Published : 21 May 2026, 12:28 AM
রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়াতে সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা বস্তি উচ্ছেদে সকালে গিয়ে হামলার মুখে ফেরত আসা পুলিশ বিকালে আবারও সেই বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে।
বুধবার দিনভর এ নিয়ে বাউনিয়া বস্তিতে উত্তেজনার মধ্যে বিকালে পুলিশ সদস্যরা মারমুখী অবস্থান নিয়ে দুটো বুলডোজার দিয়ে বেশ কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে।
এর আগে সকালে উচ্ছেদের সময় পুলিশের রিকুইজেশন করা চারটি বাস ভাঙচুর করা হয়। বস্তিতে জড়ো হওয়া ব্যক্তিদের ছোড়া ইটের আঘাতে ৬-৭ জন পুলিশ সদস্যও আহত হয়।
এরপর বিকালে জনবল বাড়িয়ে চালানো অভিযানের সময় পুলিশের মারধরে এক সাংবাদিক আহত হয়েছেন। তাকে রাস্তায় ফেলে একদল পুলিশ সদস্য পেটাচ্ছে- এমন ভিডিও ছড়িয়েছে।
আহত সাংবাদিকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের নেহাল আহমেদের অভিযোগ, “বস্তিবাসী বারবারই অভিযোগ করছে যে তাদের নোটিস করা হয়নি। এই অভিযোগ নিয়ে সেখানে উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটকে (বিকালে) প্রশ্ন করলে তিনি রেগে যান এবং পুলিশ দিয়ে আমাদের মারধর করেন।”
“আমাকে রাস্তায় ফেলে বেদম পিটিয়েছে পুলিশ।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের কয়েকজন বলেন, বিকালে বুলডোজারগুলো দ্রুত কিছু পাকা স্থাপনাসহ টিন-কাঠের স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। বস্তির নারীদের অনেকেই হাতজোড় করে অনুনয় করেন। তবে কর্মকর্তারা উচ্ছেদ থামাননি।
ঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর সন্ধ্যায় কালশী ১৪ তলা ভবনের সামনে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নেন বস্তির অনেক বাসিন্দা।
তাদের একজন মো. ইয়াহিয়া বলেন, “একবারের জন্যও বস্তি উচ্ছেদের কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি। কেউই জানত না। কোনো মাইকিং করা হয়নি। সকালে তারা আইসাই ধুপধাপ ভাঙা শুরু করে। এরপর বস্তির লোকজন বাধা দিলে গণ্ডগোল হয়।”

পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক সরকার দুপুরে বলেন, সকালে বস্তির লোকজনের হামলায় অন্তত ছয়জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এরপর বিকালে অতিরিক্ত পুলিশসহ ম্যাজিস্ট্রেট আবারো বস্তি এলাকায় যান। এসময় পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কর্মকর্তাদের হাতে।
সকালের ঘটনায় যা বলছে পুলিশ
বস্তি উচ্ছেদে সকালের ঘটনার বিষয়ে বুধবার রাত পৌনে ১০টায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় পুলিশ।
এতে বলা হয়, বেলা পৌনে ১১টার দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য (জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল বাতেন) ওই বস্তি পরিদর্শন করেন। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথাবার্তা বলে চলে যান।
“এরপর পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে থাকা স্থানীয় বস্তিবাসী উচ্ছেদ কার্যক্রমে নিয়োজিত পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের লোকজনের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। কর্মকর্তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে নিরাপদ জায়গায় চলে যান।”
পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “দুষ্কৃতিকারীরা পুলিশের রিকুইজেশন করা চারটি বাসের সামনের এবং সাইডের গ্লাসগুলো ভেঙে ফেলে। পুলিশ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং কৌশলগত কারণে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য নিজেদের পরিবহনকারী বাসের দিকে চলে যায়। এসময় দুষ্কৃতকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে ৬-৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়।
“কিছুক্ষণ পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে হামলাকারী পাঁচ জনকে আটক করে। ম্যাজিস্ট্রেট ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ পুলিশের সহায়তায় পুনরায় বিকাল ৫টা পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চালায়।”
বাউনিয়ার প্রায় সাড়ে ১২ একরের সেই জায়গাটি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। বস্তিবাসীদের অভিযোগ, উচ্ছেদের আগে তাদের আগাম কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি। মাইকিং করা হয়নি। বুলডোজারসহ পুলিশ বস্তির কিছু স্থাপনা ভেঙে ফেললে বস্তির লোকজন তাদের ধাওয়া দেয়। বুলডোজারগুলো ভাঙচুর করে। বুলডোজারের চালকেরা বাহন ফেলে রেখেই প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বস্তির লোকজন ‘ধর ধর’ বলে পুলিশের পেছনে লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল নিয়ে ছুটছে। পুলিশ সদস্যরা প্রাণপণ দৌড়াচ্ছেন। দৌড়াতে থাকা নারী পুলিশ সদস্যদের ওপর ইটপাটকেল ছুঁড়তে দেখা যায়।
‘আমার যাওয়ার সঙ্গে হামলার সম্পর্ক নেই’
পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় বিএনপি নেতা ও অনুসারীদের দায় দিচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন। তার দাবি, তিনিই সংসদে কথা বলে এই সরকারি জায়গা উচ্ছেদের ব্যবস্থা করেছিলেন।
‘পুলিশের ওপর হামলার আগে বস্তির লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য’- পুলিশের এমন বক্তব্যের বিষয়ে সংসদ সদস্য বাতেন বলেন, “আমি সেখানে গিয়ে কথা বলেছি সেটা ঠিক আছে। আমি আসার পর হট্টগোল শুরু হয়েছে সেটাও ঠিক আছে। তবে আমার যাওয়ার সঙ্গে হামলার সম্পর্ক নেই, ওটা কাকতালীয়।”
উচ্ছেদ অভিযানে যাওয়া লোকজনের ওপর হামলার ঘটনায় ‘বিএনপির লোকজন জড়িত’ বলে অভিযোগ তার।

তার ভাষ্য, “স্থানীয় বিএনপি নেতা আসলাম গাজী ও চাঁদের দখলে ছিল বস্তির একটা অংশ। সেখানে তারা ঘর তুলে ভাড়া আদায় করছে, ওদের অফিসও ওখানে। সকালে আমি চলে আসার পর কর্মকর্তারা বিএনপি নেতাদের দখলে থাকা বস্তি উচ্ছেদ শুরু করলে লোকজন হামলা চালায়। পরে বিকালে গিয়েও কিন্তু বস্তির ওই অংশ উচ্ছেদ করতে পারেনি তারা।”
হামলাকারী কারা- এমন প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর এই এমপি বলেন, “ওদেরই (বিএনপি নেতাদের) লোক তো। জামায়াতের হামলা করার মতো কোনো লোক নেই। জামায়াতের লোকজন বস্তি নিয়ন্ত্রণ করেও না, সেখানে থাকেও না।
“সেখানে আমাদের কিছু ভোটার থাকতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করার মতো লোক নেই আমাদের।”
বস্তি বানিয়ে সরকারি জমি দখল ও উচ্ছেদের সময় কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে স্থানীয় বিএনপি নেতা আসলাম গাজী তা অস্বীকার করেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সেখানে আমাদের কোনো স্থাপনা নাই। আমাদের কোনো লোকজনও নাই। আমি কেন এরকম নোংরামি করতে যাব।”