Published : 09 Jul 2026, 01:31 AM
নিম্নচাপের প্রভাবে যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদী বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে কয়েক জেলায়, তখন ঢাকা অঞ্চলের রেডারটিও অচল হয়ে পড়ার খবর এসেছে।
শনিবার এই রেডারটি অচল হয়ে পড়ায় ভৌগলিকভাবে দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি রেডারের সবগুলোই অচল হয়ে পড়ল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির জন্য দেশে মোট পাঁচটি রেডার স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় স্থাপন করা হয় এ রেডারগুলো।

এগুলোর মধ্যে রংপুরের নতুন রেডারটি ১৭ জুন থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। কক্সবাজারের রেডার প্রায় তিন বছর ধরে অচল। পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার রেডার বন্ধ আট বছর। মৌলভীবাজারের রেডারও কয়েক বছর ধরে অকেজো।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, কয়েকটি রেডারের যন্ত্রাংশ পুরোনো হয়ে গেছে। কোনোটির বিনামূল্যে বা শর্তসাপেক্ষে বদলে দেওয়ার আশ্বাসপত্র বা ‘ওয়ারেন্টির’ মেয়াদ শেষ। কোনোটির যন্ত্রাংশ আর বাজারে পাওয়া যায় না। ফলে চাইলেও সেগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মৌসুমি বায়ু এখন দেশজুড়ে সক্রিয়। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এরই মধ্যে কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বলপমেয়াদী বন্যার সতর্কতা জারি করেছে।
জুলাই মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি, তীব্র বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমন সময়ে আকাশের মেঘের গতি, বৃষ্টির অবস্থান কিংবা বজ্রঝড়ের গতিপথ সম্পর্কে কয়েক ঘণ্টা আগেই নির্ভুল তথ্য পাওয়া জরুরি। অথচ, দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি আবহাওয়া রেডার এখন অচল।
রেডারগুলো নষ্ট হওয়ায় ঢাকা ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং কক্সবাজার উপকূলের বিশাল এলাকা এখন কার্যত রেডার পর্যবেক্ষণের বাইরে। বিভিন্ন গাণিতিক মডেল, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করেই চলছে পূর্বাভাসের কাজ।
রংপুরে এক যুগ পর চালু, ক’দিন না যেতেই বন্ধ
২০১২ সালের পর আবহাওয়া অধিদপ্তরের রংপুরের রেডারটি অচল হয়ে পড়ে। এরপর এক যুগের বেশি সময় অপেক্ষার পর গত বছরের মে মাসে রংপুরের রেডারটি চালু হয়েছিল। কিন্তু গত ১৭ জুন থেকে তা আবার অচল হয়ে পড়েছে।

১৯৯৯ সালে জাপানের অর্থায়নে উত্তরাঞ্চলে প্রথম ডপলার আবহাওয়া রেডার স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এতে ত্রুটি দেখা দেয়। ২০০৭ সালে বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয় এবং ২০১২ সালে এটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। এর পর প্রায় এক যুগ ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলে কোনো কার্যকর আবহাওয়া রেডার ছিল না।
এ দীর্ঘ সময়ে উত্তরাঞ্চলে একাধিক আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী এবং অতিবৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। নির্ভুল এবং সময়োপযোগী আবহাওয়া তথ্যের অভাবে বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে।
রংপুরের নতুন রেডার স্থাপন প্রকল্পটিও নানা কারণে বিলম্বিত হয়। ২০১৫ সালে জাপানি নাগরিক হোশি কোনিও হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে যায়। পরে করোনা মহামারির কারণে কাজ আরও পিছিয়ে পড়ে।
অবশেষে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রেডার স্থাপন করা হয়। জাপানের শিমিজু করপোরেশন রেডার স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করে এবং সরঞ্জাম সরবরাহ করে মারুবিনি করপোরেশন।
গত বছরের ১১ মে জাপানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে রেডারটি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।
