ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীকে দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার রাতেই সেখানে ট্রাকে করে বড় স্পিকার আনা হয়। ট্রাকে বসানো হয় বড় পর্দা। কিছু সময় পরপর সেখানে দেখানো হয় ‘জুলাই গণহত্যার’ প্রামাণ্যচিত্র। গান বাজিয়ে নাচানাচিও করেন কিছু মানুষ।
রাতে সেই স্পিকার ও মনিটরে গান বাজিয়ে নাচতে দেখা যায় কিছু লোকজনকে।
শুক্রবার সকাল থেকেই ৩২ নম্বরে সাধারণ মানুষের ঢোকা বন্ধ করে দেয় পুলিশ। দিনের বেলায় সেই রাতে এনে রাখা সেই ট্রাকেই বাজানো হয় বঙ্গবন্ধুর খুনি হিসেবে দণ্ডপ্রাপ্ত মেজর ডালিমের ভাষণ। ভাষণের সময় স্ক্রিনে মেজর ডালিমের ছবি ভাসছিল আর লেখা ছিল, ‘মেজর ডালিমের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ’।
সাধারণ মানুষকে সরিয়ে দিলেও সেখানে পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে কথা বলেন মিষ্টি বিতরণ করতে আসা একদল লোক।
দিনটিকে ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করছেন বলে মন্তব্য করেন ‘পিপলস অ্যাক্টিভিস্ট কোয়ালিশন’ (প্যাক) নামেরে একটি সংগঠনের সদস্যরা।
তারা সেখানে বাতাসা বিতরণ করেন, পুলিশ সদস্যদেরও বাতাসা খেতে আমন্ত্রণ জানান। তবে পুলিশ সদস্যরা সেই বাতাসা নেননি। তার আগে তারা পুলিশের ঘেরাটোপে থেকে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।

পুলিশি ঘেরাটোপেই হেনস্তা
পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্যেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মারধর ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন কয়েকজন।
শুক্রবার সকালে ফুল নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা এক রিকশাচালকও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পুলিশের উপস্থিতিতেই বিএনপি ও ছাত্রদলের স্লোগান দিয়ে কয়েকজন তাকে মারধর করেন।
বেলা ১১টার দিকে ওই ব্যক্তি রিকশা চালিয়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ৩২ নম্বরে আসেন। ফুলের তোড়ার ওপর কাগজে লেখা ছিল ‘১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস’।
তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ৩২ নম্বরে জড়ো হওয়া কিছু মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েন। একজন লাফ দিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে ফুলের তোড়া কেড়ে নেন। চলে মারধর; ভাঙচুর করা হয় তার রিকশাও। এসময় কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই রিকশাচালক।
আজিজুর রহমান নামের ওই রিকশাচালক পরে বলেন, তিনি যাত্রাবাড়ী থেকে এসেছেন। ৪০০ টাকা দিয়ে ফুলের তোড়াটি কিনেছেন।
“আমার অনেক কষ্টের টাকা, আমি দুই বছর ঢাকা শহরে রিকশা চালাই। শুধু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি জন্যি এহানে আইছি।”
এর আগে আওয়ামী লীগের কর্মী সন্দেহে এক নারীকেও হেনস্তা করা হয়। পরে পুলিশের মাধ্যমে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া আরেক ব্যক্তিকে সেখানে মারধর করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
সকালে এক দম্পতি এলে ‘আওয়ামী লীগ’ সন্দেহে তাদেরও হেনস্তা করা হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগ সন্দেহে ছাত্রশিবিরের ঢাকা কলেজ ইউনিটের প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মো. মামুনকে মারধরের ঘটনা ঘটে।
আহত এই শিবির নেতার অভিযোগ, তিনি এখানে আসার পর কিছু লোক তাকে মারধর করে। কাছেই পুলিশ ছিল। তিনি অনেক ডেকেও পুলিশের কোনো সাড়া পাননি।