নতুন এই রেডারটি চারদিকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম ছিল। এর মাধ্যমে ঝড়, বজ্রপাত, বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি, মেঘের গঠন, আর্দ্রতা, জলীয় বাষ্পের গতি, তাপমাত্রা এবং বায়ুর গতিবেগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেত।
রেডারের তথ্য ব্যবহার করে সরাসরি আবহাওয়া মানচিত্র তৈরি করা হতো। শনাক্ত করা যেত বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও।
রংপুর আবহাওয়া কার্যালয়ের প্রধান মো. মোস্তাফিজার রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের আগের ‘কনভেনশনাল’ রেডারটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে এবং নতুন করে একটি ডপলার রেডার স্থাপন করা হয়েছে, এটা এক বছর হচ্ছে রানিং।
“তো গত ১৭ তারিখে আমাদের যে এভিআর (ইলেক্ট্রিসিটি পাওয়ার সাপ্লাই সিস্টেম) কোনো ইন্টারনাল কারণে এটাতে একটু সমস্যা হয়েছে এবং এখনো এটার ‘ওয়ারেন্টি পিরিয়ড’ আছে। এটা যেহেতু জাইকার অনুদানে, ‘ওয়ারেন্টি পিরিয়ড’ আছে। এজন্য ওরা বলছে আমাদেরকে যে, যদি কোনো ‘প্রবলেম ফেইসৎ করেন, তৎক্ষণাৎ আমাদেরকে জানাবেন এবং তাদের অনুমতি নেওয়া ছাড়া আমরা কোনো কিছু করতে পারব না।”
তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে তাদেরকে জানিয়েছি, তারা চেষ্টা করেছিল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সমাধান করার জন্য, সামাধান হয়নি “

পরে সমস্যাটা সমাধান বের করার কথা তুলে ধরে মোস্তাফিজার রহমান বলেন, বুধবার তাদের আসার কথা রয়েছে। তারা এখন ঢাকায়।
রেডার বন্ধ থাকায় পূর্বাভাস দিতে বা ঢাকায় আপনারা যে ডেটা পাঠান সেটা পাঠাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা?
জবাবে তিনি বলেন, “দেখেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুধু এটার ওপরে নির্ভর করে না। আমাদের অনেকগুলো ফ্যাক্টরসের ওপর নির্ভর করে, তার মধ্যে রেডার একটা মাধ্যম। আমাদের স্যাটেলাইট আছে, নিজস্ব অবজারভেশন আছে, অন্যান্য মডেলগুলোও আছে।
“আমরা ৪ তারিখ পর্যন্ত ঢাকার রেডারটার হেল্প নিতাম। এখন ওটা যেহেতু স্টপ হয়ে গেছে, আমরা এখন অন্যান্য যে রাডারগুলো আছে, যেমন আমরা তো ইন্ডিয়া থেকেও সহায়তা নিই, আমাদের নিজস্ব, বাংলাদেশের এয়ার ফোর্সের রেডার আছে সেখান থেকেও নিই। সব মিলিয়ে আপাতত চালাচ্ছি।”
মৌলভীবাজারে কয়েক বছর ধরে নষ্ট
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলভীবাজারের রেডারটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সিলেট, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রতিবছরই আকস্মিক ও স্বল্পমেয়াদী বন্যা দেখা দেয়।
উজানে ভারতের মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টি হলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি বেড়ে যায়। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনাও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি ঘটে। সবশেষ মাস খানেক আগেও আকস্মিক স্বল্পমেয়াদী বন্যার কারণে ওই অঞ্চলে ফসলের বিপুলের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
ফলে, মৌলভীবাজারের এই রেডারটি সচল থাকলে মেঘের গতিবিধি, বৃষ্টির তীব্রতা এবং বজ্রঝড়ের বিষয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া যেত।

কক্সবাজারে বন্ধ প্রায় তিন বছর
রংপুর আর মৌলভীবাজারের মতোই অবস্থা কক্সবাজারে। বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নিম্নচাপের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রায় প্রতিটি নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় প্রথম আঘাত হানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। এই অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কক্সবাজার এবং পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রেডার। তবে দুটি রেডারই দীর্ঘদিন অচল।
১৯৬৯ সালে কক্সবাজারের রাডার স্টেশনটি স্থাপন করা হয়। এরপর ২০০৭ সালে জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় এটি আধুনিকায়ন করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত রেডারটি ৪০০ কিলোমিটার দূরের সমুদ্র এলাকার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারত। ২০২৩ সালের অগাস্টে এটি অচল হয়ে যায়। এর পর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এটি সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ফলে এই অঞ্চলের সমুদ্রনির্ভর জীবিকা যাদের, বিশেষ করে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলে এখন দুর্যোগের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া তথ্য পাচ্ছেন না।
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “২০২৩ সালের অগাস্ট মাস থেকে এটা অকেজো আছে। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার যারা আছেন, তারা চেষ্টা করছেন, কিন্তু অ্যাক্টিভ হয়নি।”
এর ফলে কী সমস্যা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আবহাওয়া অফিস কক্সবাজার হল লোকাল অফিস, এইখানে আমাদের কাজ শুধু অবজারভেশন নেওয়া। রেডার দিয়ে অবজারভেশন নিয়ে আমরা ঢাকাতে পাঠাই। স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদকর্মীদেরও পাঠাই। আমরা এখন পাঠাতে পারছি না। না পাঠানোর কারণে আমাদের ওই কাজটা বন্ধ আছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের রেডারের তথ্যটা পাচ্ছে না। আমরা জানিয়েছি যে আমরা এটা নিতে পারছি না। ওরা একবার ইঞ্জিনিয়ার পাঠাইছে, ইঞ্জিনিয়ার পাঠানোর পরেও হয়নি। পরে দেখা গেল যে, পুরনো হয়ে গেছে, মানে এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।”
এখন নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “সম্ভাব্যতা যাচাই যেটা হয়, সেটা হয়েছে। সেটা সম্পন্ন হয়ে গেছে এবং এটা সহকারে আমাদের কী কী লাগবে এগুলো সব করে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) আকারে মন্ত্রণালয়ে দেওয়া আছে। যতদূর জানি এরকম একসাথে তিনটা কিন্তু হবে—কক্সবাজার, খেপুপাড়া এবং মৌলভীবাজার, তিনটা একসাথেই হবে। একসাথে (আপগ্রেডেশন) হবে।”
পটুয়াখালীর রেডার বন্ধ ৮ বছর
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রেডার স্টেশনও আট বছর ধরে বন্ধ। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্টেশনটির ট্রান্সমিশন এবং সার্ভে সিস্টেমের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার পর থেকে এটি আর সচল করা যায়নি।
রেডারটি আগে ৪০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ধারণ, বৃষ্টির তীব্রতা বিশ্লেষণ এবং উপকূলের জন্য জরুরি সতর্কতা দিতে পারত।
উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এই অঞ্চলের আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে দুর্যোগ সম্পর্কিত সতর্কবার্তার জন্য এই রেডারটি অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ। অথচ, এত বছর ধরে বন্ধ থাকার পরও এটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাডার বন্ধ হলেও পূর্বাভাস দেওয়া যায়। খুব বেশি প্রভাব পড়ে না, যদি ভালো আবহাওয়াবিদ থাকে। কারণ, অন্যান্য জিনিস তো আছে, আমাদের যে ম্যাপগুলি করা হয়, সেই ম্যাপগুলি কাজে লাগে। তারপরে স্যাটেলাইট পিকচার আছে।
“ওটা (রেডার) থাকলে একটু ভালো হয় হইল নাউকাস্টিংয়ের (স্বল্পমেয়াদী, কিন্তু সুনিদিষ্ট ও তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস) জন্য। মানে বজ্রবৃষ্টি হবে মনে করেন, বজ্রঝড় হলে যদি অ্যানিমেশনটা পাওয়া যায়, তাইলে সহজে বলা যায়, এটা কোন দিকে যাচ্ছে এবং কখন এটা কোন এলাকাতে থাকবে। আর এমনি পূর্বাভাসের জন্য যা আছে তা দিয়ে করা যায়।”
তিনি বলেন, “আগে বর্ষা মৌসুমে ‘ট্যাকটিক্যালি’ লোক মারাই যেত না। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুমে আপনার ১৫-২০ জন, ২০ বা ৩০ জনের মত মানুষ মারা যায়। শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে আপনার বজ্রবৃষ্টি হয়। এই বজ্রবৃষ্টিতে অনেক মানুষ মারা যায়। সেই জায়গা থেকে এই রাডারগুলো ঠিক হওয়া জরুরি।”
এজন্য জাইকা ও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শও দেন তিনি।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ এ বিষয়ে ফেইসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, “সোমবার সকাল ৯টার পর থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টার মধ্যে ২৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
“চট্রগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় আজ তিন দিন ধরে ভারি বৃষ্টি চলেছে। কক্সবাজার, বান্দরবন জেলায় বন্যা শুরু হয়েছে; চট্রগ্রাম শহরে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে আজকে। আজ মঙ্গলবার পুরো দেশের প্রায় ৬৪টা জেলার উপরেই বৃষ্টিপাত হওয়ার আশংকা করা যাচ্ছে।
“অথচ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি রাডারের মধ্যে পাঁচটি অচল। পুরো দেশের মানুষের জান ও সম্পদ অরক্ষিত। মাত্র এক বছর পূর্বে জাপান থেকে কেনা দুটি রাডার স্থাপন করা হয়েছে ঢাকা ও রংপুর শহরে। প্রতিটির মূল্য নাকি ১৫০ কোটি টাকা। মাত্র এক বছরের মধ্যে দুইটি রাডারই অচল হয়ে পড়ে আছে আজ জুলাই মাসের ৭ তারিখে।”
পলাশ বলেছেন, ১৭ জুন যখন রংপুর শহরের রেডারটি অচল হয়ে গেল তখন বলা হয়েছে, কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু ২০ দিন হয়ে গেলেও তা ঠিক হয়নি। ৪ জুলাই ঢাকা শহরে অবস্থিত সর্বশেষ রেডারটি যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন কোনো কোনো সাংবাদিককে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বলেছে, ইন্টারনেট সমস্যা; কোনো কোনো সাংবাদিককে বলেছে বিদ্যুৎ লাইনের সমস্যা; বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনকে খবর দেওয়া হয়েছে তারা সাড়া দিচ্ছে না।
“আজ চার দিন হয়ে গেল, কিন্তু এখন ঢাকা শহরে অবস্থিত রাডারটি চালু হলও না।
“গতকাল কোনো-কোনো সংবাদ মাধ্যমকে বলেছে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত রাডার ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কর্তৃক পরিচালিত রাডার এর তথ্য ব্যবহার করে পূর্বাভাস দিচ্ছে। সত্য কথা হলও ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত কোলকাতা শহরে অবস্থিত রাডারটি মে মাসের ২০ তারিখ থেকে বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কর্তৃক পরিচালিত যশোর ও চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত দুইটি রাডার এর মধ্যে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত রাডারটি গতকাল রাত থেকে বন্ধ রয়েছে।”
এই গবেষক বলেছেন, একটি আধুনিক আবহাওয়া রেডার প্রতি এক থেকে পাঁচ মিনিট অন্তর বৃষ্টির অবস্থান, মেঘের গতি, শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা, বাতাসের গতিবেগ এবং ঝড়ের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য দেয়।
তিনি লিখেছেন, “শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়া রেডারের বিকল্প নেই। একইভাবে কোনো ঘূর্ণিঝড় উপকূল থেকে ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে এলে তার অবস্থান, গতিপথ, বৃষ্টির বিস্তার এবং বাতাসের গতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেডার থেকেই পাওয়া যায়।”

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভাষ্য কী
অচল রেডারগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার বাংলাদেশে আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নূরুল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাডার একটা ‘হাইলি সেনসিটিভ টেকনিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট’। এটা বিদ্যুতে চলে। আপনার বাসাবাড়িতে যখন বিদ্যুৎ থাকে অনেক সময় আপনার বিদ্যুতের সব যন্ত্রপাতি চলে। মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ যখন থাকে না, তখন আপনার ফ্রিজ, টেলিভিশন এগুলো একটু বন্ধ থাকে না? বিদ্যুৎ যেতে পারে না? বিদ্যুতের লাইনের সমস্যা হতে পারে না?”
তার দাবি, ঢাকার রেডারটি নষ্ট হয়নি। সেখানে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সাময়িকভাবে অচল আছে।
“রাডার তো নষ্ট না, রাডারের কিছু হয় নাই। রাডার ঠিক ছিল এবং সরকার উদ্যোগ নিবে কেন? সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগ নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে যখন, ঘটনাটা ঘটছে রাতের ঝড়ে, ঝড়ে কি জিনিসপত্র ও ত্রুটি দেখা দিতে পারে না?”
তিনি বলেন, “রাতের ঝড়ে বৈদ্যুতিক লাইনের সমস্যা হয়েছে, ট্রান্সফরমারের সমস্যা হয়েছে। এটা তার পরের দিন সকাল থেকেই সমস্যা। এটার জন্য সংশ্লিষ্ট সব ডিপার্টমেন্ট, পিডি, পিডব্লিউডি, ডেসকো, পল্লী বিদ্যুৎ যারা যারা রিলেটেড, ‘অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল’ ঠিক করতে বলা হয়েছে। এ টেকনিক্যাল জিনিস, ওনারা ওইদিন থেকেই কাজ করতেছে এবং আশা করা যাচ্ছে আজকেই রেডার আবার চালু হয়ে যাবে।”
তবে বুধবার বিকালে আবহাওয়া দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেডারটি তখনো সচল হয়নি।
অন্য অচল রেডারগুলোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “আমরা টেকনোলজিতে আমেরিকা বা ইউরোপের সমকক্ষ হই নাই, কিন্তু আমাদের ওই ইকুইপমেন্টগুলি ব্যবহার করতে হয়। রাডার তো বাংলাদেশে তৈরি হয় না, রাডারের যন্ত্রপাতিও বাংলাদেশে তৈরি হয় না। বিদেশ থেকে আনতে হয়। তো ওই অর্গানাইজেশনগুলোর সঙ্গে সরকার নিয়মিত যোগাযোগ করছে, সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। সে কারণে অচিরেই রংপুরেরটা চালু হবে। বাকি তিনটার কাজও প্রায় অর্ধেকের বেশি হয়ে গেছে, প্রকল্পের মাধ্যমে বাকিগুলিও হবে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটা সংস্থা। এ বিষয়ে জানতে চাইল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরই বলতে পারবে, আমাদের মিনিস্ট্রি ওরকম তো কিছু বলতে পারবে না। এখন আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট যত কাজ আছে, ওরাই ভালো জানে। মিনিস্ট্রি শুধু তাদেরকে বাজেট সংশ্লিষ্ট কাজ দেয়।”
সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা নিয়ে সরকার বুঝবে। সরকারের চিন্তাভাবনা আছে এইসব নিয়ে। এখন আমরা অনেক এগিয়ে গেছি, এটুকুই জানবেন। ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু এগিয়ে গেছে। আগে আমাদের রাডার সিগন্যাল নিতে হতো ইন্ডিয়া থেকে। আমরা এখন অন্যভাবে আমাদের রাডারে কাজ করছি। এটা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা আছে, সে মোতাবেক কাজ হচ্ছে।”