প্রেস সচিবের নির্দেশনা প্রসঙ্গ
ঘটনাস্থলে এসে দুপুরে ধানমন্ডি থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা বলেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের নির্দেশনায় তারা এসব করছেন।
ওসি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন, কিছুদিন আগে আমাদের যে প্রেস সচিব, তিনি কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করব।”
৩২ নম্বরে নাশকতার পরিকল্পনার কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই জানিয়ে ওসি বলেন, “সরকারিভাবে যেহেতু তাদের (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আমরা সেই নির্দেশনা ফলো করব।”
ওসি বলেন, “এখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক। রুটিন যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সেটাই মোতায়েন করা হয়েছে। যেহেতু গতকাল বিপুল জনসমাগম ছিল, সেজন্য আমরা বাড়তি কিছু ফোর্স মোতায়েন করেছি। এর বাইরে সেরকম কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর আমাদের কাছে নেই।”
এরমধ্যে কয়েকজনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ওসি বলেন, “গতকাল বিভিন্ন সন্দেহে, কেউ মোবাইল টানা পার্টি, চুরি, ছিনতাইকারী অথবা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সদস্য- এমন সন্দেহে পাঁচজনকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাইবাছাই করছি। পরে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ওসির বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, তিনি পুলিশকে কোনো নির্দেশনা দেননি। কয়েকদিন আগে ১৫ অগাস্টে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কিছু কথা বলেছিলেন।
“পুলিশ তো নির্দেশনা পায় তাদের চিফের কাছ থেকে। আমরা তো আমাদের তরফ থেকে কোনো নির্দেশনা দিই না। পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার মতো করে কাজ করে।”
তিনি বলেন, “আমাকে কয়েক দিন আগে সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, ‘আওয়ামী লীগ যদি ১৫ অগাস্টে কর্মসূচি পালন করে, সেক্ষেত্রে আপনারা কী করবেন?’ আমরা বলেছি যে, আওয়ামী লীগের অ্যাক্টিভিটিজ ব্যান। ফলে আওয়ামী লীগ ১৫ অগাস্ট বা যে কোনো সময় যদি মিটিং মিছিল করে, তাহলে অবশ্যই সেটা ব্যান অর্গানাইজেশনের অ্যাগেইনস্টে যে বিধি, সে অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটা ১৫ অগাস্টেও যেরকম, সেটা অন্যান্য দিনেও সেরকম। এটা একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার জবাবে আমি এটা বলেছিলাম।”
আপনি তাহলে পুলিশকে আলাদাভাবে কোনো নির্দেশনা দেননি, এ প্রশ্নে প্রেস সচিব বলেন, “ওটা তো আমার ডিপার্টমেন্ট না রে ভাই। ওনাদেরকে আমি ইন্সট্রাকশন দেব কেন? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আছে, আইজিপি আছেন, ডিএমপি কমিশনার আছেন। সে তার লাইন অব ডিউটি অনুযায়ী ইন্সট্রাকশন পাবে, সেটা আমি দেব কেন।
“আমার তো রুলস অব বিজনেসেও এটা পড়ে না। সরকারের রুলস অব বিজনেসে কী এটা পড়ে যে আমি পুলিশকে বলব যে, আপনারা এটা করেন।”

এ বিষয়ে এনটিভি অনলাইনের খবরে বলা হয়েছে, ১০ অগাস্ট ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছিলেন, “বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটি দুঃখজনক। তবে এ দিনটি অগাস্টের অন্য ৩১ দিনের মতোই। কেউ ধানমন্ডিতে বা কোথাও কর্মসূচি করতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রেস সচিব পুলিশকে কোনো নির্দেশনা দেননি বলে জানানোর পর বিকালে ধানমন্ডি থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ড্টকমকে বলেন, “আমাদের ওপরে নির্দেশনা আছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে হবে । সেটা বলতে গিয়ে মুখ ফসকে ওটা বের হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “এটা আমার ভুল হয়ে গেছে। এটা আমি এক্সপাঞ্জ করছি। এটা নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। আমি খুবই বিব্রত।”
পুলিশের কাছে প্রেস সচিবের কোনো নির্দেশনা আদৌ আছে কিনা জানতে চাইলে রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, “প্রেস সচিবের নির্দেশনা কেন থাকবে। আমরা কি লাইন ছাড়া কাজ করব। আমরা কমিশনার স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব। আর প্রেস সচিবের নির্দেশনা পালনের কোনো সুযোগ নেই। থাকলেও এটা পুলিশ কমিশনার হয়ে আসবে; আইজিপি স্যারের হয়ে আসবে।”
আরও পড়ুন-
ধানমন্ডি বত্রিশে নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেই মারধর, হেনস্তা
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শিবির নেতাকে মারধর, অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে